মিনতী সেন ভাবতে লাগলেন, কি অদ্ভুত মানুষ কোন লজ্জা নেই। এতবড় মেয়ের সামনে এমন ইচ্ছের কথা কেউ বলে নাকি! খেতে চেয়েছেন, আর আমি নিজের হাতে রান্না না করে হোটেল থেকে এনে খাওয়াবো, ভাবলেন কি করে? প্রতীমবাবু চলে যাওয়ার পরে, মিনতি সেন, সেলিনার বিছানায় বসে, ওর হাতের আঙুল গুলো টিপে দিতে লাগলেন। হাসছে ও মিটি মিটি। মিনতি সেন বললেন, অমন লুকিয়ে লুকিয়ে হাসছিস কেন? তোমার অবস্থা দেখে। আমার আবার কি অবস্থা। কাকু যখন তোমার হাতের রান্না খেতে চাইলো, মুখটা তোমার কেমন প্যাচার মত হয়ে গেল, কি হাসি না পাচ্ছিল তোমাকে দেখে, তা আর কি বলব, মা। খালি ঠাট্টা সব সময় ইয়ার্কি। ইয়ার্কি না মা, সত্যি। তারপর বলল এটা কিন্তু কাকুর খুব অন্যায়। কেন তুমি রায়া করবে, জবার মতো আছে। আসলে কোন কাজের লোকের হাতে উনি খাবেন না। তাই কায়দা করে বললেন, তোমার হাতে খাবেন। এদের মুখে এক মনে আরেক। তুই চুপ করবি। মিনতি সেন ধমক দিয়ে উঠলেন। আচ্ছা মা, একটা কাজ করলে হয় না? কি? রান্নাটা না হয় আমিই করলাম, তুমি বললে তুমি করেছো? খালি ফাজলামো তারপর বললেন, তুই এখন কি খাবি বল। না আমি কিছু খাব না, শুধু তোমার সঙ্গে গল্প করব। পাগলি মেয়ের আবদারের জন্যে আর পারিনে। তোমার পেরেও কাজ নেই। তারপর চিৎকার করে ডাকলো জবার মা। জবার মা কাছে এসে দাঁড়ালে বলল, কাল কাকু এখানে খাবেন জান? শুনেছি বৌদিমনি। আর মাই সব রান্না করবে তা জান? জবার মা বললেন উনি কেন রান্না করবেন, আমিই করব। এই সেরেছে, দেখেছো মা, কাকুর খাওয়াটার বারোটা বাজল। জবার মা বলল, আমি কি কোন অন্যায় করেছি বৌদিমনি। মিনতি সেন বললেন, না তুমি যাও জবার মা। সেলিনা বলল, জবার মা, তুমি চা বা কফি খাওয়াতে পারবে? এখনি আনছি। জবার মা চলে গেলে, সেলিনা বলল, কাকুকে দেখলে তুমি অত কঁপ কেন বলত মা। তোমাকে দেখলে অন্যেরা কাঁপে আর তুমি কাকুকে দেখলে কাপ। কথা বলতে গেলেও গলায় সেই জোর থাকে না কেন? মিনতি সেন বললেন তুই এখন চুপ করতো। তোর কাকু কি কি খেতে ভালবাসেন তাই বল। বা আমি জানব কি করে? জানিসনা তো অত কাকু কাকু করিস কেন? যেন কাকুই সব, আর আমরা সব বানের জলে ভেসে আসা মানুষ। কপট অভিমান দেখায় মিনতি সেন।
সেলিনা খিল খিল করে হেসে উঠলো। মিনতি সেন বললেন হাসলি যে। তোমার অবস্থা দেখে। রাগটাও প্রকাশ করতে জানো। তার থেকে চলনা মা, তুমিও কয়দিন থাকবে আমার সাঙ্গে কাকুর ওখানে। মিনতি সেন বললেন বেশ বলেছিস, সেই কাকু আর কাকু। তুই একা একা কাকুর কথা ভাব। আমার কাজ আছে।
