নীলাঞ্জনা পিসিই সেলিনাকে নিয়ে বাবার কাছে গিয়ে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন সীতাংশুদা, তোমার বৌমা। সেলিনা প্রণাম করতেই বাবার চমক আর ভাঙেনা, বললেন আশীর্বাদ করি সুখী হও মা।কিন্তু তোমাকে যেন এর আগে কোথায় দেখেছি বলত।নীলাঞ্জন পিসি বললেন সে কি সীতাংশুদা, এইতো যখন দেশের বাড়ীতে গিয়েছিলাম তখন তো ও ও গিয়েছিল। না নীলাঞ্জনা, ওকে যেন আলাদা ভাবে কোথায় দেখেছি। সেলিনা, বললেন, ঠিক বলেছেন বাবা, মেয়েকে চিনতে কি বাবার কোন অসুবিধা হয় না কি। বাবার মনে হল এতো সেই কণ্ঠ যে একদিন বলেছিল, আপনি কিন্তু কথা দিয়েছেন আমাকে মেয়ে হিসাবে মেনে নেওয়ার, আমাকে তাড়িয়ে দেবেন না তো। বাবা বললেন, তোমায় কোথায় দেখেছি মা বলতো। সেলিনা বলল, বাবা তার মেয়েকে কোথায় দেখেছেন এ আমি কেমন করে বলব? যে ছবি মনের মধ্যে রয়েছে তাকে আর নতুন করে কোথায় দেখবেন। সে সব যাক বাবা, পরে না হয় ভেবে দেখবেন আপনার মন থেকে হারিয়ে যাওয়া মেয়ে আবার ফিরে এসেছে কি না। আপনি এখন ক্লান্ত বিশ্রাম নিন, আমি রান্না ঘরে যাচ্ছি। দেখি আপাতত কিছু খাওয়ার জোগাড় করা যায় কিনা। আপনি তো চা বা কফি কিছু খেতেন না, এখানে দেব কি? বাবা অবাক হয়ে, তাকালেন ওর দিকে, তারপর বললেন তুমি এত কথা জানলে কি করে মা। বা আপনি তো আমায় অবাক করলেন বাবার পছন্দ অপছন্দ মেয়েকে অন্যের কাছে জানতে হবে? যত দেখছেন ততই অবাক হচ্ছেন বাবা, বললেন, দাও মা, তোমার যা ভাল লাগে তাই দাও। তা না হয় দিলাম, কিন্তু আমি যা রান্না করব তাই খাবেন তো, আবার বলবেন না তো, বহু বছর কাছে না থাকার জন্য মেয়েটা আমার সব ভুলে গেছে, আমার পছন্দ অপছন্দ সব। তারপর বলল কিন্তু বাবা আপনি একা এলেন কেন? মাকে কেন নিয়ে এলেন না? প্রশ্নটা করেই তার কোন উত্তর শোনার অপেক্ষায় না থেকে সেলিনা চলে গেল! নীলাঞ্জনা বললেন, ও যে আমার কতখানি হৃদয় জুড়ে আছে, সে তোমাকে কি বলব সীতাংশুদা। সে আমি কয়েক মিনিটে বুঝতে পারছি নীলু। ওর পরকে আপন করে নেওয়ার শক্তি আমায় অবাক করেছে। তোমাকে বলা হয়নি নীলু। তোমরা দেশের বাড়ীতে যাওয়ার আগে মাষ্টারমশায়ের সঙ্গে একটি মেয়ে এসেছিলেন। একে দেখে তাই আমি চমকে উঠেছিলাম। এতো সেই মেয়ে, সেই অধিকার বোধ, সেই মিষ্টি কথা। ও কি বলেছিল জান, আমাকে মেয়ে বলে ডেকেছেন, ভুলে যাবেন নাতো। আমার ভিতরটা যে কি হচ্ছিল তা তোমাকে বুঝাতে পারবনা। পরে শুনলাম ওর নাম রেহানা। প্রান্তিক ওকে ভালবাসে। সত্যি ভাল লেগেছিল প্রান্তিক ওর মত মেয়েকে ভালবেসেছে বলে।
