নীলাঞ্জনা রান্না ঘরে গেলে মিনতি সেন বললেন, কি রাঁধি বলত। রান্নার অভ্যেস একদম নেই, আগে মা করতো। তারপর জবার মা। তারপর কালে ভদ্রে রান্না ঘরে এলেও যাকে রান্না বলে তা কোন দিন করিনি। তাহলে জবার মাকেই বল না রান্নাটা করে দেবে। কিন্তু ওর কাকু যে আমার হাতে রান্না খাবেন বলেছেন, কি করি বলত। কি আর করবে, খেতে যখন চেয়েছেন যা পার তাই কর, যদি খেতে না পারেন। হেসে ফেলে নীলাঞ্জনা বললেন, পারবে মিনতি পারবে। ভালবাসার আকর্ষণে পারা যায় না এমন কিছু নেই। তোমার সব তাতেই ঠাট্টা। ঠাট্টা নয় ভাই, এমনতো নয় যে, তোমার হাতের রান্না তিনি আগে খান নি। সেদিন অসুস্থ মানুষটাকে তো তুমিই খাইয়েছিলে, তা যখন খাওয়া গেছে আজো যাক চিন্তা করো না। বরং তমি চা বা কফি দিয়ে এস, আমি দেখছি।
দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পরে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে প্রতীমবাবু বললেন, তাহলে মিস সেন এবারে আমাকে উঠতে হবে। সেলিনা তার আগেই সেজে গুঁজে প্রস্তুত। আমাকে বলল, তুমি যাবে না? না, আমি কি করে যাব বল? আমি একা যাব? তাইতো কথা হয়েছে। না কখনো হয়নি, এ তোমার অজুহাত মাত্র তা হলে আমিও যাব না। ছেলেমানুষি করো। সবাই কি ভাববে? কিছু ভাববে না, তোমাকে যেতেই হবে। গিয়ে কি করব, কালতো তোমরা অশ্রুর ওখানে যাবে। তুমিও যাবে। কি যে গোঁয়ারতুমি কর।
নীলাঞ্জনা পিসি এগিয়ে এসে বলেন, প্রান্তিক তুমিও যাওনা ওর সাথে। মিনতি সেনও বল্লেন যা প্রান্তিক। বাধ্য হয়ে আমাকে বলতে হয় তুমি এখন কাকুর সঙ্গে চলে যাও। আমি রাতে যাবে। ঠিক আছে, বলে সেলিনা আস্তে আস্তে নেমে গাড়ীতে গিয়ে ওঠে।
শেষ পর্যন্ত সেলিনার নাছোড় বান্দা পনে আমাকেও আসতে হয় অশ্রুদের এখানে। প্রতীম বাবু কাউকে না জানিয়ে এখানে এসেছেন। উঠেছেন সত্যভুষণবাবু যে কোয়ার্টারে থাকেন সেখানে। সেলিনা বলল, তুমি আমাদের সঙ্গে থাকবে না কাকু? কেন মা আমিতো কাছেই আছি। যে দু তিন দিন থাকব রোজ তোমাদের কাছে আসবো। অশ্রুকে বলবে, আমি ওর ওখানেই খাব, তা হলেতো তোমার আর কোন অভিমান থাকবে না। বেশ, কিন্তু এখন তুমি যাবে না আমাদের সঙ্গে? না মা, আমি কোয়ার্টারে গিয়ে জামা কাপড় বদলে আসি, ততক্ষণ তোমাদের চা বা কফি হয়ে যাবে। আমি এসে খাবো।
