মিনতি সেন উঠে চলে গেলেন। তারপর কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে বললেন, গায়ে কি এখনো জ্বর আছে? না, তা হলে, চলুন বাথরুমে। ভাল করে মাথায় জল দেবেন। গা টাও ভাল করে মুছে নিতে পারবেন। কিন্তু। আবারও সেই মৃদু হাসি মিনতির ওষ্ঠে। বললেন আমাকে স্পর্শ করতে যদি সঙ্কোচ বাধা না হয়ে দাঁড়ায় তাহলে আমার কাঁধে ভর দিন। তারপর চলুন। প্রতীমবাবু বললেন, না থাক, মিস সেন। কি দরকার, একটা দিনের আনন্দ যজ্ঞে ভাগ বসিয়ে। তার থেকে যেমন আছি তেমনিই থাকি না। আমার তো অসুবিধা হচ্ছে না। মিনতি সেন বললেন, জীবনে একটা দিনের স্মৃতি কি কম? তুচ্ছ ঘটনায় কত জীবন উৎসগীত হয়ে যায় জানেন? জানি। তাহলে? প্রতীমবাবু বললেন আপনি বোধ হয় জানেন না তুচ্ছ ঘটনায় উৎসগীত সেই জীবন, কি ভাবে তার দেনার ঋণ শোধ করে চলে। জানি। জানেন? না জানলে, এলাম কি করে? তারপর বললেন আর কথা বাড়াবেন না, এমনিতেই লাঞ্চের দেরি হয়ে গেছে।
মিনতি সেন কাছে এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন, তবু সঙ্কোচে আড়ষ্ট প্রতীমবাবু বললেন, আপনি আগে আগে চলুন, যদি অসুবিধা হয় আপনার সাহায্য নেবো। মিনতি সেন বললেন আপনি কারো কষ্ট বোঝেন না তাই না? হয়তো হবে মিস সেন। আসলে, আমরা কেউ কারো কষ্ট বুঝিনা, অথচ নীরবে বয়ে চলি তা। তাহলে খানিকটা বোঝা নামিয়ে হালকা হতে চেষ্টা করুন না। বেশ। প্রতীমবাবু খাট থেকে নেমে হাত রাখলেন মিনতি সেনের কাঁধে। আর তাতেই ভূমিকম্পের মত কেঁপে উঠলো তার সমস্ত শরীর। প্রতীম বাবু বললেন, একি হল মিস্ সেন? শরীর খারাপ লাগছে? না, চলুন।
রেজার এগিয়ে দিয়ে মিনতি সেন বললেন, দাড়িটা কেটে ফেলুন আমি আছি। আর মনকে বোঝাবার চেষ্টা করুন আপনার কোন কষ্ট নেই। আপনার কিছুই হয়নি, আপনার কোন কিছুরই অভাব নেই। সবই তো আছে আপনার। দেখবেন শরীরের কষ্ট এমনিতেই চলে গেছে। আশ্চর্য দুটো চোখ মেলে তাকালেন প্রতীমবাবু। মিনতি সেনও এই প্রথম বার সরাসরি তাকালেন তার দিকে। প্রতীমবাবুর দাড়ি কামানো হয়ে গেলে, মিনতি সেন এগিয়ে এসে, তার মাথাটা ভাল করে ধুয়ে দিলেন, জামাটা খুলে ফেলে, গীজারে করা গরম জলে গামছা ভিজিয়ে ভাল করে মুছিয়ে দিলেন সমস্ত শরীর। তারপর বললেন, এই নিন, পাজামা পাঞ্জাবি, ওটাকে খুলে রেখে, এটা পরে নিন। আর হয়ে গেলে আমাকে ডাকবেন, আমি বাইরে আছি। প্রতীমবাবু কোন রকম অবাধ্য না হয়ে তার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে দরজার বাইরে পা দিলে মিনতি সেন এগিয়ে এসে তার হাতটা নিজের কাঁধের পরে নিয়ে বললেন চলুন। