মিনতি সেন অবশ্য তার আগেই, সেলিনার রক্তে ভেজা শাড়ী বদলিয়ে দিয়ে তাকে নতুন শাড়ী পরিয়ে, চুল আচড়িয়ে দিয়ে, আবার বিছানায় শুইয়ে দিয়েছেন। ডাঃ মুখার্জী তাকে দেখলেন। তারপর প্রেসক্রিপশান লিখে দিয়ে চলেও গেলেন। প্রতীম বাবু জিজ্ঞাসা করায় ডাঃ মুখার্জীকে বলেন, না ভয় নেই। শুধু নাসিং হোমে ভৰ্ত্তি করে একটা ছোট্ট অপারেশান করতে হবে। এতে খুব মানসিক আঘাত পাবেন উনি, তাই ওর মনটাকে দেখার দায়িত্ব আপনাদের। তারপর ডাঃ মুখার্জী জিজ্ঞাসা করেন, আপনি ওকে রেহানা বলে ডাকছিলেন, রেহানা কে? প্রতীমবাবু সংক্ষেপে রেহানার ইতিহাস ডাঃ মুখার্জীকে জানান। ডাঃ মুখার্জী জানান, একজন সাইকোলোজিস্টকে দেখালে ভাল হয়। আপনি যা বললেন, তাতে মনে হচ্ছে, রেহানার ভীতি তার মন থেকে যাওয়ার নয়। একটা অপরাধ বোধও ভিতরে ভিতরে কাজ করছে। সব থেকে ভাল হয়, যদি রেহানাকে খুঁজে পাওয়া যায়। প্রতীম চৌধুরী বললেন, কিন্তু তাতে উল্টেটাতো হতে পারে। সেই জন্যই তো একজন সাইকোলজিস্ট দেখাতে বলছি। তবে আমার মনে হয় আপনি যা আশঙ্কা করছেন তা হবেনা। বরং রেহানা যদি সামনে এসে ওকে মেনে নেয় তাহলে হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু যদি তাকে না পাওয়া যায় তাহলে মাঝে মাঝে এরকম অস্বস্তিকর অবস্থার সম্মুখীন হওয়ার ভয় থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকছে। আরো বললেন, আপনি যখন বলছেন, রেহানা চলে যাওয়ার পরেও ২/৩ জায়গায় গেছেন, তাহলে নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও তিনি আছেন, একবার দেখুন না চেষ্টা করে। আর তার সন্তান, যার জন্য সে স্বপ্ন দেখছে, সেই স্বপ্ন ব্যার্থ হয়ে গেলে কি হবে? ডাঃ মুখার্জী বললেন, আমি আশাবাদী মিঃ চৌধুরী। এতরক্ত ক্ষরণের পরেও আমি মনে করি তার সন্তান ভালই আছে। আর একান্তই যদি ভুল প্রতিপন্ন হই, কি আর করা যাবে। আবার নতুন আগুন্তুকের অপেক্ষায় থাকতে হবে। কিন্তু সবার আগে দরকার রেহানাকে একবার খুঁজে পাওয়া। আমি দেখছি, নমস্কার।
প্রতীমবাবু ফিরে এলেন। মিনতি সেন বললেন, সেই আসার পর থেকেই একটানা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ছেন, শরীরও তো আপনার ঠিক সুস্থ নয়। একটু বসুন না। হ্যাঁ বসি, সত্যি ক্লান্তি লাগছে। তা হলে এক কাপ গরম কফি দিই। হলে মন্দ হতোনা, ওই যে কে যেন জবার মা, ওকেই বলুন না, কড়া করে এক কাপ কফি। আমিই নিয়ে আসছি, আপনি বসুন। সেলিনা বলল, কাকু, তুমি আমাকে রেহানা রেহানা বলে ডাকলে কেন? আমিতো সেলিনা। কি জানি ঐ নামটাই বেরিয়ে গেল তোমাকে ডাকতে গিয়ে। ওকে আপনি চেনেন? দেখেছেন কখনন? শুনেছেন ওর কথা কিছু? না, শুনিনি, তবে নামটা তোমাদের মুখে এতবার শুনেছি যে, ভুলতে পারিনি, তাই হয়তো অসতর্কতায় বেরিয়ে গেছে। সে না হয় ভুল করে আমি তোমায় ডাকলাম, কিন্তু তুমি অমন দৌড়িয়ে এলে কেন?
