দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কেটে যায়। কখনো দার্জিলিংয়ের তুষার ধবল পাহাড়, কখনো সিকিমের ঘন অরণ্য, পাহাড়ী নদী, এদের সঙ্গ দিয়ে কেটে যায় অবকাশ। একদিন বলল, আমাকে মায়ের কাছে রেখে আসবে প্রান্তিক? আমি অবাক হয়ে বললাম কেন? ও বলল আজকাল তুমি আর আমার দিকে তাকাওনা তাই। আমি তোমার দিকে তাকাই না? আমি তোমাকে ভালবাসি না? ভালবাস, আদরও কর। কিন্তু তাকাওনা। বুঝলাম না। সেই জন্যই তো বলেছিলাম, আমাকে মায়ের কাছে রেখে এস। কারণটা বলবে তো। ও আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, তোমার রক্তের উত্তরাধিকার কুঁড়ি হয়ে ফুটেছে গো, তুমি বাবা হতে চলেছে প্রান্তিক। আমি আনন্দে পাগলের মত ওকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে আদরে আদরে ভাসিয়ে দিয়ে বললাম সত্যি?হা গো সত্যি, সত্যি, সত্যি। এবার আমায় ছুটি দেবে তো? আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে? থাকতে তো হবে, যে আসছে, তার দাবীতে কম নয়। ওদের কাউকে যদি আসতে বলি। ও বলল নতুনকে বরণ করে নিতে, পারবে না কয়েকটা দিন আমাকে ছেড়ে থাকতে। কি করে থাকব বল, অফিস থেকে কতবার শুধু তোমাকে দেখব বলে ছুটে আসি। কাজ করতে করতে তোমাকে আদর করার জন্য মন পাগল হয়ে ওঠে। যেখানে ৩/৪ ঘন্টা তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারি না, সেখানে এতদিন কি করে থাকবো। অভ্যেস কর, না হলে পস্তাবে, কেমন করে? হাসতে হাসতে বলল, পরে যখন কচি দুটি হাত তোমাকে বাধা দেবে, কি করবে? বললাম ওকে আদর করে সরিয়ে রেখে তোমাকে আদর করবো। আবদার?
সেলিনার যাওয়া হল না। নীলাঞ্জনা পিসি এবং মিনতি সেন ভাগাভাগি করে এ একটা মাস এখানে থাকবেন বলে জানিয়েছেন। সেলিনার মনে হয়, বন্দোবস্তাটা মনঃপূত হয়নি। বলল, ওরা কি ভাববেন বলত। কি ভাববেন? তোমাকে হয়তো কিছুই বলবেন না, কিন্তু তারা কিন্তু মনে মনে ভাববেনই আমি যেতে চাইনি, তাই তুমি ওদের আসতে বলেছে। তা ঠিক নয় সেলিনা, আমি তোমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যই বলেছিলাম। কেন বলতে গেলে? তুমিতো আমাকে রেখে আসতে পারতে। তুমি রেখে এলে ওরা কি বাধা দিতো? আমি বললাম ঠিক আছে সেলিনা। আমি তোমাকে রেখেই আসব। না গো, আর তা হয় না। কেন? আমিও যে পারবনা তোমাকে ছেড়ে থাকতে। এই সেই চিরন্তন সেলিনা।
