রাতে খেতে বসে বলল, বাবা আপনি বলেছিলেন না, মা সমাজকে অস্বীকার করতে পারেন, কিন্তু আপনার পারার উপায় নেই। হ্যাঁ বলেছিলাম। কিন্তু সেই সমাজকে তো আপনি অস্বীকার করতে পেরেছেন। কেমন করে? সমাজ মানে তো কিছু আচরণ, এই এর হাতে খাব না, ওর ছোঁয়া স্পর্শ করবনা, সমাজকে যদি মানতেন, তা হলে তো মেয়ের হাতে খেতেই পারতেন না। অথচ তা পেরেছেন, কেন বলুন তো। তুমিই বলনা কেন? আসলে স্নেহ আর ভালবাসা, দুটি মন যেখানে একে অপরকে ভালবাসে সেখানে সব তুচ্ছ হয়ে যায়। এতদিন সমাজকে গভীর ভাবে ভালবেসে এসেছেন, তাই ভাবতেন একে বুঝি অস্বীকার করা যায় না, আজ যখন তার থেকেও আরো গভীর ভালবাসায় জড়িয়ে পড়েছেন সমাজকে ভালবাসা তুচ্ছ হয়ে গেছে তাই না? বাবার মুখে কোন কথা নেই। সেলিনা বলল, বলুন ঠিক বলেছি কি না। তুমি ঠিক বলেছ মা। আমি শুধু ভাবছি তুমি এমন করে ভাবতে শিখলে কি করে? এটা কিন্তু আমি আপনার ছেলের কাছে শিখেছি। প্রান্তিকের কাছে? হ্যাঁ বাবা ওর কাছে। ওর কাছে শিখেছি, মানুষকে ভালবাসাই তার আসল ধর্ম। ধর্ম ব্যবসায়ীর ধর্ম নয়। ও কিন্তু হাতে কলমে একথা শেখায়নি, তার আচরণের মাধ্যমে শিখিয়েছে। আর ওতো আপনার রক্তের উত্তরাধিকার। তাই আপনার চিঠি পেয়ে ও যখন খুব চিন্তিত, আমি আপনার চিঠিটা পড়ি। জানি অন্যের চিঠি পড়া অন্যায়, তবু আপনার চিঠি পড়ে ওদের যা যা মনে হল, আমার কিন্তু তা হল না। বাবা অবাক হয়ে জানতে চাইলেন মে? বাঃ যে আপনি আমাকে মেনে নিচ্ছেন, তাকে আপনি অন্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করবেন এতো দ্বিচারিতা। বাবা বিস্মিত হয়ে বললেন বৌমা। সেলিনা বলল, না বাবা, আমি শুধু বৌমা নই, আমি আপনার মা, আপনার মেয়ে। আপনার বুকে যে শূণ্যতা, সেই খানেতো আমার জায়গা। কেন বৌমা বলে আমাকে দূর করে রাখবেন। এবার বাবা বললেন মা সেলিনা। সেলিনা বলল আমি শুধু সেলিনা নই বাবা, আমিতো সেই মেয়ে যাকে আপনি পাগলের মত খুঁজে ফিরেছেন, আমিতো আপনার সেই রেহানা, একবার ডাকুন না আমায় ওই নামে।
অদ্ভুত এই সেলিনা, আমি ও নীলাঞ্জনা পিসি অবাক হয়ে ভাবছি বাবার চিন্তা ধারাকে এলোমলো করে দিতে এমন করে বুঝি কেউ পারত না। অবাক হয়ে অপলক বাবা তাকিয়ে থাকেন সেলিনার দিকে। পিসি বলেন, কি হল সীতাংশুদা, মেয়ের কাছে হেরে গেলেন? বাবা বললেন, সত্যি নীলু এ যে কি আনন্দের হার তা তোমাকে বুঝাতে পারবো না। সেলিনা সত্যি তুমি আমার মা। মনে থাকে যেন বাবা। বাজে অজুহাতে এই বিশ্বাস থেকে সরে আসবেন না কিন্তু।
মাত্র ২ দিন থাকবেন বলেছিলেন বাবা। মিনতি সেন এলেন বাবা যেদিন এসেছিলেন তার পরের দিন দুপুর বেলায়। বাবা ঘুমাচ্ছেন আর সেলিনা তার মাথার চুলে আঙুল বুলিয়ে দিয়ে ঘুমাতে সাহায্য করছে। হঠাৎ বেলটা বেজে উঠলো। বাবা বললেন কে এল মা? আপনি ঘুমান আমি দেখছি। দরজা খুলে মিনতি সেনকে দেখে একেবারে জড়িয়ে ধরে বললেন মা তুমি। হ্যারে আমি, এবার ছাড়। মিনতি সেন এলেন বাবার কাছে। বাবা উঠে