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতীমবাবু মাথার চুলটা ঠিক করে নিয়ে বিছানায় বসতে গেলে মিনতি সেন বললেন, খাবেন না কিছু? অসহায় শিশুর মত প্রতীম বাবু বললেন খাওয়াতো দরকার কিন্তু আছে কি কিছু? আবার সেই মধুর হাসি মিনতি সেনের ওষ্টাধরে মিলিয়ে গেল। বললেন, ডাইনিং টেবিলে আসুন। মিনতি সেন খাবার সাজিয়ে দিলে অবাক হয়ে প্রতীমবাবু বললেন, এসব আপনি কোথায় পেলেন মিস সেন। হাসি আড়াল করে বললেন আপনার বান্না ঘরে। আপনি খাবেন না? খাবো, আপনি আগে খেয়ে নিন। তা হয় না, আপনিও বসুন। আপনি বড় বেয়াড়া তর্ক করেন, আগে খেয়ে নিন, তাছাড়া এসময় আমি খাইনা। প্রতীমবাবু এর পরে আর তাকে জোর করলেন না। এমনতেই, কেন যেন মনে হচ্ছে অনেক বেশী দাবী করা হয়ে যাচ্ছে। সবকিছু শেষ হতে প্রায় ৪টা বেজে গেল। মিনতি সেন বললেন এবার আমাকে যেতে হবে। আশা করব কাল না হলেও পরশু আপনি অফিসে জয়েন করতে পারবেন।
কে যেন বেল দিল। মিনতি সেন এগিয়ে এসে দেখেন সকালের সিস্টার। উনি খেয়েছেন তো? সে আপনি দেখবেন, আপনার পেসেন্ট ঠিক মত শুশ্রূষা করা গেছে কি না। কিন্তু সিষ্টার ঘরটাকে এমন নোংরা করে রেখেছিলেন কেন? পেশেন্টের জামা-প্যান্ট তো মনে হয় কয়েকদিন ধরে পাল্টাননি, জানলাগুলো বন্ধ রাখেন কেন? শুধু ওষুধ খাওয়ালে কি রোগী চিকিৎসা হবে? ভয়ে ভয়ে সিষ্টার বললেন উনিতো কথা শুনতে চাননা। কথা না। শুনলে জোর করে শোনাবেন। তারপর প্রতীমবাবুকে বললেন দেখুন মিঃ চৌধুরী সিষ্টারের কথার অবাধ্য হবেন না। তারপর বেরিয়ে এলেন মিনতি সেন একবারও পিছন ফিরে তাকালেন না।
গতকাল আমার পবীক্ষা শেষ হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম সেলিনা–পিসিকে নিয়ে আসবে। কিন্তু আসেনি। মিনতি সেন বললেন আজ কি তুই যাবি তোর পিসির ওখানে? কেন? বা রে? মেয়েটা ওখানে কতদিন থাকবে? ওকে নিয়ে আসবি না? আজ আমার কাজ আছে মা। অফিস থেকে ফেরার পথে তুমি যেওনা। কেন তোর কি নিয়ে আসূতে লজ্জা করছে? না। তবে? আমিতো বলেছি আমার কাজ আছে। তুমি যেতে পারবেনা? দেখি বলে অফিসে বেরিয়ে গেলেন মিনতি সেন।
আধ ঘন্টা পরে ফোনটা বেঝে উঠলো। হ্যালো। বলতো কে বলছি? সেলিনা। তা হলে চিনতে পারছ? কবে আসছ? মা যাচ্ছেন বিকেলে। তুমি আসবে না? কেন? ভীষণ ভাবে একটা সিনেমা দেখতে ইচ্ছে করছে। পিসি কোথায়? অফিসে। তুমি কোথা থেকে ফোন করছ? রাস্তার একটা বুথ থেকে। তা হলে নুন শশাতে চলে এস। বললাম মা আবার কখন যাবে কে জানে। যদি গিয়ে আবার তোমাকে না পান, কষ্ট পাবেন। ও জোর করে বলল কিছু কষ্ট পাবেননা। তুমি এস তো। কতদিন তোমাকে দেখিনা। এরপর সিনেমা দেখে আমরা যখন এলিট থেকে বেরোলাম, একেবারে মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল অনুতপার সাথে। আমার হাতটা ছেড়ে দিয়ে পাশে সরে গিয়ে দাঁড়ালো সেলিনা। হাসতে হাসতে অনুতপা বলল নতুন বৌকে নিয়ে সিনেমায় এসেছিলে? সিনেমায় এসেছিলাম ঠিকই, তবে নতুন নয় বেশ কিছুদিনের পুরানো বৌকে নিয়ে। হেসে উঠলাম আমরা সবাই। তারপর অনুতপা বলল, তুমি কিন্তু ডাবল লাভ করেছে প্রান্তিক। মানে? পরিচিত যে কেউ হঠাৎ ওকে দেখে বলবে রেহানা। অথচ আমরা তো জানি ও সেলিনা। আমি হাসতে হাসতে বললাম তুমি যা বলেছে, তাইতো আমিও ওকে প্রায়ই ভুল করে রেহানা বলে ডেকে ফেলি। তাতে ও রাগ করে না? ওকেই জিজ্ঞাসা করে দেখোনা। সেলিনা হাসছে। অনুতপা বলল, তার আর