লেটার বক্সে চিঠি ফেলে গেল পোষ্ট ম্যান। অশ্রুকণার চিঠি। লিখেছে সেলিনাকে। সেলিনা, ভুলে গেছো অদিকে তাই না? ভুলে যাওয়ার মধ্যে কোন অন্যায় নেই ভাই। যাকে তুমি সারা জীবন ধরে চেয়েছিলে নিজের আঁচলের মধ্যে পেয়েও এত ভয় কেন? কেউ চুরি করে নিতে আসবে না, তোমার সাত রাজার ধনকে। কাল মিনতি পিসির চিঠিতে জানলাম, তুমি নতুন আগন্তুকের অপেক্ষায় আছে। কি ভাল যে লাগছে তোমাকে তা বলে বোঝাতে পারব না। বোন, তোমাকে দেখতে ভীষণ ইচ্ছে করছে। এই ইচ্ছের মধ্যে তুমি আবার অন্য কিছু খুঁজতে যেও না। তোমাদের দুজনকেই দেখতে ইচ্ছে করছে। আসবে একবার? সিঁথিতে সিঁদুর, হাতে নোয়া, লাল শাড়ীতে কেমন লাগছে তোমাকে, দেখার ভীষণ লোভ নিয়ে তোমাকে ডাকছি–অশ্রুদি।
চিঠিটা অনেকবার পড়ে সেলিনা, তারপর রাতে তা তুলে দেয় আমার হাতে। আমি বলি যাবে নাকি একবার। তোমার খুব যেতে ইচ্ছে করছে তাই না? অদিকে তোমারও খুব দেখতে ইচ্ছে করছে শুধু মুখে বলতে পারছনা এইতো! হয়তো ঠাট্টা, হয়তো মনের সন্দেহ, হয়তো অমূলক ভয়, তবু সেলিনার একথা আমার ভাল লাগলো না। সত্যি কথা বলতে কি, প্রাণপনে চেষ্টা করে চলেছি অশ্রুকণা বা রেহানাকে ভুলে থাকতে। কখনো কখনো বা সেলিনার মধ্যে তাদের খুঁজে পেতে চেয়েছি। যখনি আমার নিঃসঙ্গতায় তাদের ছায়া পড়েছে পালিয়ে এসে আদরে আদরে ভরে দিয়েছি সেলিনাকে। আদূরের প্রকাশ ঘটে আবেগের ভিতর দিয়ে, সব সময় যে আবেগ স্বতঃস্ফূর্ত ছিল তা কিন্তু নয়, কিন্তু নিজের কাছ থেকে পালাতে, এ ছাড়া কোন উপায় ছিল না। ভেবেছিলাম একটা কড়াউত্তর দেব সেলিনাকে। কিন্তু কিছুই না বলে চুপ করে রইলাম। ও বলল, কি হল তোমার কল্পনায় আঘাত দিলাম? বললাম কি বলতে চাও? চলনা অশ্ৰুদির ওখান থেকে ঘুরে আসি। আমার পরে তার দাবী না থাকলেও তোমার ওপর তো আছে। আর আমি তোমার স্ত্রী, সেই সূত্রে খানিকটা দাবীতো আমারও আছে। কি যে ও বলতে চায়, সব সময় বুঝিনা। তবু বললাম, আমার উপর কারো কোন দাবী নেই একমাত্র তুমি ছাড়া। ইস অভিমান দেখ। তারপর বলল কার উপর কার দাবী আছে ওই ভাবে মুখে জোর করে কিছু বলা যায় নাকি? তারপর, বলল, তুমি কি অস্বীকার করতে পারবে আজ যদি তোমার মা প্রতীম কাকুকে কিছু বলেন কাকুর কোন ক্ষমতা আছে তাকে অস্বীকার করার? বললাম, ঠিক জানিনা, তবে মনে হয় প্রতীম কাকু তা পালন করবার চেষ্টা করবেন। শুধু আমার মা কেন, তুমিও যদি কিছু চাও তার কাছে, সাধ্যমত তোমার চাওয়াটাকেও তিনি পূরণ করবার চেষ্টা করবেন। আমার চাওয়া আর মায়ের চাওয়া কি এক? অথচ দেখ, জাগতিক কোন সম্পর্ক তাদের ভিতর নেই। আমি জানি প্রান্তিক, অশ্ৰুদির সঙ্গে তোমার কোন জাগতিক সম্পর্ক