জানিনা কাকু, তবে ওই নামে আমাকে কেউ ডাকলে আমার ভীষণ ভাল লাগে। ভাল যদি লাগে তা হলে সকলকে তো বলতে পারো তোমাকে ওই নামে ডাকতে। বলেছিতো, কিন্তু কেউ ডাকে না। এতদিনের অভ্যেসতো মা তাই হয়তো অসুবিধা হচ্ছে। তার চেয়ে তুমি এক কাজ করো। বল। তুমি আমার ওখানে চলো, আমি সব সময় তোমাকে ঐ নামেই ডাকবো। সেলিনা আমার দিকে তাকালো, বললাম যাবে কাকুর ওখানে? যাও না। তুমিও চল। আমি কি করে যাই বল। আমার তো কাজ আছে। শুধু কাজ আর কাজ। একদম সময় দাওনা তুমি আমাকে। আমি হাঁপিয়ে উঠি। এত কাজ করতে হবে না তোমার। আমি লজ্জা পেয়ে বললাম, তুমি কাকুর সঙ্গে কথা বল।
মিনতি সেন, এর মাঝে কাকে দিয়ে যেন গরম সিঙ্গারা আনিয়েছেন। সেই সিঙ্গারা এবং কফি এগিয়ে দিয়ে বললেন এটা খেয়ে নিন, আর রাতে কিন্তু খেয়ে যাবেন। মিনতি সেনের দিকে না তাকিয়েই বললেন, আজ নয় মিস সেন? কেন? একটু অসুবিধা আছে। মিথ্যে অজুহাতটা বুঝি এখনো তৈরি করতে পারেননি। না তা নয়। সেদিনও মিথ্যে বলিনি মিস সেন আসলে…। কি আসলে? থাক ওসব কথা। বরং যদি অসুবিধা না হয়, কয়েকদিন মেয়েটাকে নিয়ে যাবো? আমার কাছে অনুমতি নিচ্ছেন? অনুমতিতে নিতে হবে বৈকি। ও আপনার ছেলের স্ত্রী। আপনার সম্মতি ছাড়া আমি কি ওকে নিয়ে যেতে পারি? ঠাট্টা করছেন? না ঠাট্টা নয়, সত্যি বলছি যদি আপনি অনুমতি দেন, তা হলে ওকে নিয়ে কয়েকদিন রাখব আমার কাছে। অশ্রুদের স্কুলে একবার যেতে হবে। ভাবছি ও যদি যায় আমার সঙ্গে, ওর ভাল লাগবে, অশ্রুরও হয়তো ভাল লাগবে। সেলিনা বলল তুমি যাবে কাকু অশ্ৰুদির ওখানে? হ্যাঁ মা যেতে তো হবেই একবার। আমিও যাব তোমার সাথে। অবশ্যই যাবি, কিন্তু তোর শ্বাশুড়ীর মতটা তো আমার দরকার।
এই শ্বাশুড়ী শব্দটায় ভীষণ লজ্জা পেলেন মিনতি সেন। বললেন, আপনার মেয়ে নিয়ে যেতে চাইছেন, আমার মত দেওয়ার কোন অধিকার আছে কি না জানিনে। তবুও আমি সম্মতি দিচ্ছি, নিয়ে যান ওকে ক দিনের জন্যে। আমার এখানকার থেকে ও আপনার কাছে মনে হয় ভাল থাকবে। অনেক কথা ও আমাকে বলতে পারে না। কিন্তু আপনাকে মনে হয় ও বলতে পারবে। প্রতীমবাবু বললেন কিন্তু প্রান্তিক? না ওর সম্মতির জন্য ভাবতে হবে না, ওটা আমার উপরে ছেড়ে দিন।
প্রতীমবাবু উঠে পড়লেন এবং বললেন, তাহলে ঐ কথা রইল, আমি কাল সকালে নিজেই আসব, নমস্কার। মিনতি সেন প্রতি নমস্কার করে বললেন, তাই আসবেন, প্রতীমবাবু এক পা এগিয়ে এসে আবার পিছিয়ে গিয়ে বললেন, কাল কিন্তু আপনার হাতের রান্না খেয়ে যাবো, দেখবেন, হোটেল থেকে আনিয়ে আমার খাওয়ার ইচ্ছেটাকে নষ্ট করে দেবেন না।
