তোমাকে উপদেশ দেওয়া মানায় না অশ্রুদি। জানি অনেক কষ্টের। নিজের জীবন দিয়ে বুঝি। ওর মত ছেলেকে ভুলে থাকা সম্ভব নয়। তবু যা তোমাকে বলতে চাইছি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ। তপতী।
তারিখের দিকে চোখ বুলিয়ে দেখি প্রায় সাতদিন আগে লেখা চিঠি। আমার ভিতর যে কি তোলপাড় আরম্ভ হয়ে গেল তা বোঝাবার নয়। অশ্রু খানিকটা অভিমানে আর খানিকটা নিজের অসহায়তার জন্য, ওর ঘরে গিয়ে আলো নিভিয়ে দিয়ে উপুড় হয় শুয়ে আছে, আমি আস্তে আস্তে উঠে গেলাম ওর কাছে। শাড়ীর আঁচলটা খানিকটা সরে গিয়ে পিঠটাকে উন্মুক্ত করেছে। আমার আলতো হাতের স্পর্শ সেখানে রাখতেই ও বলল, না প্রান্তিক না, এভাবে তুমি আমায় ছোট করো না। আমি বললাম, কেন তুমি আমায় বুঝতে চাইছো না, ভিতরে যতই আগুন জ্বলুক, তোমাকে ছোট করব এ তুমি ভাবলে কি করে? যার আলাদা কোন অস্তিত্ব নেই প্রান্তিক ছাড়া, তাকেই করবে প্রান্তিক অপমান, এই বিশ্বাস নিয়ে তুমি আমার স্মৃতি বয়ে নিয়ে চলেছো? একবার তাকাও আমার দিকে কণা। দেখ আমাকে। জানতে চাইবে না গোপন পায়ে কেন তোমার ঘরে এসেছি? না গো না এমন করে বলল না। বলেই পাশ ফিরে সে আমাকে টেনে নিলো একেবারে তার বুকের কাছে। তারপর বলল, যেভাবে ইচ্ছে সেই ভাবে গ্রহণ কর প্রান্তিক। আমিও যে পারিছি না। ওকে জোর করে তুলে বসিয়ে দিয়ে বললাম, পারতে তোমাকে হবেই কণা। আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চল। কোথায়? এই রাত শেষে ভোরের সূর্যের দিকে। চলনা ওই ফাঁকা আকাশের নীচে। মনকে যেখানে প্রসারিত করা যায় দিক থেকে দিগন্তরে। সত্যি যাবে? হ্যাঁ যাবো। তোমাকে যে আমার অনেক কথা বলার আছে কণা। চল তা হলে। তারপর বলল, একটু দাঁড়াও। আমি বসে রইলাম। ও আমার সামনে দিয়ে ড্রেসিংরুমে ঢুকে গেল। প্রায় আধ ঘন্টা পরে যখন বেরোল, তাকে যেন চেনা যায় না।
পরেছে সব থেকে দামী লাল বেনারসী। কানে পরেছে ঝুমকো দূল। মূল্যবান স্বর্ণালংকারে সাজিয়েছে কণ্ঠদেশ থেকে বুক, সেখান থেকে নাভি। দু হাতে বেশ কয়েকটি আংটি। সুন্দর করে বেধেছে খোঁপা, চোখে দিয়েছে কাজল। তারপর আমার কাছে এসে একটি প্যাকেট আমার হাতে তুলে দিয়ে বলছে, পোষাকটা বদলে নাও। বললাম এই এতো রাতে এমন সাজে সেজে তুমি কোথায় যেতে চাও কশা? কৌতুকে মুখ ভরিয়ে দিয়ে বলল, সত্যভূষণ যে সময়টুকু চুরি করে নিয়েছে তোমার কাছ থেকে, সুদে আসলে তাকে ফিরিয়ে দিতে। আমি তবুও স্থানুবৎ দাঁড়িয়ে আছি দেখে বলল, কি হল, বদলাবেনা পোষাক? আমি বললাম, না থাক। কেন তোমার কশাকে জানতে ইচ্ছে করেনা? করে ভীষণ ভাবে করে। তবে? আমি ভয় পাচ্ছি কশা। কেন? এ আলোক যে চোখ ধাঁধানো। পথের অন্ধাকার কাটে বটে, কিন্তু সম্মুখটা হয়ে যায় আরো অন্ধকার। ও বলল, আমি তো মাত্র একটি রাতও নয় অর্ধেক রাত তোমার কাছে ভিক্ষে চাইছি। সেলিনা থাকুক তোমার চিরদিনের জন্য। মাত্রতো অর্ধেকটা রাত, পারনা সেটুকুও আমাকে দিতে? বললাম, কি করতে হবে। প্যাকেটটা দেখিয়ে বলল, ওটা পরে এস। আমি তাই করলাম, তারপর ওর কাছে এসে বললাম চল।
