শেষ পর্যন্ত যাওয়া আর হল না। পরের দিনই মিনতি সেন এলেন। আমি তখন অফিসে। সেলিনা ওকে জড়িয়ে ধরে বলল মা, তুমি? তুমি যে বললে আগামী মাসের প্রথম দিকে আসবে? বলেছিলাম কিন্তু ভেবে দেখলাম, তোকে নিয়েই যাবো। আনন্দে চিক চিক করে উঠলো সেলিনার দুটি চোখ। বলল সত্যি মা। হারে পাগলি সত্যি সত্যি সত্যি। তারপর বললেন তোর প্রথম সন্তান আসবে, আর পাশে থাকবো না, আমি অথবা, তোর মা, না রে সেলিনা, তা হয় না। কিন্তু তুই যাবি তো। তোকে প্রান্তিক ছাড়বে তো। লজ্জায় কুণ্ঠিত হয়ে বলল, মা।
আমি সংবাদ পেয়েও, একটা জরুরী মিটিংএ ব্যস্ত থাকার জন্য এলাম দুপুরের দিকে। মিনতি সেন বললেন, না রে প্রান্তিক তুই ঠিকই বলেছিস, এখানে কাউকে ভাল করে চিনিনা। আর ওখানে ডাক্তার নাসিং হোম হাসপাতাল সবই চেনা। তাই ভাবলাম, ওকে নিয়ে যাই কি বলিস? বললাম, আমিতো তাই বলেছিলাম, ওখানে তোমারা সবাই আছে। তাহলে এক সপ্তাহ ছুটি নে, চল ওকে রেখে আসবি। তাই হবে মা। বলে, দুপুরের লাঞ্চ খেয়ে আমি আবারও অপিসে গেলাম।
একা পেয়ে মিনতি সেন সেলিনার কাছে জানতে চাইলেন কিরে মেয়ে ক মাস হল? ঠিক হিসাব করে দেখিনি, তবে ৬/৭ মাস হবে মনে হয়। বলিস কি? এতদিনেও জানাস নি কেন? কি করে জানাবো, তোমার ছেলের তো খেয়ালই নেই আমার দিকে? ও কি খেয়াল করবে। নিজের রক্ত মাংসে যার অস্তিত্ব তা ও জানবে কি করে? আমার দিকে তাকালেই জানতে পারতো। এখানে এসেতো দেখছি শুধু কাজ আর কাজ। ঠিক কাকুর মত। প্রতীম বাবুর প্রসঙ্গ উঠতেই মিনতি সেন আর কথা বাড়ালেন না। পুরুষ ছেলে, কাজের মধ্যেই আনন্দ পায় বেশী। কোন ডাক্তার দেখানো হয়েছে? না। বাঃ অপুর্ব, তোরা কি বলতো! ৬/৭ মাস হয়ে গেছে, এখনো ডাক্তারের কাছে যাসনি। না আজ বিকালেই কলকাতায় ফিরে চল, কালই ডাক্তার দেখাতে হবে। কিন্তু তোমার ছেলেতো আজ বিকালে যেতে পারবেনা। না পারে একদিন পরে যাবে।
সবশুনে বললাম একদিন পরেই যাও না। অফিসের কিছু কাজ আছে কাল তা শেষ করে পরশুদিন যাবো। ট্র্যাঙ্কলে ম্যানেজমেন্টএর সঙ্গে কথা বলেছি, ওরা এখন ১০ দিন এবং পরে যখন প্রয়োজন হবে তখন একমাস ছুটি মঞ্জুর করেছেন।
কলকাতার এক বড় নাসিং হোমের ডাক্তারকে দেখানো হলো। বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে ডাক্তার বললেন, আগে ডাক্তার দেখানো উচিৎ ছিল। আপনারা শিক্ষিত মানুষ অথচ একবারও ডাক্তার দেখালেন না। নীলাঞ্জনা পিসি উৎকণ্ঠিত হয়ে বললেন কোন অসুবিধা নেই তো ডাক্তার মুখার্জী? বললেন না তেমন কিছু নয়। তবে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবেন। বলছেন ৬/৭ মাস, কিন্তু বেবিতো ম্যাচিউর হয়ে এসেছে, সুতরাং নির্দিষ্ট টাইম বলতে না পারলে আমারও বলা সম্ভব নয়, নিদিষ্ট দিন। বরং পেইন উঠলে নাসিং হোমে নিয়ে আসবেন।