নেই, তবু তার যে কোন চাওয়াকে তুমি কোন ভাবে অস্বীকার করতে পারবে না। আমি তা মেনেও নিয়েছি। কেন নিয়েছি জান? আমি অবাক হয়ে বললাম কেন? ও ধীরে ধীরে বলল, তোমার বাবা বলেছিলেন, দেহ তো মন্দির, মন নামক দেবতার আধিপত্য সেখানে। দেবতার কাছে তো আসবে লক্ষ লক্ষ ভক্ত। যার যেমন কামনা তাই নিয়ে। তা নিয়ে ভাবলে চলবে কেন? দেবতার কাছে, আমি যা চাইছি, তাই তিনি আমায় দিচ্ছেন কি না এখানেই আমার সন্তুষ্টি এখানেই আমার সীমাবদ্ধতা। বলেছিলাম, একই কামনা নিয়ে যদি অনেকেই আসে সেই দেবতার কাছে, তাহলে দেবতা কি সবার মনস্কামনা পূর্ণ করবেন? না করবেন না, কারণ, তুমি যে সমাজকে অস্বীকার করছ, দেহ বেদীতে সেই সমাজেরই অঙ্গ। তাই সমাজিক বিচারে দেবতার ইচ্ছে পূরণের ক্ষমতা সীমিত। তাই বলে মা ইচ্ছেটা তো মরে যেতে পারে না। ঘুরে ফিরে আসে, বার বার আসে। তা ভাবায় যেমন আনন্দে তেমনি আবার কাদায়ও। বুঝেছিলাম আমাকে তিনি সন্দেহ মুক্ত করতে চেয়েছেন। আজ আমার কোন সন্দেহ নেই। তুমি কেন ভুল বুঝে নিজে কষ্ট পাচ্ছ। একথা তুমি অস্বীকার করতে পার না, অশ্ৰুদিকে আমার কালে ভদ্রে দেখতে ইচ্ছে করলেও প্রতিমুহূর্তেতাকে তুমি দেখতে চাও। আর তোমার সেই ইচ্ছেটাকে দমন করে তুমি আমায় আদরে আদরে ভরে দাও। তোমার আদরের তারতম্যই তার প্রমাণ। আজ যদি তুমি একা একা তার কাছে যাও, থাকও দিনের পর দিন তাতেও তোমাকে আমি সন্দেহ করব না। এত বিশ্বাস আমার ওপর? না প্রান্তিক তোমার ওপর নয়। তোমার সীমাবদ্ধতার ওপর। মন, চাইলেও তুমি পারবেনা। তোমার সেলিনা, তোমার পাশে না থেকেও বার বার তোমাকে প্রতিহত করবে, আর তাকে অপমান করার কোন স্পন্ধাই তুমি দেখাতে পারবেনা। তাই বলছিলাম, মিথ্যে মনকে ধোকা দিয়ে কি লাভ প্রান্তিক, আমারও ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করেছ অদিকে, চলনা। আমি বললাম, তার থেকে এক কাজ কর না, ওকেই একবার আসতে বলনা। তবু তুমি যাবে না? তুমি তো জান সেলিনা যে কোন মুহূর্তে মা বা পিসি আসতে পারেন। যদি এসে আমাদের না পান। তা অবশ্য ঠিক। বেশ আমিই অদিকে চিঠি লিখে দিচ্ছি। কি লিখবে? হাসি হাসি মুখে বলল, লিখব, ভীষণ ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে তোমাকে অশ্রুদি, আরেক জনের ইচ্ছে কিন্তু আমার থেকেও বেশী। আসছে তো? কবে আসছ জানিয়ো। না আসলে কিন্তু আড়ি। আমি রাগ করে বললাম, তোমার যা ইচ্ছে লেখ। যদি যেতে চাও তাতেও আমি রাজী। ও বলল, তাই বল। যেতে চাও অথচ জট পাকিয়ে তা ভণ্ডুল করে দেওয়ার ইচ্ছে।