গেট খুলে আমাদের ঢুকতে দেখে সীতা চিৎকার করে বলে ওঠে দিদিমনি, দাদাবাবু এসেছেন। অশ্রু বুঝতে না পেরে বলে, কে এসেছেন? সেলিনা ততক্ষণে ঘরে ঢুকে অশ্রুকে জড়িয়ে ধরে বলে চিনতে পাবছোনা? শুধু হাসছে সেলিনা। তাহলে, অশ্ৰুদিকে মনে পড়েছে তোমার? তারপর আমাকে বলল, কি হলো প্রান্তিক চুপ চাপ আছে যে। না দেখছি তোমাকে। কি দেখছো? দেখছি ভারি সুন্দর হয়েছে তুমি। তা কেমন আছ কণা? খুব ভাল। সেলিনা বলল, শুধু আমরা দুজন আসিনি অদি, আরো একজন এসেছেন? কে? বলতো কে? কি করে বলি। এক এক করে নাম ধরে ধরে বলতে আরম্ভ কর, দেখবে ঠিক এক জায়গায় এসে মিলে যাবে। না ভাই অতটা পারবো না, তার চেয়ে বরং তুমিই বলে দাও কে এসেছেন? সেলিনা বলল, প্রতীমকাকু? কানটাকে যেন বিশ্বাস হচ্ছে না অশ্রুকণার। তাই পুনরাবৃত্তি করে বলল, কি যেন বললে প্রতীম …! আমি বললাম প্রতীম চৌধুরী এসেছেন, সম্ভবত তোমাদের এখানে অফিসিয়াল কাজেই এসেছেন। কিন্তু যে ২/৩ দিন থাকবেন তোমার এখানেই খাবেন। তুমি যেন সেইভাবে ব্যবস্থা কর, তাই বলে পাঠিয়েছেন। অশ্রুকণা অবাক হয়ে বলল, তুমি বলছ কি প্রান্তিক, স্যার আমার এখানে খাবেন? কই উনিতো আগে বলেননি কিছু। উনি আসবেন একথা তো এখানকার কেউ জানে না। সেলিনা বলল, অতশত জানিনে অশ্রুদি, তোমাকে কফি করতে বলেছেন উনি এখনি আসবেন।
তাড়াহুড়ো করে ভিতরে গেল অশ্রুকণা। সীতাকে বলল, একটু স্টোরে যাতো সীতা, স্টোর বাবুকে বল, আলু, পিয়াজ, ডিম, ডাল দুতিন দিনের মত দিয়ে দিতে, আর জণ্ডকে বলে মাছ জোগাড় করা যাবে সীতা! সীতা বলল, আমি দেখছি দিদিমনি, বলে বেরিয়ে গেল।
খানিক পরে এলেন প্রতীমবাবু। নিজেই এলেন সঙ্গে কেউ নেই। অশ্রুকণা তাকে বাড়ীর গেট থেকে অভ্যর্থনা করে নিয়ে এলো। বললো স্যার, এরকম হঠাৎ চলে এলেন, এখানে কোন গণ্ডগোল? দরাজ হাসিতে প্রতীমবাবু বললেন, নারে মেয়ে না। অনেক দিন তোমার খোঁজ নেওয়া হয় না, তাই ভাবলাম, প্রান্তিক সেলিনা যখন আসছে, ওদের সঙ্গে আমিও আসি। তা কেমন আছো অশ্রু। জায়গাটা ভাল লাগছে তো। হ্যাঁ স্যার। তারপর হঠাই অক্রর মাথায় হাত দিয়ে বললেন, কি স্যার স্যার করছ তখন থেকে। লজ্জা এবং ভাল লাগলেও সঙ্কুচিত ভাবে অশ্রুকণা বলল, তা হলে কি বলব? কেন, ওরা যা বলে তাই। ওরা কি বলে তাতো আমি জানিনা, তাছাড়া ওরা যাই বলুক, আমার মুখে তা মানাবে কেন? দুঃখ পেলেন প্রতীমবাবু। বললেন তুমি একথা বলছ নে অশ্রু! কথা বলতে বলতে প্রতীম বাবুকে নিয়ে অশ্রুকণা ঘরে এসে ভিতর থেকে কফি এবং সামান্য খাবার এনে সামনে