একটু রাতের দিকে মিনতি সেন সেলিনাকে নিয়ে ফিরলেন। বললেন, ওকে নিয়ে এলাম ঠিকই কিন্তু কাল বা পরশু তোর বাবা আসবেন। তোর পিসিকে তোর বাবা যে ভাবে চিঠি লিখেছেন, তাতে খুব ভয় হচ্ছে। বাবার চিঠিতে ভয়ের কথা আছে? অন্তত চিঠিটা পড়ে আমার তাই মনে হয়েছে। বাবা চিঠিতে কি লিখেছেন? মিনতি সেন বললেন, আমি নিয়ে এসেছি। তুই পড়ে দেখ। পড়তে লাগলাম, বাবা লিখেছেন–
কল্যাণীয়া নীলাঞ্জনা, তোমর চিঠি পেয়েছি, চিঠিতে জানিয়েছে, তোমার মেয়ে সেলিনাকে প্রান্তিক বিয়ে করেছে। সেলিনা মানে যাকে নিয়ে তুমি এখানে এসেছিলে সেই তো? দেখ নীলাঞ্জনা ও যখন বিয়ে করেছে, নিশ্চয়ই জেনে শুনে করেছে। নিজের পরে গভীর বিশ্বাস আছে বলেই আমার বা ওর মায়ের অভিমত নেওয়ার কোন প্রয়োজন বোধ করেনি। তেমনি তোমরাও কোন প্রয়োজন মনে করোনি। আমরা কিন্তু শুনেছিলাম রেহানা নামে একটা মেয়েকে ও ভালবাসে। আর ওর ভালবাসা যাতে ব্যর্থ না হয়ে যায়, তাই তারই মঙ্গলার্থে মেয়েটি পথে নেমেছে। একদিন মেয়েটি আমাদের গ্রামেও এসেছিল। চিনতাম নাতো, তবে মেযেটির মিষ্টি মুখ তার নম্রতা আমাকে মুগ্ধ করেছিল, মনে হয়েছিল এমন মেয়েকে নিজের জীবনের সঙ্গে জড়াতে চেয়ে প্রান্তিক কোন অন্যায় করেনি। অথচ আজ দেখতে পাচ্ছি তাকে ভুলে যেতে বেশী সময়ও লাগেনি। তোমার মেয়েকেও হয়তো ভুলে যেতে ওর বেশী সময় লাগবেনা।
রেহানা এবং সেলিনা নাম দুটো শুনে মনে হচ্ছে তারা আমাদের স্বজাতি বা স্বধর্মীয় কেউ নয়। ধর্মীয় ছুৎ মার্গ আমার নেই। তাই সেলিনাকে আমি আমার পুত্রবধু হিসাবে গ্রহণ করলাম। তোমার মেয়ে এর থেকে বেশী দাবী না করলেই খুশী হবো। আর একটা কথা সমাজকে তোমরা না মানতে পার, আমার তো না মেনে উপায় নেই।
ইতি সীতাংশুদা।
ইচ্ছে ছিল না তুব সেলিনা যেহেতু দাঁড়িয়ে আছে আমার কাছে, তাই পড়া হয়ে গেলে চিঠিটা তাকে দিয়ে দিলাম। ও পড়ে আমাকে ফেরৎ দিয়ে বলল, তুমি খুব ভাবছ? একটুতো ভাবছি। না ভেবোনা, আমার পরে বিশ্বাস রাখ, দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। তাই যেন হয়।
রাতে বলল, বাবা যখন আসবেন, তোমার পিসির ওখানে তোমার যাওয়ার দরকার নেই। সেকি কথা, উনি কি ভাববেন? ওনার তো ভাবার কিছু নেই, তুমি তোমার মায়ের কাছে আছ আমি আছি আমার মায়ের কাছে। এতে ভাবতে যাবেন কেন? তাছাড়া আমাকে তো উনি মেনে নিয়েছেন। তা হয়তো নিয়েছেন, তবু যে কথা বলেছেন, যে তোমাকেও একদিন ভুলে যাবো। সেটাই তো চ্যালেঞ্জ প্রান্তিক, জীবনে চ্যালেঞ্জ না থাকলে সব কিছু কেমন জলে মনে হবে। কিন্তু তার আশঙ্কা যদি সত্যি হয় কোন দিন। সেলিনা বলল, পৃথিবীর সব আশঙ্কা কি সত্যি হয়, তা হলে তো ঈশ্বরের কোন দরকার ছিল না, মানুষই তার শেষ নিয়া হতে পারতো। তুমি আমার উপর এত বিশ্বাস রাখছ কেন? কারণ আমি তোমাকে জানি। বুঝি। রেহানাকে তো তুমি ভুলে যাওনি, তুমিতো তাকে প্রতিমুহূর্তে পেতে চেয়েছো আমার মধ্যে। আমিও প্রতিমুহূর্তে রেহানা হয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। তুমি কি বুঝতে পার না আমাকে? পারি সেলিনা, আর এজন্য খুব কষ্ট হয় জান? কেন? আমি বুঝতে পারি না রেহানার শান্ত স্বভাব