হেড কোয়ার্টারে গিয়ে ছুটির এ্যারেঞ্জমেন্ট করা হয়েছে। শিলিগুড়িতে আর ফিরে যাইনি। শুধু এর মাঝে একদিন প্রতীমকাকুর ওখানে গিয়েছিলাম, কাকুই পিসিকে ফোন করে জানিয়েছিলেন আমি যেন একবার দেখা করি। উনি বললেন, সেলিনা কেমন আছে? আমি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেছি, এসময় তোমাকে শক্ত থাকতে হবে, আর একটা সত্যি কথা বলছি যা তোমার মা ও পিসিকে বলতে পারিনি। আমি উদ্বিগ্ন হয়ে বললাম, কি কাকু! উনি বললেন দেখ প্রান্তিক, যে ভাবে কেসটা জটিল হয়ে গেছে, তাতে নর্মাল কিছু হবে না। মেজর অপারেশান করতে হতে পারে। তাতে কিন্তু, সেলিনার জীবন সংশয় আছে। আমি চোখের জলে চিৎকার করে বললাম না কাকু না। একি প্রান্তিক তুমি কাঁদছো। ধীরে ধীরে বললাম, আমার মনে হচ্ছে আমার চারিদিক শুধু শূন্য আর শূন্য। যে ভয় আপনি করছেন, সেলিনা তা জানে? হা জানে। আমি গভীব বেদনায় বলে উঠি তাই তার আচরণ স্বাভাবিক নয়। ও চায় না, আমি ওকে সেলিনা বলে ডাকি। তবে কি বলে ডাকবে? ও চায় আমি যেন ওকে বেহানা বলে ডাকি। রেহানাব প্রতি গভীর অভিমান নিয়ে ও বলে, আমি ঠকাতে চাইনি রেহানা। শুধু তোর প্রান্তিকের ক্ষত স্থানকে শুকিয়ে দেওয়ার জন্যে তার আসা। সে যেন বুঝতে পারছে তার শেষ দিন ঘনিয়ে এসেছে, তাই একটা দিনও অন্তত আমি যেন ওকে রেহানা বলে ডাকি। আসলে জানেন কাকু, ও আমাকে যেমনই ভালবাসুক না কেন, আমার জন্য ওর যত কষ্টই হোকনা কেন, রেহানাকে ভালবাসে ও হৃদয় দিয়ে। রেহানার মুখে হাসি ফোঁটাবার জন্য ও যা করেছে সে তো বলার নয়। রেহানার প্রতি তার তীব্র অভিমান, সে কেন এমন করে পালিয়ে গেল। এমনকি আমার বাবাকে পর্যন্ত বলেছে, তিনি যেন ওকে রেহানা বলেই ডাকেন। অদ্ভুত তো প্রান্তিক। হা অদ্ভুত। ঠিক আছে তুমি নিজে শক্ত হও। এই আমার অনুরোধ। আমি কাল যাবো। সেলিনা এখন কোথায়? তোমার পিসির কাছে, না তোমার মায়ের কাছে? মায়ের কাছে। ঠিক আছে আমি কাল যাবো, তবে কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। কখন যাবেন? সন্ধ্যায়।
এসেছিলেন প্রতীমকাকু। নিজেই গাড়ী ড্রাইভ করে। তারপর গাড়ীটা লক করে চির গম্ভীর্যের বেড়ি টপকে তিনি রাস্তা থেকে ডাকতে ডাকতে উঠলেন রেহানা, রেহানা? সেলিনা চমকে উঠে বললেন, কে ডাকছে, কাকু না, ও বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল। আর প্রতীমকাকু খোলা গেট দিয়ে ঢুকে পড়ে দ্রুত সিঁড়ি টপকে রেহানা। রেহানা বলে উপরে উঠতে লাগলেন। আমি সেলিনাকে বাধা দেওয়ার জন্য নীচে নামতে চাইলে মিনতি সেন বললেন ওকে বাধা দিস নে প্রান্তিক। আমি দাঁড়িয়ে গেলাম আর আশ্চর্য হয়ে মিনতি সেন দেখছেন এই দৃশ্য। কত বছর আগের প্রতীম চৌধুরী যেন তার বাচ্চা মেয়ের সঙ্গ পাওয়ার জন্য দ্রুত এগিয়ে আসছে, আর তার মেয়ে সেও যেন ছোট্ট শিশুটি হয়ে তার বাবার কাছে যেতে চাইছে। হৃদ স্পন্দন বেড়ে চলেছে মিনতি সেনের। জীবনে এ দৃশ্যতো তার কোনদিন দেখা হতো না। কিন্তু একি হল, একটা সিঁড়িতে পা ফেলতে ভুলে গিয়ে সেলিনা তার নিজের শাড়ীতে জড়িয়ে গিয়ে পড়ে গেল। প্রতীম দ্রুত এসে তাকে ধরার আগে, বেশ কয়েকটা সিঁড়ির ধাপ গড়িয়ে গেল সেলিনা। আর রক্তে লাল হয়ে গেল তার শাড়ী এবং মুহূর্তে জ্ঞান হারালো। আর প্রতীম কাকু তাকে নিজের বুকের পরে তুলে নিয়ে বললেন, রেহানা এ তুই কি করলি মা। কেন এ ভাবে নামতে গেলি। আমি তো আসছিই। আমি তো তোকে নিতে এসেছি। এরা তোকে ভুল বুঝতে পারে। আমিতো তোকে ভুল বুঝিনি মা। কেন আমাকে এমন আঘাত দিলি?