দরকার নেই, ওর হাসি দেখে বুঝতে পারছি ও তোমার মন থেকে রেহানার দুঃখ ভুলিয়ে দিতে চায়। আমি বললাম, তুমিও কি সিনেমা দেখতে এসেছিলে? ভেবেছিলাম, কিন্তু হলো না। কেন? একটা জরুরী কাজ পড়ে গেল। তারপর বলল, চলি তা হলে প্রান্তিক। একদিন বৌকে নিয়ে এসো না। পুরানো বন্ধুদের সঙ্গে আজকাল আর দেখাই হয় না। তা তোমার পরীক্ষা কেমন হয়েছে? ভালো। তুমি কি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করবে? চলনা কোথাও গিয়ে চা বা কফি খাওয়া যাক। ও হাসতে হাসতে বলল, তোমাদের রস ভঙ্গ করে? আমি বললাম, তুমি কিন্তু আগের মত আছো অনুতপা। তোমার কি খুব পরিবর্তন হয়েছে? তা একটু হয়েছে যেমন? এই বাঁধা গরু আর ছাড়া গরুর মধ্যে যে পরিবর্তন তেমনি আর কি? ও বলল আমার কিন্তু তা মনে হয় না। তবে কি মনে হয়? তুমি আগের মতোই আছে। আমি হেসে বললাম, তা এই কথাটা তুমি একটু বুঝিয়ে বলো না কেন? ও তোমার কথা শুনছে না? ঠিক তা নয়। তা হলে? তোমার তো বর আসেনি এখনো আসলে দেখতে পেতে সেলিনার সাথে তোমার চিন্তার বেশী কিছু পার্থক্য নেই। কি রকম? এই সব সময় বরকে সন্দেহ করা। অনুতপা বলল তোমার বিচার বড়ই এক পেশে হয়ে যাচ্ছে, বৌরা সন্দেহ করে, বররা করে না? করে হয়তো, কিন্তু আমার মুসকিল হচ্ছে, সেলিনাকে সন্দেহ করার মত সামনে যে কাউকে পাচ্ছিনা। জিভ কেটে অনুতপা বলল, খুবই পরিতাপের কথা প্রান্তিক, কিন্তু অেমার সন্দেহকে সত্য করতে ও বেচারা যায় কোথায় বলত। বরং তুমি নিজেই কাউকে জোগাড় করে দাও। দাম্পত্য জীবনে একটু কলহ না হলে মধুরতার স্বাদ পাবে না। তুমি জানলে কি করে? তোমার তো বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। সব কিছু ব্যক্তি জীবনে ঘটলে অভিজ্ঞতা হবে, অন্যথায় হবে না এমনতো কোন কথা নেই। তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু মুসকিল হচ্ছে, সেলিনা তা মানতে চায় না, নিজের অভিজ্ঞতায় যাচাই না করে ও কিছু বিশ্বাস করতে চায় না। তা হলেতো আর সমস্যাই রইলনা। কি করে? ওই সমস্যা সৃষ্টি করবে, আবার তা মিটিয়েও নেবে, কি ভাই সেলিনা তাইতো। ও কোন উত্তর না দিয়ে শুধু হাসলো, তারপর অনুতপাকে বলল অনুদি আপনাকে আমার ভীষণ ভালো লাগেছে। আগেতো আপনার সঙ্গে পরিচয় ছিল না, আসুন না একদিন। সেদিনই ভাল করে জেনে নেবেন ও যা বলছে, তা ও নিজেই বিশ্বাস করে কি না। তারপর বলল ওতো অবলীলায় এখন যা বলছে একটু পরেই তো অস্বীকার করবে। আমি বললাম দেখলে তো অনুতপা কি ভাবে আমার পিছনে লাগছে। তা দেখলাম বৈকি, তোমার ভাগ্যকে সত্যি হিংসা করতে ইচ্ছে করে। আমি বললাম ইচ্ছে করে, কিন্তু সত্যিকারের হিংসা করোনা হতো। নিশ্চয়ই করি। তবু ভালো, তুমি সেলিনার ভাগ্যকে হিংসা করনি, তা হলে যে কত রাত আমাকে জ্বলতে হতো কে জানে? হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, এই রে বড্ড দেরি হয়ে গেছে আসি প্রান্তিক, আসি ভাই সেলিনা। সেলিনা বলল, তাহলে আপনি আসছেন তো আমাদের বাড়ীতে? আচ্ছা যাবো।