না তোমার উচ্ছলতা কোনটা আমাকে বেশী টানে। তাছাড়া এই যে একজনের মনকে বুঝে নিজেকে পরিবর্তন করা এই যে ত্যাগ। আমার কষ্ট কমায় না সেলিনা, বাড়িয়ে দেয় মাত্র। আমি তোমাকেও বুঝিনা প্রান্তিক, কখন কি চাও তুমি। আমার উচ্ছলতায় তোমার মনের পর্দায় ভেসে ওঠে রেহানার মুখ, তাই তোমার কণ্ঠে উচ্চারিত হয় রেহানা, আবার আমি যখন শান্ত হয়ে ঠিক রেহানা হতে চাই তখন তোমার মনের পর্দায় ভেসে ওঠে সেলিনার ছবি, তোমার কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয় সেলিনা। আমি যে কি ভাবে তোমাকে পাব বুঝিনা। মাঝে মাঝে কি মনে হয় জান? কি? আমি বোধ হয় তোমার জীবনে না এলে ভাল হতো। আমি কিন্তু তা ভাবিনা। আমি সব সময় চাই, তুমি শুধু তোমার মত হয়ে আমার কাছে এস। না গো তাতে তোমার কষ্ট আরো বাড়বে। তুমি শুধু আমার কষ্টটা দেখলে নিজের কষ্টটা দেখছনা? তোমাকে সুখী করার জন্য, তোমার মুখে হাসি ফোঁটানোর জন্য কোন কষ্টটাকেই আমার কষ্ট বলে মনে হয় না। জানতো মেয়েরা কোন সুরে বাজবে তা নির্ভর করে পুরুষের ইচ্ছের পরে। নারী দেহতো একটা যন্ত্র মাত্র। তাতে সুর দেওয়ার দায়িত্ব পুরুষের। তুমি যে সুর বাজাতে চাইবে, যদি সে সুরে বাজতে না পারি তা হলে বুঝবে, যন্ত্রটাই বিকল হয়ে গেছে। তারপর একটু থেমে বলল, আমার জন্য ভেবোনা প্রান্তিক, তোমাকে সুখী দেখার জন্য আমার কোন কষ্টটাকে কষ্ট বলে মনে হয় না। দেখো, তোমার বাবা, আমাকে সেলিনা হিসাবে ভাবতেই পারবেন না, তার চিন্তায় তাল গোল পাকিয়ে যাবে। আমি বললাম, তাতে যদি তিনি ভুল বোঝেন। যদি মনে করেন, তুমি একজন নিখুঁত অভিনেত্রী, তুমি যদি ছোট হয়ে যাও তার কাছে আমার কষ্ট কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে বুঝতে পারছ? বাবার কাছে সন্তান তো সব সময় ছোট। তুমি ভেবো না। কতদিন পরে তোমাকে কাছে পেয়েছি, মিথ্যে মন খারাপ করে রাতটাকে নষ্ট করা না প্রান্তিক। কাছে এস। ওর আকর্ষণে মুহূর্তে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম ওর মধ্যে
সকালে মিনতি সেন বললেন, তুই নাকি যাবি না, পিসির কাছে। হ্যাঁ মা, ভট্টাচার্য সাহেবেরে ওখানে একবার যেতে হবে। উনি বলেছিলেন, পরীক্ষার পরেই যেন জয়েন করি। কিন্তু তুই যে বললি, তুই তোর কাকুর ফার্মে জয়েন করবি। বলেছিলাম। কিন্তু কাকু নিজেই বললেন, আমি যেন ভট্টাচার্য সাহেবের দেওয়া অফারটা গ্রহণ করি। যা ভাল বুঝিস কর। ভবিষ্যতে আমাকে দোষারোপ করবিনা। আমি বললাম মা, কাকু বা ভট্টাচার্য সাহেব যাই বলুন না কেন কিন্তু তুমি যা বলবে, তাই হবে। দেখ এতবড় দায়িত্ব আমাকে দিস না। তোরা এযুগের ছেলে মেয়ে। ভবিষ্যত আমাদের থেকে অনেক ভালভাবে বুঝতে পারিস। তাই সিদ্ধান্তটা তোদরই নেওয়া উচিৎ। তুমি রাগ করছ। রাগ করব কেন? শোন মা, আমাকে প্রথমে কাকুই জানান যখন উনি মেদিনীপুরে ছিলেন। আমি ওদের ওখানে কাজ করব না ভট্টাচার্য সাহেবের অফার গ্রহণ করব, আমার এ প্রশ্নের উত্তরে উনি বলেছিলেন, আমি কি ভাবে ওর কাছে এই উপদেশ চাইছি। বলেছিলাম আমার একজন শুভাকাঙ্খী হিসাবে। তখনি উনি বলেন, তা হলে তোমার ভট্টাচার্য সাহেবের অফার গ্রহণ করা উচিৎ।
