অশ্রুকণা অবাক হয়ে বলল, তোমার মনের নাগাল আজো পেলাম না। তুমি কি আমায় ঠাট্টা করছ? না কণা মোটেই ঠাট্টা নয়। যা সত্যি তাই শুধু চাইছি তোমার কাছে। না প্রান্তিক এটা সত্যি নয়। তুমিতো আমার ঠিকানা পেয়ে গেছে। হয়তো পেয়েছি কিন্তু পৌঁছাতে পারিনি। এভাবে আমায় দুর্বল করে দিও না প্রান্তিক। তা হলে তুমি দুর্বল হয়ে যাচ্ছ বল? অশ্রুকণা বলল, দুর্বলতাই মানুষের ধর্ম, তার ভালবাসার আধার, তার অহংকারের ধন। যেদিন সত্যি আরো দুর্বল ছিলাম, সেদিন তুমি ফিরেও তাকাও নি। আজ এসেছে করুণা করতে। কিন্তু প্রান্তিক, আজ যদি আমি তুমি যা চাইছো, তা দিতেই চাই, তুমি নিতে পারবে তো? দিয়েই দেখনা। তারপর ওর একখানা হাত নিজের বুকের পরে রেখে বললাম, হাত দিয়ে বুঝতে পারবে এখানকার কান্নার ওজন, যদি না পার, অদ্ভুত কান পেতে শোন কি ভাবে কাঁদছে এ মন তোমার জন্য। আমার জন্য নয়। তবে কার জন্য? ওখান কার কান্না শুধু সেলিনার জন্য। বললাম তুমি ওকে হিংসা কর? যদি করতে পারতাম, তোমার কাছে পৌঁছাবার ঠিকানা হারিয়ে ফেলতাম। তারপর বলল জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখ, বিকেলের রোদ ফিকে হয়ে এসেছে, হলুদ গোলাপী আভায় আকাশে কে যেন আবীর ছড়িয়ে দিয়েছে। পারবে কি তোমার অনুরাগের আবিরে আমায় রাঙিয়ে দিতে।
ভিতরের আবেগে থর থর করে কাঁপছি আমি, আর সেই আবেগে ওকে আকর্ষণ করতে চাইলে, ও বাধা দিয়ে বলল, প্রান্তিক, কেন এই দেহটা নিয়ে টানাটানি করছ। আমাকে আলাদা করে পেতে চেওনা, তাতে আমাকেও পাবে না, সেলিনাকেও হারাবে। আমি ওকে ছেড়ে দিয়ে বললাম, জানতাম কণা, কিছুই নেই তোমার দেওয়ার। অশ্রুকণা বলল, আমার কোন আলাদা অস্তিত্ব থাকলে নিশ্চয়ই তোমাকে দেওয়ার থাকতত প্রান্তিক। আমি তো মিশে আছি তোমাতে কি নেবে আলাদা করে আমার কাছ থেকে। ওই বুঝি সীতা এলো। তুমি উঠোনা আমি আসছি।
সীতা নয়, এলেন সত্যভূষণবাবু। অশ্রুকণা বললেন, আপনি? হ্যাঁ আমি। আসতে হলো। অসময়ে আসবার জন্য আমি দুঃখিত অঞদেবী। বুঝলাম না। তাছাড়া আমার কোয়ার্টারে এসেছেন, এখনো সন্ধ্যা হয়নি। এতে আবার সময় অসময়ের কি আছে? সত্যভুষণবাবু শুধু বললেন, স্যার আজকে আসতে পারবেন না। তাই আপনাকে বলতে বললেন, আপনি যেন চিন্তা না করেন। অশ্রুকণা উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন আসতে পারবেন না? না, আর তাই আপনাকে একটা চিঠি দিয়েছেন। ওতেই যা জানাবার জানিয়েছেন। আমাকে শুধু বলেছেন, যদি আপনারা যেতে পারেন, তা হলে যেন সকাল ৭টায় প্রস্তুত থাকেন। আমি গাড়ী নিয়ে আসবো। কোথায় যেতে হবে? সেতো জানিনা। উনি এখন আছেন কোথায়? এখান থেকে প্রায় ২৫ কিমি দূরে এক আদিবাসীদের গ্রামে। সেখানে উনি গেলেন কেন? ওনার সঙ্গে আর কে কে আছেন? আমি কিছুই জানি না অশ্রুদেবী। উনি যা বলার চিঠিতে বলেছেন, আপনি শুধু চিঠিটা পড়ে জানিয়ে দিন কাল সকালে গাড়ীর প্রয়োজন আছে কি না। অশ্রুকণা বললেন, ভিতরে আসুন।
