বিকেলে আমায় একা পেয়ে অশ্রুকশা জিজ্ঞাসা করল, সেলিনাকে কেন রেহানা বলে ডাকছেন প্রতীমবাবু। এর উত্তরে অনেক কথা বলতে হয়। বলতে হয় খুটিনাটি সব। কিন্তু কোন উত্তর দিতে ইচ্ছে করছেনা। প্রতীমকাকু সেলিনাকে নিয়ে বেরিয়েছেন, বলে গেছেন রাত হবে। এ সময়টুকু অশ্রুকণা আর আমি একেবারে একা। ওর হয়তো অনেক কথা বলার আছে, আমারও যে নেই, তা নয়। মাত্র এ কয়দিনেই নিজেকে খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছে। বললাম, সেতো প্রতীমকাকু বলতে পারবেন, আমি কি করে বলব? তুমি কি কিছুই জানো, না বলতে চাওনা। বলতে চাইলেই কি সব কথা বলা যায় কশা। পারবে তুমি বলতে যা তোমার বুকের মধ্যে জমা হয়ে আছে এত দীর্ঘদিন। কেন পারবনা প্রান্তিক? তুমি যদি শুনতে চাও আমি নিশ্চয়ই বলতে পারব। শুনতে না চাইলে বুঝি তোমার বলার কিছু নেই। আছে। তবে তাই বল। থানা ওসব কথা। অশ্রুকণা বলল, কি যেন লুকাচ্ছো তুমি। না, কণা, লুকাবার কিছু নেই। সত্যি আমি ক্লান্ত। আমি আর পারছি না। কি হয়েছে তোমার বলতো তুমি তো এমন ভাবে কথা বল না। সেলিনা কি তোমাকে কোন ভাবে আঘাত দিয়েছে? না কণা, ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। ও আমাকে আঘাত দিতে চায় না। আমার সব শূন্যতা ও একাই ভরে দিতে চায়। আর এই খানেই আমার ক্লান্তি। বিশ্বাস কর, ওর মধ্যে আমি মুক্তি চেয়েছিলাম। অশ্রুকণা বলল তোমার হেঁয়ালি কথা আমি বুঝতে পারছি না প্রান্তিক। আমি অন্য প্রসঙ্গ টেনে এনে বললাম, সত্যভূষণবাবু কেমন আছেন? অশ্রুকণা বলল, নিজের মনের ঠিকানা খুঁজছো? মানে? মানে তো অতি সহজ, সত্যভূষণবাবুর সঙ্গে আমার কি সম্পর্ক, যে তিনি কেমন আছে, সেটা আমার জানা দরকার। কোন সম্পর্কই কি নেই? তুমি আমায় সন্দেহ করছ? এ তুমি কি বলছ? তোমাকে কেন সন্দেহ করব? তা না হলে ওর কথা জিজ্ঞাসা করে আমার কাছ থেকে তুমি কি জানতে চাইছো?। জানতে চাইছি তোমার মনের ঠিকানা। তাই বল। অর্থাৎ সত্যভূষণবাবুর যাবতীয় ব্যাপার আমি জানলে আমার মনের ঠিকানার সন্ধান তুমি পেয়ে যাবে তাই না? তুমি এভাবে বলছ কেন? তিনি তো তোমার একজন হিতাকাঙ্খী না প্রান্তিক, তিনি এই প্রতিষ্ঠানের হিতাকাঙ্খী। প্রয়োজন না হলে তিনি এখানে আসেন না। আর যদি উনি আসেন আমার অস্বস্তি হয়। কেন? সব কেনর উত্তর দেওয়া যায় না। তুমি এখানে এলে কেন পারবে দিতে উত্তর? তোমাকে দেখতে। আমাকে তো সেলিনার মধ্যে প্রতিমুহূর্তে দেখ তুমি। দেখনা? আমি অবাক হয়ে বললাম, তোমরা কেউ বোধ হয় সোজা কথা বলতে পারনা, তাইনা? সোজা কথাতো তুমি শুনতে চাওনি। তুমি যা জানতে চাইছো তা হবে না। আমার পথে আমাকে চলতে দাও। তারপর বলল, দেখবে আমি কেমন আছি বলে তার