বসলেন। মিনতি সেন প্রণাম করে বললেন, কেমন আছেন দাদা। প্রান্তিকের কাছে শুনলাম, আপনি নাকি কালই চলে যাবেন। এবার নাকি আমার ওখানে যাওয়ার সময় হবে না, তাই আসতে হলো। সেলিনা বলল তোমার ছেলে বলেছে এই কথা? কেন ওকি ঠিক কথা বলেনি? তা জানিনা মা, তবে বাবা তোমার ওখানে যাবে না, আমি জানিনা তোমার ছেলে জানলে কি করে? এই তো ঘুমাবার আগে বাবা বললেন, মিনতির ওখানে একবার যাওয়া ভীষণ দরকার মা। আর তোমার ছেলে বলে দিল তোমার ওখানে যাবে না। আর তুমি সেই কথা বিশ্বাস করলে? বাবার অবাক হওয়ার পালা পারদের ওঠা নামার মত বাড়তে থাকে। মিনতি সেন বললেন, তুই দেখছি রেগে আছিস প্রান্তিকের পরে। ও কিন্তু ওই ভাবে বলেনি। তবে কি ভাবে বলেছে। বাবার ফিরে যাওয়ার তাড়া আছে, আসতে পারবে কি না কি জানি? সেলিনার মুখে হাসি ফুটে উঠে, বলে তাই বল। তা তুমি আজ অফিসে যাও নি? না তাহলে তো ভালই হল। চল না এক সঙ্গে যাওয়া যাবে। তারপর বাবাকে বললেন, বাবা আপনি ঘুমান, আমি মায়ের সঙ্গে ও ঘরে গিয়ে গল্প করছি। না মা, ঘুম আসবেনা, বরং আমিও তোমাদের সাথে গল্পে ভাগ বসাই, কি বল মিনতি। সেই ভাল, বললেন মিনতি সেন।
কাল বাবা চলে গেছেন। আগামী দিন আমাকে চলে যেতে হবে শিলিগুড়ি। বাবা যদিও দুদিন থাকবেন বলেছিলেন, কিন্তু সেলিনার বিভিন্ন অবদার মেটাতে পাঁচ দিন থাকতে হল। আমি বিশ্বাস করি এই পাঁচটা দিন বাবার জীবনে অক্ষয় সম্পদ হয়ে থাকবে।
রাতে সেলিনাকে বললাম, কোন যাদুতে বাবাকে তুমি এমন আপন করে নিলে? কেন মশাই দরকার নাকি সে যাদু শেখার? ভীষণ দরকার সেলিনা। কেন? তা হলে তাকেও আমি সেই যাদুতে বস করতাম। থাক মশাই আর বস করতে হবে না কাউকে, এমনিতে যাদের বস করেছে, তাদেরই জায়গা দিতে পারছনা, আবার নতুনকে এনে কাকে তাড়াতে চাও? আমি স্মিত হেসে বললাম আমার ভয়কে। মানে? সেই যাদুতে আমি তোমায় বস করতে চাই সেলিনা। প্রান্তিক! না সেলিনা সত্যিই ভয় হয়, এই বুঝি তোমায় হারাই। দুহু ক্রোরে দুহু কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া বলে আমাকে তার বুকের কাছে টেনে নিল।
শিলিগুড়িতে ও আমার সঙ্গে আসতে চায়নি। কিন্তু পিসি ও মিনতি সেনের অনুরোধে অবিশ্য সে এল। আমি বললাম, তুমি আসতে চাইছিলেনা কেন? দেখ, তোমাকে পেয়েছি সকলের মধ্যে দিয়ে, তাই আমার মনে হয়েছে সকলের মধ্যে দিয়েই তোমায় আমি ধরে রাখতে পারব। তাদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়িয়ে আমাদের কারো পালাবার পথ নেই। কিন্তু এখানকার এই বিশাল কোয়ার্টারে, আমি কারো মা নই, কারো মেয়ে নই, শুধু তোমার স্ত্রী, আর তোমার স্টাফদের কাছে মেম সাহেব, এই শুন্য ঘরে শুধু তুমি আর আমি। তোমার কথা যখন শেষ হবে, অথবা আমার কথা বলার ইচ্ছে হবে কারো সাথে, কে আমাকে সঙ্গ দেবে বল? পেতেও যেমন সময়ের অপেক্ষায় থাকতে হবে না। হারাতেও তাই। আমি বললাম সেলিনা, সব সময় এই ফ্রাশট্রাসানে ভোগ কেন বলত? জানিনা, যা মনে হয়েছে তাই বললাম।