সত্যভূষণবাবু ভিতরে এলে আমি উঠে বসলাম। উনি আমাকে দেখে বললেন প্রান্তিক বাবু যে, কবে এসেছেন? কাল খুব ভাল কথা। আছেন কেমন? ভালো। আনন্দের কথা, কিন্তু আপনাকে দেখেতো মনে হচ্ছে না আপনি খুব ভাল আছেন? কি করে বুঝলেন? দুটো চোখ লাল, মনে হচ্ছে খুব কান্নাকাটি করেছেন অথবা জ্বর এসেছে? আমি হাসতে হাসতে বললাম, এর কোনটাই নয়, সত্যি আমি ভাল আছি তা আপনি কেমন আছেন? আমি সব সময় ভালো থাকি। এটাতো ভাল থাকার লক্ষণ নয়। নয় বুঝি? তাহলে ভাল নেই। আসলে জানেন কি প্রান্তিক বাবু, আপনাদের শহরের মান দণ্ডে এখানকার ভালমন্দ থাকা না থাকা নির্ভর করে না। এখানে সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া একটা শক্তি। যারা পারেন, তাদের কাছে ভাল থাকা না থাকা এই কথার এপিঠ ওপিঠ।
ততক্ষণে অশ্রুকণার চিঠিটা পড়া শেষ হয়ে গেছে। ও সামনে এসে বললেন, কাল সাতটায় প্রস্তুত থাকবো। আপনি ব্যবস্থা করুন। আমি ওর কোন কথা বুঝতে পারলাম না। শুধু অবাক হয়ে ওদের দুজনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সত্যভূষণবাবু বললেন তা হলে উঠি অশ্রুদেবী। উঠবেন? চা বা কফি? কেন বার বার আমাকে এসব খেতে বলেন, জানেন তো এসব আমি খাইনে।
অশ্রুকণা বলল জানতাম না, তবে জেনে নিলাম। ভবিষ্যতে এ ভুল হতে হবে না। ভবিষ্যতের কথা থাক। আপাততঃ আজ রাতে কি আপনাকে এবং প্রান্তিক বাবুকে আমি নিমন্ত্রণ করতে পারি? অশ্রুকণা একটু হেসে বললেন, হঠাৎ নিমন্ত্রণ। না এমনি! এমনি এমনি কেউ নিমন্ত্রণ কবে নাকি? ঠিক জানিনা অশ্রুদেবী আমি এমনি এমনি নিমন্ত্রণ করি কিনা। তবে অনেক দিন ভেবেছি এখানকার সকলে আমার ওখানে যান, শুধু আপনি ছাড়া। তাই মনে হল আপনাকে বোধ হয় নিমন্ত্রণ না কবলে যাবেন না। আর সে জন্য উপলক্ষ খুঁজছিলাম। আজ হঠাৎ একটা উপলক্ষ জুটে গেছে। তাই বলছি। অশ্রুকণা বলল, উপলক্ষ ছাড়াও যদি কোন দিন বলতেন, যেতাম। তা উপলক্ষটা কি? উনি সঙ্কুচিত ভাবে বললেন, আমার এক বন্ধু এসেছেন, তিনি এখানেই থাকবেন, তাই আর কি। তিনি যখন থাকবেন, তখন তো অন্য যে কোনদিন বলা যেতো। সত্যভূষণবাবু বললেন, আপনার যদি সত্যি অসুবিধা হয় তাহলে থাক। এই দেখুন, রাগ করলেন তো! না না তা হবে কেন? অশ্রুকণা বলল, আমি যাব। আব প্রান্তিক বাবু? ওকেও নিয়ে যাবো। কটায় যেতে হবে। যখন খুশী। বা যখন খুশী কোথাও যাওয়া যায় নাকি? কোন অসুবিধা নেই অশ্রুদেবী। আপনারা যতক্ষণ না যাবেন, বন্ধুকে নিয়ে আমি জেগেই থাকব। না জেগে থাকার দরকার নেই, আমরা রাত ৮টার মধ্যেই যাব। ধন্যবাদ বলে সত্যভূষণবাবু বেরিয়ে গেলেন। কিন্তু ফিরে এসে বললেন, আর একটা কথা। অশ্রুও কি বলেন তা শোনার জন্য অপেক্ষায় রইল। সত্যভূষণবাবু বললেন, সীতার ছেলেটির জ্বর খুব বেড়েছে। ও আসতে পারবেনা। তাই রাতে যদি আমার ওখানে যা হোক কিছু খেয়ে নেন! অশ্রু অবাক হয়ে বললেন আপনার ওখানে? কে রান্না করবে আপনি? মিথ্যেই খোঁটা দিচ্ছেন অশ্রুদেবী, রান্না আমি খারাপ করিনা। তবু যদি আপনারা রাজী হন, তাহলে আমি এবং আমার বন্ধু ভাগাভাগি করে রান্না করবো। হাসি সজোরে চেপে রেখে অশ্রু বলল, বাড়ীতে এসে আবার রান্না ঘরে ঢুকতে হবে নাতো। সে আপনার অভিরুচি বলে, উনি চলে গেলেন।