গলায় সর্বক্ষণ চেনের সঙ্গে লাগানো থাকে যে লকেটটা, তা চাপ দিয়ে খুলে ফেলে আমার সামনে মেলে ধরল। আর আমি অবাক হয়ে দেখলাম আমার দেওয়া ফটোটা লকেটের মধ্যে। আমার বিস্ময় কাটবার আগেই, ও আবার লকেটটা বন্ধ করে গলায় পরে নিল। তারপর বলল, দেখলে তো আমি কেমন আছি। আমি শুধু বললাম কণা। ও বলল, থাক, এসব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। সত্যি তোমাকে খুব ক্লান্ত লাগছে, যদিও তোমার ক্লান্তি দূর করবার আমার কোন উপায় নেই, তবু এই সময়টুকুকে অন্তত তোমার জন্য ব্যয় করতে দাও। কি করবে তুমি। শুধু তোমার পাশে থাকবো। পাশে থাকতে থাকতে যদি অন্য কোন ইচ্ছে তোমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায়। ভয় নেই প্রান্তিক, আমি যা পেয়েছি, তাতে যেমন আমি নিজেও ভাবনা, অন্যকেও ভাসাবো না। আমি বললাম, কেন তুমি জীবনটাকে এমন নিঃসঙ্গতার মধ্যে দিয়ে শেষ করে দিতে চাইছছ? ও বলল, নিঃসঙ্গতার খোঁটা দিচ্ছ? বলত সেলিনাকে বুকের মধ্যে নিয়ে তাকে আদর করতে করতে তুমি নিঃসঙ্গতা অনুভব কর না? কঠিন প্রত্যাঘাত? কি উত্তর দেব এর? আমি কোন উত্তর না দিয়ে চুপ করে আছি দেখে ও বলল, জানি এর তুমি কোন উত্তর দিতে পারবেনা। তুমিতো হেরে গেছে প্রান্তিক। জীবনের সর্বক্ষেত্রে হেরে গেছে। সেলিনাকে পেয়েও তুমি পাওনি। আর ও কখনো অশ্রুকণা কখনো রেহানা এই গোলক ধাঁধায় পথ হারিয়ে ফেলেছে। ও হয়তো জয়ী হয়েছে, কিন্তু পানি তোমাকে। তুমিও পাওনি ওকে। অথচ উভয়ে উভয়ের প্রতি তীব্র আকর্ষণের চোরাবালিতে কেবলি হাবুডুবু খাচ্ছ? বল সত্যি কিনা।
আমি আর কথা বলতে পারছি না। গলাটা শুকিয়ে আসছে। বললাম একটু জল খাওয়াবে? হায় প্রান্তিক শুধু জলে কি মিটবে এই আবক্ষ তৃষ্ণা? আমি আর থাকতে না পেরে বললাম, তা হলে এক বোতল মদ নিয়েই এসো। হেসে অশ্রুকণা বলল প্রান্তিক, মদেও মিটবেনা তোমার এ তৃষ্ণা। অংক তোমার মেলেনি। অথচ আনন্দে ভাবছে তোমার অঙ্ক বুঝি মিলে গেলো। তুমি পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের সেই লাইনগুলো জান? কোন গুলো? ওই যে যেখানে
নকশী কাঁথার মাঠের নায়িকা বলছে,
“মন সেতো নয় কুমড়ার ফালি
যাহারে তাহারে কাটিয়া বিলানো যায়।
তোমারে যা দিছি, অপরে তা চায়
কি হবে উপায় হায়”
তাই বলছিলাম, মনটাকে কুমড়ার ফালি করতে গিয়েই যত বিপত্তি। বললাম, কবি বললেও আমি তা মানিনা। কেন? মনের উপর আমার কোন অধিকার নেই বলেই, তাকে আমার ইচ্ছে মত চালনা করতে পারিনা। ওতো বেহুলার বাসর ঘর। যতই চেষ্টা করোনা কেন, ফঁক তার থাকবেই। সেই ফাঁককে ভরাট করতেই তুমি এখানে এসেছো? সত্যি তাই। দেবে আমার সেই ফাঁকা জায়গাটা সিমেন্ট দিয়ে গেঁথে।
