মিনতি সেন কয়েকটা ঘর পরে গিয়ে দেখেন একা নিঃসঙ্গ ভাবে শুয়ে আছেন প্রতীমবাবু। ঘুমাচ্ছেন। মিনতি সেন বললেন, যখন জাগবেন তখনি কথা বলা যাবে। কিন্তু আপনাকে তো চিনতে পারছি না। আমাকে চেনার কি খুব দরকার? না এমনিতে কিছু নেই, তবে যদি দেরি না করতে পারেন, তা হলে সাহেবকে বলতে হবে তো? না, তার কোন দরকার নেই, আমি ওর সঙ্গে দেখা করেই যাবো। তবুও যদি কিছু মনে না করেন। বলুন। আমি সাহেবকে বলেছিলাম, আমাকে যদি আজ ছুটি দিতে পারেন আমার বাবা খুব অসুস্থ। উনি বলেছিলেন দেবেন। ওঁর কে এক আত্মীয় ভাইপো বোধ হয় এসে থাকবেন। আমি সেই ভাবে প্রস্তুত হচ্ছিলাম। কিন্তু পরে উনি লোক পাঠিয়ে জানালেন যদি অন্তত ঘণ্টা দুয়েক থেকে যাই। দেখুন প্রায় ৪ ঘন্টা হয়ে গেছে, কিন্তু সাহেব এখনো কিছু বললেন না। মিনতি সেন বললেন তবে চলে গেলেন না কেন? কি করে যাই এই অসুস্থ মানুষটাকে ফেলে বলুন? এখন যদি আপনি কিছুক্ষণ থাকেন, তা হলে আমি কথা দিচ্ছি, ঘণ্টা চারেক পরে আমি ফিরে আসবো। তারপরে আকুল ভাবে বললেন, আমি না যেতে পারলে ভীষণ অসুবিধা হবে। মিনতি সেন বললেন, আচ্ছা আপনি যান আমি থাকবো আর যাওয়ার আগে শুধু বলে যান কখন কি খাওয়াতে হবে। মেয়েটি যেন স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ল। বলল, আপনি আমাকে বাঁচালেন। তারপর ও সব বুঝিয়ে দিয়ে চলে গেল। মিনতি সেন ততক্ষণে, ঘরের এলোমলো জিনিষগুলো গুছিয়ে রাখলেন। যেখানে যেগুলি রাখলে সুন্দর হয় সেখানে সেগুলো রেখে বদ্ধ ঘরের জানালা গুলো খুলে দিলেন। বাইরের ঠান্ডা হাওয়া এসে ঢুকলো ঘরে। জানালা দিয়ে ক্যামপাশের বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ দেখা যাচ্ছে। মিনতি সেন একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসলেন প্রতীমবাবুর মাথার কাছে মুখোমুখি। কি কাহিল হয়ে গেছেন, কদিনে। ভীষণ মায়া হতে লাগল। খোঁচা খোঁচা দাড়ি হয়েছে। জুলপির কাছে চুলে পাক ধরেছে সঙ্গে গাম্ভীর্য মিশে তাকে যেন আলাদা সৌন্দর্যের অধিকারী বলে মনে হচ্ছে। হঠাৎ পাশ ফিরে শুতে গিয়ে চোখ মেলে তাকাতে গিয়ে মিনতি সেনের চোখে চোখ পড়ল। অবাক হয়ে বললেন আপনি? উঠে বসতে চেষ্টা করলেন প্রতীম চৌধুরী। মিনতি সেন তাকে বাধা দিয়ে বললেন উঠবেন না। কতক্ষণ এসেছেন? তা প্রায় ঘণ্টা দুয়েক হবে। অথচ আমাকে ডাকেন নি? না ডাকিনি কারণ আপনার বিশ্রামের ব্যাঘাত ঘটাতে চাইনি। এরপর স্মিত হেসে