প্রতীমের চির গাম্ভীর্যের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে এল তার চোখে জল। উপরে নিয়ে গিয়ে শুয়ে দিয়ে মিনতি সেনকে বললেন, মিস সেন, ফোনটা কোথায়? মিনতি সেন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন সেলিনার বুকের উপর। আমি স্থানুবৎ দাঁড়িয়ে রইলাম। একি হল সব যেন স্বপ্নের মত। প্রতীম চৌধুরী ফোন করছেন, হ্যালো পুলিশ স্টেশান। ইয়েস! এখনি চলে আসুন এত নং বাড়ীতে একটা খুন হয়েছে, খুনী নিজেই ধরা দিতে চায়। এখনি আসছি, ফোন কেটে গেল।
১৯. মিনতি সেন বুঝতে পারেনি
মিনতি সেন বুঝতে পারেনি, প্রতীম চৌধুরী ফোনে কি বলেছেন। আমি প্রতীম চৌধুরীর কাছে এগিয়ে এসে বললাম, কাকু এ আপনি কি করেছেন। সেলিনা মারা গেছে কি না আপনি তো জানেন না। তা হলে মিথ্যে খুনেব দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে আপনি কেন পুলিশকে আসতে বললেন? এসেছে পুলিশ? না আসেনি, ওদের আসতে দাও।
হঠাৎ পুলিশের গাড়ীর হর্ন বাজতেই, মিনতি সেন অবাক হয়ে বললেন, পুলিশ? আমার বাড়ীতে পুলিশ কেন? প্রতীমবাবু এগিয়ে এসে বললেন, মিস সেন, আমিই ওদের আসতে বলেছি। অবাক হয়ে বললেন, আপনি? কেন? সেলিনার মৃত্যুর জন্যতো আমি দায়ী। সেলিনা যে মারা গেছে আপনাকে কে বলল? গেছে মিস সেন সেলিনা বেঁচে থাকতে পারে না। এ আপনি কি বলছেন? সেলিনা বেঁচে থাকতে পারে না মানে? মানে যা সত্য তাই আপনাকে বললাম মিস সেন।
সেলিনা তখন আস্তে আস্তে চোখ মেলেছে। অজ রক্ত পাতে নিজেকে কেমন হাল্কা মনে হচ্ছে। আস্তে ডাকলো কাকু। প্রতীমবাবু এগিয়ে এলেন, আমি ও মিনতি সেন এই অবাক দৃশ্য দেখতে লাগলাম, বললেন কিবে রেহানা, কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে? ও বলল, আমি রেহানা তো! হা মা, তুইতো রেহানা! তা হলে সেলিনা কোথায়? এই তো একটু আগে এই খানেই ছিল, এখন আর নেই। তা হলে পুলিশ কেন? ওরা আমাকে এ্যারেষ্ট করতে এসেছে মা। এ্যারেষ্ট করতে? তোমাকে? কেন? আমি যে ওদের আসতে বলেছি। সেলিনা বলল তুমি ওদের আসতে বলেছো কেন? যে ভাবে তুই ওপর থেকে দৌড়ে আসছিলি এবং আমিও তোকে ডাকতে ডাকতে উপরে উঠছিলাম, তাতে পা পিছলে পড়ে যাস, এবং একটা এক্সিডেন্ট কল্পনা করে পুলিশকে সংবাদ দিতে বাধ্য হই। ও তাই বল, তারপর আস্তে আস্তে মিনতি সেনকে বলে, মা কাকুকে বসতে বলবে না? আর পুলিশদের লক্ষ করে বলল, ওরা কষ্ট করে এলেন, ওদের একটু চা খাওয়াও না মা? মিনতি সেন বল্লেন এই খাওযাই। প্রতীমবাবু জানতে চান, এখন কি একটু ভাল লাগছে রেহানা। হ্যাঁ কাকু। তাহলে শুয়ে থাক। আমি আসছি। প্রতীমবাবু ডাঃ মুখার্জীকে ফোনে একবার আসতে বলেন। আধঘন্টার মধ্যে আসেন ডাঃ মুখার্জী।