ঠিক সেই সময়ে, কফি, পকৌড়া, আরো কিছু খাবার নিয়ে ঢুকলো সেলিনা, বলল, বাবা, সেই মেয়েটাকে তো আপনি পাগলের মত খুঁজেছেন তাই না? আজ যদি বলি, আমি সেই মেয়ে, পারবেন আমাকে অস্বীকার করতে? না মা পারব না। সত্যি তোমাকেই খুঁজছিলাম, আজ পেয়েছি তোমাকে। আর তো খোঁজার দরকার নেই। না, নেই কিন্তু তোমার মত মেয়েকে আমি যে কি বলে আশীর্বাদ করব বুঝতে পারছি না। মেয়েকে তো বাবা সব সময় আশীর্বাদ করছেনই আবার নতুন করে কি করবেন? তারপর নীলাঞ্জনাকে বলল, মা, তুমি অফিসে যাবেনা? আজ আর যাব না, কতদিন পরে সীতাংশুদার সাথে দেখা, তাছাড়া তুই একা একা পারবি কেন? আমি পারবো না? কি যে বল না মা। বাবা এসেছেন মেয়ের কাছে, আর মেয়ে বাবাকে সামলাতে পারবেনা এ আবার হয় নাকি। তুমি অফিসে যাও, বাবা বললেন, হা নীলু তুমি অফিসেই যাও। কিন্তু প্রান্তিককে যে দেখছিনা ও কোথায়? সেলিনা বলল, সে হবে না বাবা, আগে মেয়ের সঙ্গে সব কথা ফুরোক তবে ছেলে। তাই হবে মা, কিন্তু ও কোথায়? ও তো ওর মায়ের কাছে, তা ছাড়া সবে কালই নতুন চাকরিতে জয়েন করেছে। মা অফিসে গিয়ে ফোন করবেন, বিকেলে আসবে। বাবা আর কিছু বললেন না।
বিকেলে এলাম আমি। বাবা বললেন, নীলুকে চিঠিতে আমার আশঙ্কার কথা আমি ফিরিয়ে নিলাম প্রান্তিক। আমি বললাম, ওকে আপনার পছন্দ হয়েছে তো? সেলিনা বলল এই তোমার এক দোষ, মেয়েকে বাবার পছন্দ হয়েছে কি না এটা একটা প্রশ্ন হলো? আজ পর্যন্ত শুনেছো কোন মেয়েকে বাবার পছন্দ নয়? তার চেয়ে তুমি বলতো আমাকে তোমার পছন্দ কি না। বাবা শুধু হাসছেন। নীলাঞ্জনা বললেন, দেখেছো সীতাংশুদা ওরা কেমন ঝগড়া করে। বাবা বললেন দেখছি নীল, আর ভাবছি এদেরকে যারা এ যুগের ছেলে মেয়ে বলে তাচ্ছিল্য করে তাদের জন্য করুণা হয়। বাবার কথার প্রতি উত্তরে সেলিনা বলে, বাবা আপনার আমাদের যুগে জন্মাতে ইচ্ছে করে না? আগে করত না, কিন্তু তোমাদের যত দেখছি, ততই মনে হচ্ছে, আমি যেন বার বার তোমাদের মাঝে আসি। তোমাদের এই জীবনটা যদি ফিরে পেতাম? এতো সোজা ব্যাপার বাবা, শুধু গ্রহণ করার ক্ষমতা আছে কি না সেটাই যাচাই করে দেখতে হবে। কেমন করে? নিজের মনটাকে দিয়ে, আসলে মনটাই তো সব। মনটাকে শুধু আমাদের মত কবে নিন, দেখবেন কোন অসুবিধা নেই। বাবা হাসলেন, বললেন, শিখিয়ে দেবে মা, কেমন করে এই বুড়োমনটাকে তোমাদের মত তরতাজা করে নেওয়া যায়। তাহলে কাল চলুন না আমার সাথে। কোথায়? যেখানে ইচ্ছে। শুধু মনকে একটু স্বাধীনতা দিতে হবে। তা হলে দেখবেন আর কোন অসুবিধা নেই। সত্যি মা কোন অসুবিধা নেই। তাইতো আজন্ম সংস্কারকে তুমি হেলায় তুচ্ছ করতে পার। এই পারাটাই বড় কথা তাই বলছতো। হ্যাঁ, ঠিক তাই বলছি। থাকুননা আমাদের সাথে দেখবেন কেমন সুন্দর ভাবে সব পেরে গেছেন?