রাখল। প্রতীমবাবু বললেন, আমার উত্তর কিন্তু দাওনি অশ্রু। অশ্রুকণা বলল, কি উত্তর দেব, বলুন। আপনি শুধু এই প্রতিষ্ঠানের নয়। এরকম অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। আমি সামান্য একজন কর্মী। প্রান্তিক বা সেলিনার যে অধিকারই থাকুক আপনার ওপরে আমার তা কি করে থাকবে। তাছাড়া যদি আপনি আমাকে প্রান্তিক বা সেলিনার মত একজন মনে করতেন তবে আপনি তো ওদের সঙ্গে আমার কাছে আসতেন না। তাতে আপনি করেননি। আপনি এসেছেন ওদের সঙ্গে। যে অধিকারে আপনি সেলিনা বা প্রান্তিককে বুকে তুলে নিতে পারেন, সে অধিকার তো আমার ওপর থাকতে পারে না। গলাটা ভারি হয়ে এলো, তবুও বলে চলে শুধু আজই নয়, ২/৩ মাস আগেও আপনি এসেছিলেন, এখান থেকে ২/৩ মাইল দূরে আপনাদের যে নতুন ইউনিট খুলছে সেখানে। আপনার আসার সময় হয়নি, অথচ এখানে যদি অশ্রুকশা না থেকে সেলিনা বা প্রান্তিক থাকতো, পারতেন আপনি না এসে? সুতরাং ওদের সমকক্ষতা দাবী করার অধিকার কোথায়? আমি ও সেলিনা অবাক হয়ে শুনছিলাম অশ্রুকণার কথা। হয়তো অশ্রুকণা ওর দিক দিয়ে ঠিক। কিন্তু প্রতীমকাকুর অন্তরের কথা যদি জানতো, তা হলে হয়তো নিজের প্রতি নিজে লজ্জায় তাকাতে পারতোনা। অশ্রুকণা কফি তৈরির জন্য দুধ ঢালছিল। প্রতীমবাবু এক হাতে তা সরিয়ে দিয়ে অশ্রুকণাকে নিজের কাছে টেনে এনে বললেন, সত্যি কি অশ্রু তুমি বিশ্বাস কর, আমি ওদের থেকে তোমাকে আলাদা করে দেখি। আমি তো ওদের বলিনি আমাকে কাকু বলে ডাকতে, তবু ওরা ডাকে, তুমিও তো পার ঐ ভাবে যা হোক কিছু বলে আমাকে ডাকতে। তারপর যে কথা বলেছে, এখানে প্রান্তিক বা সেলিনা থাকলে আমি আসতাম কি না। না মা আসতাম না কারণ সেদিনের আসাটা ছিল অফিশিয়াল। তাই মন চাইলেও আসা সম্ভব হতো না। আজ এসেছি তোমার কাছে, আমার সেলিনার মত আরেকটা মেয়ে অশ্রুর কাছে। আর সহ্য করতে পারল না অশ্রু। এত বড় মাপের একটা হৃদয়কে এমন ভাবে আঘাত দিল সে। কেমন করে। কান্নায় ভেঙে পড়ে পায়ের কাছে প্রণাম করে বলল, আমায় ক্ষমা করুণ কাকু। আমি বুঝতে পারিনি। তাকে পায়ের উপর থেকে তুলে নিয়ে বললেন, দুর পাগলি, বাবার কাছে মেয়ে কোন অপরাধ করে নাকি? তারপর যেন কিছু হয়নি, এমনি ভাবে, অনেক দেরি হয়ে গেল রেহানা, কফিটা মিক্সড কর। অশ্রু বলল, ও থানা কাকু আমি করছি। কিন্তু কানে তার একটা কথা লেগে আছে সেলিনাকে প্রতীমবাবু রেহানা বলে ডাকছেন, কিন্তু কেন?