এর মাঝে কেমন করে যেন, নীলাঞ্জনা পিসিকে সংবাদ দিয়েছেন, মিনতি সেন। তাই ভোর না হতেই নীলাঞ্জনা এসে উপস্থিত। সেলিনা বলল, মা তুমি? হারে। তা এখন ভাল আছিস তো? কি কাণ্ডটা বাঁধিয়েছিলি বলত। একটু সাবধানে থাকতে পারিসনে। জান মা, আজ কাকু আসবেন, তুমি একটা কাজ করনা। কি? কাকু কি কি খেতে ভালবাসেন একটু ফোন করে জেনে নাওনা। কেন? বা উনি যে খাবেন এখানে বলে গেছেন। মা তো জানেনইনা, তার কি পছন্দ। ও তাই বল, তাই মিনতি আমায় ফোন করে আসতে বলেছে। বাঙালী মানুষ কি আর খাবেন, মাছের ঝোল ভাত, বড় জোর সাথে মাংস। তা যাইই খানা কেন, মিনতি যাই দেবে তাইই খাবে। এতে আবার জানবার কি আছে? প্রান্তিক কোথায়? আছে কোথাও।
নীলাঞ্জনা বললেন, তুই নাকি আজ কাকুর ওখানে যাবি? প্রান্তিক যাচ্ছে? তুমি চলনা মা। কি যে বলিস সেলিনা? তোর মাথাটা একদম খারপ হয়ে গেছে। ও মৃদু মৃদু হাসতে হাসতে বলল, আমারও তাই মনে হয়।
বেলা ৯টা নাগদ এলেন প্রতীমবাবু। নিজে ড্রাইভ করে। আজ আর বাইরে থেকে ডাকলেন না। আস্তে আস্তে এসে বেল বাজালেন। নীলাঞ্জনা দরজা খুলে প্রতীমবাবুকে দেখে যেন কিছু জানেন না এমনি অবাক হয়ে বললেন, আরে আপনি? হ্যাঁ, আমি, একটু দেরি হয়ে গেল। কেন কোথাও আটকে পড়েছিলেন? না। তবে? আসলে আমি আপনার ওখানে গিয়েছিলাম। অবাক হয়ে নীলাঞ্জনা বললেন, আমার ওখানে? খুব কি প্রয়োজন? প্রয়োজন কিছু নেই। তারপর নিজেই জানতে চাইলেন আচ্ছা প্রয়োজন ছাড়া কি আপনাদের সাথে যোগাযোগ করতে নেই? আমাকে ভুল বুঝবেন না, আমি কিন্তু তা বলিনি। সে আমি জানি, আসলে আপনার মেয়েকে আমি কয়েকদিন কাছে রাখতে তাই। যদি আপনার অমত থাকে। মেয়ে আমার হতে পারে। কিন্তু ওর গার্জিয়ানতো এখন মিনতি ও মত দিয়েছে তো। হ্যাঁ, গতকাল সেটা উনি দিয়েছেন। তাহলে? তাহলেও আপনিতো ওর মা? কথা বলতে বলতে ওরা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছেন। নীলাঞ্জনা বললেন, আসলে আপনি এখনো আমাদের একজন হয়ে উঠতে পারেন নি। কি করে বুঝলেন? যদি পারতেন, তা হলে এত শিষ্টাচারের ভিতর দিয়ে এগোতেন না। অধিকার এভাবে পাওয়া যায় না মিঃ চৌধুরী। কেউ অধিকার দেয় না। অধিকার অর্জন করে নিতে হয়। আজ যদি আমি বলি, না ও যাবেনা। আপনি নিশ্চয়ই ওকে নিয়ে যাবেন না। না তা কি করে যাই। যদি ওকে না নিয়ে যান, ওর মনের কি অবস্থা হবে ভেবে দেখেছেন? ওতো ওর কাকুর কাছে যাওয়ার জন্য সেই সকাল থেকে সেজে গুঁজে বসে আছে। তা হলে আমার কি করণীয় বলুন। শুধু একটু জোর খাটাতে বলেছি। আর কিছু না। তারপরে বললেন শুধু অর্থের জোরটাই জোর নয়, মনের জোরটাও দরকার। আর তার জন্য দরকার ভালবাসার অধিকার বোধ। এরপর প্রতীমবাবুকে উপরের ঘরে পৌঁছিয়ে দিয়ে বললেন, যান, আপনি, মেয়ের সঙ্গে গল্প করুন আমি আসছি।