আমাদের শোনা ছাড়া কোন উপায় ছিল না। রাতে সেলিনা বলল, প্রান্তিক আমার ভীষণ ভয় করছে। কেন? জানিনা, তুমি থাকতে পার না? ঠিক আছে আমি দেখছি, কিন্তু আমাকে তো একবার শিলিগুড়ি যেতেই হবে। তুমি ভট্টাচাজ কাকুকে বলনা, যাতে কিছুদিন পর্যন্ত তুমি থাকতে পার। আচ্ছা তাই হবে। এসময় অযথা আজে বাজে চিন্তা করোনা। যে আসছে শুধু তার মঙ্গলের কথা ভাব। জান প্রান্তিক ভীষণ ভাবে ঈশ্বরকে ডাকতে ইচ্ছে হচ্ছে, কোন দিনতো ডাকিনি, কি ভাবে ডাকবো বলত। বললাম, ঈশ্বরকে ডাকারতো বিশেষ কোন নিয়ম নেই। ডাকার মনটাই আসল। মনটাকে প্রস্তুত করতে পারলে যেমন খুশী তাকে ডাকতে পার। মন চাইলে, নমাজ বা সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালিয়ে তাকে ডাকা যেতে পারে। তুমি আমাকে শিখিয়ে দেবে কি ভাবে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালায়? কি বলতে হয় ঈশ্বরের কাছে। আশঙ্কর স্পর্শ আমি অনুভব করি। মানুষ যখন সত্যি হতাশ হয়ে যায়, ঈশ্বরই বোধ হয় তার শেষ সান্ত্বনা হয়। ডাক্তার যদিও হতাশ জনক কিছু বলেন নি, কিন্তু ভালও কিছু বলেননি। তোমার আকাঙ্খই তোমাকে শিখিয়ে দেবে কি ভাবে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালে অথবা কি ভাবে নমাজ করতে হয়। প্রার্থনাটাই আসল সেলিনা। কিন্তু প্রান্তিক তুমি ছাড়া আমার কাছে ঈশ্বরের তো আর কোন প্রতিরূপ নেই। বরং তুমি বস, আমি প্রদীপ জ্বালিয়ে তোমার কাছে আমি আমার ভাবী সন্তানের মঙ্গল কামনা করি। ভীষণ হাসি পেল ওর কথায়, কিন্তু তা দমন করে বললাম সেলিনা এমন ভেঙে পড়ছ কেন? জানিনা তো, কেন আমার এমন হচ্ছে, বার বার মনে হচ্ছে তোমাকে বুঝি আর আমি কোন দিন দেখতে পাব না। তাই কিছুতেই তোমাকে ছেড়ে দিতে মন চাইছেনা। বললাম সেলিনা একদিনতো তুমি বক্সিংএর চ্যালেঞ্জার ছিলে, এভাবে ভেঙে পড়া তোমার শোভা পায় না। জানি, কিন্তু তুমি বুঝতে পারছনা প্রান্তিক, আমি আমার শেষ দেখতে পাচ্ছি যেন।
আমি ওকে কাছে টেনে নিয়ে বললাম, সব ভয় অমূলক সেলিনা। চিকিৎসা বিজ্ঞান এখন কোথায় পৌঁছিয়েছে তুমি কল্পনাও করতে পারবেনা। সব উৎকণ্ঠা ঝেড়ে ফেল। ও বলল, তুমি যাবে না বল। আচ্ছা যাবে না, আর দুশ্চিন্তা করো না কিন্তু। একবার বাবাকে আসতে বলবে। কেন? ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে। কেন যেন মনে হচ্ছে, আমার পৃথিবী চির অন্ধকার। বললাম, তাই হবে, কালই বাবাকে চিঠি দেবো, মাকে নিয়ে যেন চলে আসেন। আরেকটা কথা, যেখান থেকে পার রেহানাকে খুঁজে বের করবে? কি সব পাগলামি করছ? কোথায় খুঁজে পাব তাকে বল। ও বলল, তোমাকে তো কতবার বলেছি, আমার মধ্যে তাকে তুমি খুঁজে নাও। নিলে না। আমি রেহানা হতে চেয়ে ছিলাম, তুমি হতে দিলে না, আমার শেষ বেলাকার অনুরোধ, একটা দিন তুমি অন্তত আমাকে রেহানা বলে ডেকো। বললাম তাতে যদি তোমার মনে শান্তি আসে তাই হবে রেহানা। বাঃ কি তৃপ্তি। কি সুন্দর ভাবে ঐ নামটা তোমার কণ্ঠে উচ্চারিত হয় প্রান্তিক। আমি জানি সে একদিন আসবেই আসবে। আসতে তাকে হবেই প্রান্তিক। তাকে যে আমার বোঝাতেই হবে সেলিনা তাকে ঠকাতে চায়নি। শুধু তার প্রান্তিকের হৃদয় ক্ষতকে শুকিয়ে দেওয়ার জন্য আমাকে তার কাছে আসতে হয়েছিল। তুমি কথা দাও কোন অজুহাতে তাকে তুমি ফিরিয়ে দেবেনা। আমি রেগে বললাম, তুমি এবার থামবে? যা সব আজে বাজে কথা চিন্তা করছে তাতে তোমার সন্তানের মঙ্গল হবে? ও আমার বুকে মুখ লুকিয়ে নীরবে কাঁদতে লাগল আর আমি তাকে কাঁদতেই দিলাম। কোন বাধা দিলাম না।