বিশাল বাগানের মধ্যে যে বেদী, সেখানে এসে বসলাম আমরা। ও বসল আমার পাশে। তারপর নিজের আঙুল থেকে একটা আংটি আমার আঙুলে পরিয়ে দিয়ে বলল, কথা দাও জীবনে যত ঝড় ঝাঁপটা আসুক, ওটা তোমার হাত থেকে কখনো খুলবেনা। বললাম যদি মুহূর্তের অসতর্কতায় খুলে ফেলি, কি হবে? জানিনা কি হবে? কিন্তু আমার মন বলছে, সেদিন তোমার কণার মৃত্যু হবে। আমি আবেগ মথিত কণ্ঠে বললাম কণা! ও আমার একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলল, আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখ, নীল আকাশ যেন জোছনায় স্নান করে সূর্যের প্রতীক্ষায় আছে। তারপর বলল, আমার দানের প্রতিদান দেবে না কিছু আমায়? বললাম বোস। ও বসে রইল। আমি উঠলাম। সারা বাগান যেন ফুলের বন্যায় ভাসছে। তুলে নিলাম গোলাপ ও চন্দ্রমল্লিকা। তারপর একটা একটা করে তার খোঁপায় গুঁজে দিয়ে বললাম, আর কি চাও। আজ তো আমি ভিখারিনী প্রান্তিক, যা তুমি দেবে তাই নেবো দুহাত ভরে। বললাম তাহলে এস আমার কাছে। ও এগিয়ে এলো। থর থর করে কাঁপছে ও। তৃষ্ণাব্যাকুল ওষ্ঠ প্রান্ত বারবার ছুঁয়ে যেতে চাইছে ওকে। কিন্তু সবই ব্যর্থ, পারলামনা। সমস্ত পৃথিবী যেন ঘুরতে লাগল। আমি নিজেকে সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়ে যাওয়ার আগে, দুহাত দিয়ে ও আমাকে তুলে নিল তার বুকের মধ্যে। আর আমার মনে হতে লাগল, রেহানাই যেন দুই পাশে বেঁধে নিয়েছে আমাকে। আমি অস্পষ্ট উচ্চারণে বলতে লাগলাম কেন এমন করে পালিয়ে গেলে? কার প্রতি অভিমান করে? একবারও ভাবলেনা আমার কি হবে? আমি কি করব? নিজেকে মহান করতে গিয়ে আমাকে এত ছোট করলে কেন? আজো নিজের পরিচয় দিতে এত ভয়? মিথ্যা পরিচয়ের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে আজো কি তোমার শাস্তি দেওয়া সম্পূর্ণ হয় নি? কি চেয়েছিলে তুমি আমার কাছে? আমাকে নিয়ে যদি পথ চলতে না পারবে কেন তবে মিথ্যে আশ্বাসে বুক ভরিয়ে দিয়েছিলে? তুমি তো বলেছিলে আবার আসবে। এই কি তোমার আসা? তোমার জন্য পথ চেয়ে বসে আছে আমার মা, একবার দেখবে না তাকে? এত অভিমান?
অশ্রুকণা বলল, প্রান্তিক এসব কি বলছ? আমি যেন তার কথা শুনতে পাইনি। নিজের মনেই বলে চলেছি, আসলে তুমি কোন দিন আমাকে চাওনি, মিথ্যেই তোমার প্রেমকে বড় করে দেখেছে অশ্রুকণা, সেলিনা এমনকি তপতীও। তারপরও বলে চলেছি, রেহানা, এখনো কি তোমার পথ চলা শেষ হয়নি। এখনো কি মনে কর অশ্রু ও সেলিনার পরীক্ষা দেওয়া শেষ হয় নি? একদিন মনে হতো তুমি দেবী, আজ তোমাকে অভিনেত্রী ছাড়া আর কিছু মনে হয় না রেহানা। ভেবেছিলে রুকসানা নামের মেয়েটাকে কেউ চিনবে না। কিন্তু তোমকে চিনতে কারো বাকী নেই। কি লাভ হলো? ডালিম তোমার জন্য এ পৃথিবী থেকে চলে গেল। তোমারি জন্যে সেলিনা আজ বিকার গ্রস্থ। আর তোমারি জন্যে আজ অশ্রুকণা রিক্ত নিঃস্ব। যে তার সর্ব তোমার হাতে তুলে দিতে পেরেছিল, দেখেছে তার মন? যার করুণায় নিজেকে তুমি গরবিনী মনে কর, দেখে যাও, শুধু একবার দেখে যাও তার ভিখারিনী রূপ। কি পেয়েছে সে দেখবেনা? হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে শুয়ে আজো তুমি মিথ্যে করে বলে যাও তুমি রেহানা নও, তুমি রুকসানা। দাঁড়াও রুকসানা পালিয়ে যেওনা। আমি আসছি। তপতীকে ফাঁকি দিতে পারলেও, আমাকে দিতে পারবেনা।
