ঠিক সেই সময়ে ফোনটা বেজে উঠলো। মিনতি সেন বললেন হ্যালো। সুরেশ ভট্টাচার্য স্পিকিং। ও বলুন। প্রান্তিক আছে? হ্যাঁ আছে? ওকে দেবৈন? ধরুণ। আমি বললাম হ্যালো? হ্যালো ইয়ং ম্যান, মিঃ চৌধুরী তো বললেন, তুমি পরীক্ষার পরে জয়েন করবে? কি হল, তুমি কি তোমার মত বদল করেছে নাকি। না না, মত বদলাব কেন? তাহলে কবে জয়েন করছ? ওরা আমার কথায় ২ মাস চেয়ার ফাঁকা রেখেছেন। আর তো রাখা সম্ভব নয়। আমি আজিই আপনার সঙ্গে দেখা করছি। এতক্ষণ মাযেব সঙ্গে এই ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করছিলাম। থ্যাঙ্ক য়ু। ফোনটা ছেড়ে দিলেন।
মিনতি সেন বললেন, তোর কাকু যখন বলেছেন, তখন ভট্টাচার্য সাহেবের অফারটাই গ্রহণ কব। আমি বললাম তুমি মন থেকে বলছ তো মা। উনি তা এড়িয়ে গিয়ে বললেন, হ্যাঁ রে, তোরা তোদের কাকুকে খুব ভালবাসিস তাই না? সেতো তোমার জন্য মা। আমার জন্য? অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন মিনতি সেন। তারপর অবশ্য বলেন তা হলে কি বলতে চাস তোব কাকুর মধ্যে ভালবাসার মত কিছু নেই, শুধু আমার মুখ চেয়ে তাকে ভালবাসিস?বললাম, এই ভাবে নিচ্ছ কেন? বড় কথা হচ্ছে কাকুকে ভাল না বেসে উপায় নেই, আর তিনিও এত ভালাবাসেন যে, কোন ভাবে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। তাই আমরা শুধু সেতু রচনা করে চলেছি। সেলিনা কাছে ছিল না, তাই বললাম, আমি ছেলে, হয়তো একথা আমার বলা উচিৎ নয়, তবু বলছি মা, কাকুকে একটু বোঝার চেষ্টা করে। তাকে বুঝে আমার কি লাভ? কিছুই লাভ নেই মা? তাহলে তুমি গিয়েছিলে কেন? চোখ মুখ লাল হয়ে উঠলো মিনতি সেনের। অপমান আর লজ্জায় যেন মাটির সঙ্গে মিশে যেতে ইচ্ছে করছিল। নিজেকে খানিকটা সংযত করে বলল, সব কৈফিয়ত কি তোক দিতে হবে? কেন দেবে না? তুমিতো মা, তোমার ভালমন্দ দেখার কোন দায়িত্ব আমার নেই? আর তা যদি না থাকে, তবে আমিও বলে দিচ্ছি, তোমার লোক দেখানো ছেলে আমি হতে পারব না। যেন কান্নায় কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল, বললেন প্রান্তিক। বললাম মা, তোমাকে আঘাত দেওয়ার জন্য এসব বলিনি, শুধু বলতে চেয়েছি মন কোন বয়সেই মরে না, ভালবাসা মরে না কখনো। যদি কারো তা হয়, তার বেঁচে থেকে কোন লাভ নেই। কাকু তোমাকে তারপর তিনবার ফোন করেছেন, তিন বারই তার কণ্ঠ শুনে তুমি কোন কথা না বলে ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু কেন? তোকে কে বলল? যেই বলুক কথাটা সত্যি কিনা, তাই বল। উনি কোন উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইলেন। আমি বললাম, কি হল বল? দেখতে পাচ্ছি মিনতি সেনের চোখ বেয়ে টপটপ করে জল নেমে আসছে। আমি কাছে এগিয়ে এসে তার আঁচল দিয়ে তার চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললাম, এত কষ্ট নিজের ভিতরে চেপে রাখ কেন মা? তুমি ভয় পাচ্ছ তোমার কোন আচরণে, আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে পারি। না মা, পারবনা তোমাকে ছেড়ে যেতে, তুমি তাড়িয়ে দিলেও আমি বারবার তোমার কাছে আসব। কতবার তাড়াবে তুমি আমাকে? তুমিতো শুধু আমার মা নও তুমিতো রেহানারও মা, ভুলব কি করে বল। উনি শুধু বললেন, প্রান্তিক সত্যি তুই আমাকে ছেড়ে কোন দিন যাবিনা। কোথায় যাব বল। তখনো মিনতি সেনের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরছে। বললাম মা, এবার কষ্টটাকে একটু ভাগ করে নাও না। মিনতি সেন সে কথার কোন উত্তর না দিয়ে বললেন ভট্টাচাজ সাহেবের ওখানে কখন যাবি? আমিতো ওর অফিসে যাব, খেয়ে দেয়েই যাব। তারপর বিকেলে সেলিনাকে ও বাড়িতে রেখে আসব। সেই ভাল বললেন মিনতি সেন।
ভট্টাচার্য সাহেব বললেন, তা হলে কাল জয়েন করতে পারবে তো। আপনি যদি বলেন, তা হলে আজও জয়েন করতে পারি। না তার আর দরকার নেই। তুমি কালই জয়েন কর। ওরা তোমাকে আলাদা কোয়ার্টার দেবে বলেছে। দিন সাতেকের মত দেরি হবে। ততদিন সব প্রস্তুত করে নাও। কোয়ার্টার নিতেই হবে? না নিয়ে কি করবে, ভাড়া বাড়ীতে থাকবে? মানে আমাকে কোথায় যেতে হবে? সেকি? তুমি তোমার এপয়েন্টমেন্ট লেটার দেখনি। না দেখা হয় নি। বা অপূর্ব। আমি প্রয়োজন বোধ মনে করিনি কাকু, কারণ আমি জানি, আপনি যা করেছেন, তা বুঝে শুনেই করেছেন। উনি বললেন, তোমার কাছে এপয়েন্টমেন্ট লেটারটা আছে? হ্যাঁ আছে তা হলে বের করো।
আমি বের করে দেখি, ওতে স্পষ্ট করে লেখা আছে, শিলিগুড়িতে কোম্পানীর একটি ব্রাঞ্চে আমাকে ব্রাঞ্চ ম্যানেজার করে পাঠানো হচ্ছে। ২ বছর থাকতে হবে ওখানে। তারপর আমার কাজে ম্যানেজমেন্ট সন্তুষ্ট হলে, কলকাতার হেড কোয়ার্টারে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হবে।
বললাম, তার মানে কালই আমাকে শিলিগুড়ি যেতে হবে? না, সাতদিন তোমাকে হেড কোয়ার্টারে থাকতে হবে। তারপরই শিলিগুড়ি। আমি অকারণে একটা প্রণাম করে উঠে পড়লাম, কিন্তু উনি কোন বাধা দিলেন না।
কাজে জয়েন করেছি কাল, ফোন নং দিয়ে দেওয়া হয়েছে পিসি ও মাকে। আজ অফিসে ঢাকার মিনিট পাঁচেক পরে পিসি ফোন করে জানালেন, আজ ভোরে বাবা এসেছেন। তুমি যদি পার বিকেলে এস। বললাম তুমি অফিস থেকে বলছ? হ্যাঁ, সঙ্কোচে জানতে চাইলাম সেলিনা কি বাবাকে সামলাতে পারবে। ওই তো আমাকে জোর করে পাঠিয়ে দিল। সীতাংশুদাও বললেন, তুমি যাও নীলাঞ্জনা। বৌমা তো আছে। বাবার মুড কেমন দেখলে? গ্রামের মানুষ ভাল বা মন্দ কোনটারই প্রকাশ সোচ্চার নয়। বিকালে আসলে সব জানতে পারবে। এখন ছাড়ছি। মিনতিকে জানিয়ে দিও। তুমি জানিয়ে দাও পিসি সেইটেই ভালো হবে। আচ্ছা।
