উনি চলে গেলে বললাম, হঠাৎ তোমাকে নিমন্ত্রণ, বন্ধুর আগমন, তোমাকে ওখানে খেয়ে আসার অনুরোধ সব কিছুর মধ্যে একটা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি? তোমার হিংসে হচ্ছে? ভীষণ। কেন? নিঃসঙ্গতার অবকাশ থেকে এই সময়টুকুকে চুরি করার জন্য। দুঃখ পেওনা। সামান্য যে সময়টুকু চুরি হয়ে গেছে, তার থেকে বেশী সময় আমি তোমায় উপহার দেব আর সেই বেশী সময়টাকে কি করবে সেই ধন্ধেয় পড়ে না যাও। বলে হাসতে হাসতে ও আমার সামনে থেকে চলে গেলো।
ফিরে এলো মিনিট পাঁচেকের মধ্যে কফি ও বিস্কুট নিয়ে। আমি বললাম তোমারটা? আমি খাব না। হঠাৎ খাবে না কেন? না সত্যভূষণবাবুর রোগ হোয়াচের মত তোমাকেও স্পর্শ করেছে। সব সময় শুধু ইয়ার্কি। দাঁড়াও একটা আলাদা কাপ নিয়ে আসছি, ভাগ করে দেবে। ভাগ করতে গেলে শুধু কফি কেন অনেক কিছু ভাগ করতে হয় জান? জানি। তবে সেটা ভাগ করে দেবে তো? দেবার ইচ্ছাতো ষোলআনা ছিল, কিন্তু সময় যে চুরি হয়ে গেছে বন্ধু! তবে দুঃখ পেওনা, যে সময়টুকু চুরি হয়ে গেছে তার থেকে অনেক গুন সময় আমি জোগাড় করে নেবো। তখন কিন্তু নিজের ভাগে কম পড়বে বলে, এড়িয়ে যেতে পারবেনা। আমি বললাম আগেতো সময়টা পাই।
কোয়ার্টারটা ফুলে ফুলে সাজানো। বাইরের রাস্তা থেকে ঘরের গেট। গোটা বাড়ী, ফুল দিয়ে সাজানো। অনেকগুলো আলো এক সঙ্গে জ্বেলে বাড়ীটাকে বড় মায়াবী করে তোলা হয়েছে। নতুন পাজামা পাঞ্জাবি পরে সত্যভূষণবাবু আমাদের অভ্যর্থনা করলেন। আমরা ছাড়া আর কাউকে কোথাও দেখছিনা। সত্যভূষণবাবু আমাদের সঙ্গে বসে গল্প করছেন, তার বাল্য কৈশোর ও যৌবনের কথা। মুখে আসলেও বলতে পারছি না, কেন বাড়ীটাকে ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। এক সময় অশ্রুকণা বলল, কই আপনার বন্ধুকে দেখছিনা তো। সত্যভূষণবাবু বললেন, এখনি আসবেন। আমাকে বলেছে, কফি ও টিফিনটা নিজের হাতে করে নিয়ে আসবে। আমি ও অশ্রুকণা এ ওর দিকে তাকিয়ে চুপ করে আছি।
ছিপছিপে, যেন সন্ধ্যার রজনীগন্ধা, সিঁথিতে সিঁদুর, কপালে সিঁদুরের টিপ, হাতে শাখা, গলায় মোটা চেনে লকেট, খোঁপায় জুই ফুলের মালা, দাঁতগুলো মুক্তোর মত সাদা, একটু চাপা শ্যামাঙ্গী তাতেই তার রূপে যেন দূরন্ততার হাতছানি, কফির সরঞ্জাম নিয়ে ঢুকলেন। ওগুলো সামনে রেখে কৈফিয়ৎ দেওয়ার ভঙ্গীতে বললেন অনেকটা দেরি করে দিলাম, আমি কনক, সত্যভূষনের বন্ধু, ওর কাছে থাকবো বলে জামসদেপুরের এক অনাথ আশ্রম থেকে আসছি, নমস্কার। অবাক হওয়ার পালা তখনো যায়নি আমার। রূপ যে এমন আকর্ষক এবং মিন্ধ হতে পারে, ওকে না দেখলে বুঝতে পারতাম না। অশ্রুও প্রতি নমস্কার করে বলল, দেরির জন্য কোন দুঃখ নেই, দুঃখটা হচ্ছে, এমন একটা মধুর মুহূর্তকে ছলনার জন্য মাটি করে দেওয়াতে। কণা নিজের হাতের কঙ্কনটা খুলে ওর হাতে পরিয়ে দিয়ে বলল, খালি হাতে তোমাকে দেখা যায় না ভাই, তাই উপস্থিত যা আছে তাই দিয়ে তোমায় বরণ করে নিলাম, আমার ও প্রান্তিকের তরফ থেকে। ওটা ফিরিয়ে দিয়ে দিদিকে অপমান করো না। অবাক শুধু কনক নয়, অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন সত্যভূষণবাবুও। আর আমি। ভাবছিলাম, জীবনের গ্রন্থি বোধ হয় এমনি করে হঠাৎ হঠাৎ এক অদৃশ্য সূতায় বাধা পড়ে যায়। তা না হলে, কোন অনুরাগের ছোঁয়ায়, অশ্রুকণা দিতে পারে তার মহামূল্যবান করুন, কোন এক অচেনা অজানা, কনককে। কনক, বাধা না দিয়ে, কঙ্কনটাকে পরাতে দিল নিজের হাতে, তারপর অশ্রুকণাকে প্রণাম করতে গিয়ে বলল, জানতাম না দিদি, এখানে তোমার মত কেউ আমাকে বরণ করে নেবে। তাই আমার অন্তরের শ্রদ্ধাকে তুমি ফিরিয়ে দিওনা। কনক প্রণাম করে উঠতেই তাকে বুকের মধ্যে জাড়িয়ে নিয়ে অশ্রুকণা বলল, এই বুঝি চিনেছে আমায়। তুমি অনাথ আশ্রমের মেয়ে বলে, তোমার দেওয়া শ্রদ্ধাকে ফিরিয়ে দেব ভাবলে কি করে। তারপর আমাকে প্রণাম করে ও বলল, আমাকে নিশ্চয়ই চিনতে পারছ না। আমার চিন্তায় বাধা পড়ল, কোথায় যেন দেখেছি, কিছুতেই মনে করতে পারছি না। ও আমার চিন্তাকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে বলল, থাক দাদা, অত কষ্ট করে চেনার চেষ্টা করতে হবে না। সময় মত আমি তোমাকে বলব, আমি কে? তবু সন্দেহ যায় না। নিজের মাথার চুল ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে। এই মনে পড়ছে অথচ মনে না পড়ার জন্য। অশ্রুকণা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। হঠাৎ সব মনে পড়ে যেতে বললাম আরে কুঁড়ি তুই? কত বছর পরে তোর সঙ্গে দেখা। সত্যি চিনতে পারিনি। কিন্তু তোর সঙ্গে অনাথ আশ্রমের কি সম্পর্ক? না প্রান্তিকদা কোন সম্পর্ক নেই। এই যে অশ্রুদি, এর সঙ্গে কি কোন সম্পর্ক ছিল, কিন্তু হতে তো মুহূর্তও লাগেনি। তাই যে সমাজ আমাকে বাঁচাতে পারল না, ফিরে এলে তারা জায়গা পর্যন্ত দিল না। সেই অনাথাকে অনাথ আশ্রম ছাড়া কে জায়গা দেবে? গ্রামের সেই কেলেঙ্কারি সবই মনে পড়ে গেল। প্রতিবাদ করতে গিয়ে বদনামের ভাগী হয়ে গেলাম আমিও। সেই তিক্ত স্মৃতি আর মনে করতে চাইলাম না। বললাম, ঠিকই বলেছিস? আসলে আমরা সকলে এক একজন অনাথ। দয়া করে যদি কেউ আশ্রয় দেয়, তবে সেটা তো আশ্রম, তাই আমরা এক অর্থে অনাথ আশ্রমের বাসিন্দা। পুরানো স্মৃতিচারণা করে লাভ নেই। সব সময়ে সামনের দিকে তাকা। অবশ্য তোকে আর কি উপদেশ দেব। অতীতকে ঘৃণায় প্রত্যাখান করতে পেরেছিস বলেই তো, আজ সত্যভূষণবাবুর মত মানুষের সন্ধান পেয়েছিস। ও বলল, তুমি আমায় আর্শীবাদ কর দাদা আমি যেন কেবল মাত্র তার নমসহচারী না হয়ে সত্যিকারের কর্মসহচারী হতে পারি। ওর মাথায় হাত রেখে বললাম, পারবি বোন, সত্যি তুই পারবি। এবার তা হলে কফিটা ঢাল, সত্যি তৃষ্ণা পেয়েছে।