বললেন, তাহলে ঈশ্বরের প্রতি আপনার বিশ্বাস ভেঙে গেছে কি বলেন? বুঝতে পারলাম না। কেন মাত্র কয়দিন আগে তো বলেছেন, ঈশ্বর অপনাকে অসুস্থ করতে ভুলে গেছেন। একটু লজ্জা পেয়ে প্রতীমবাবু বললেন, আপনি কেন কষ্ট করে আসতে গেলেন? মেয়েটি আবার কোথায় গেল কে জানে? কে আপনার নার্সতে? হ্যাঁ? ওকে তো আপনি আজ ছুটি দেবেন বলেছিলেন। বলেছিলাম, কিন্তু যখন বুঝতে পারলাম প্রান্তিক আসতে পারবেনা, তখন বাধ্য হয়ে ওকে আবার ডেকে পাঠাতে হলো। খুব ভাল। এই মন নিয়ে আপনি নাকি মানুষের উপকার করেন। তারপর বললেন যে মেয়ে তার অসুস্থ বাবাকে দেখতে যাওয়ার অনুমতি পায় না, সেই মন নিয়ে মানুষের কষ্ট বুঝবেন কি করে? তারপর বললেন তা ও যে চার্ট দিয়ে গেছে, তাতে তো আপনার লাঞ্চের সময় হয়ে গেছে। কি খাবেন? যদি ও কিছু করে গিয়ে থাকে ভাল, না হলে খাওয়া আজ আর হবে না। বাঃ চমৎকার। এরপর মিনতি সেন বললেন এতবড় কোম্পানীর সর্বেসর্বা আপনি। অজস্র প্রতিষ্ঠান চালান, তারা পালা করে কেউ থাকতে পারল না আপনার দেখাশুনার জন্য? প্রতীমবাবু চুপ করে আছেন, কি উত্তর দেবেন এর? ম্যানেজমেন্ট তাকে নাসিং হোমে থাকতে বলেছিলেন, তিনি রাজী হননি। তারা যে পালা করে থাকবেন, সে উপস্থিতির আর্জিও মঞ্জুর হয়নি। একথা কি করে বলা যায়। মিনতি সেন ভিতরে গিয়ে কফি এবং বিস্কুট নিয়ে এলেন। নিন খেয়ে নিন। কোথায় পেলেন? বা অদ্ভুত প্রশ্ন তো? আপনার ঘরে সবই আছে, আর আমি একটি মেয়ে, কোথায় পেয়েছি এটাও আপনাকে বলতে হবে? প্রতীমবাবু বললেন, আপনার কফি? আনি বলে মিনতি সেন, আরেক কাপ কফি নিয়ে এলেন। তারপর বললেন, দাড়ি কামাননি কেন? পাজামা পাঞ্জাবিও তো বেশ কয়েকদিন পরে আছেন মনে হচ্ছে? কফিটা খেয়ে ও গুলো ছেড়ে দিন। কি করবেন? ভয় নেই কিছুই করবনা, বাথরুমে রেখে যাবো। তারপর বললেন, কি অদ্ভুত মানুষ আপনি, সত্যি কথাটিও বলতে পারেন না। প্রতীমবাবু বললেন সত্যি কথা না বললে আপনি এলেন কেন মিস সেন? মৃদু হাসলেন মিনতি সেন এবং বললেন আপনার এই অবোধ্য ভাষা কজনে বোঝেন বলুন তো। জানিনা, কিন্তু আপনি যে বুঝেছেন, আপনি কি তা অস্বীকার করতে পারবেন? তারপর বললেন এই মন নিয়েই তো আপনি সেদিন বলেছিলেন কোন অধিকারে আমাকে থাকতে বলবেন ম্লান হেসে এরপর বললেন আজ কি প্রশ্ন করা অসঙ্গত হবে, যে কোন অধিকারে আপনি এলেন?
মিনতি সেনের মনের মধ্যে চলছে সাগরের উন্মতা। ঢেউয়ের পরে ঢেউ এসে ভেঙে দিচ্ছে তার চিন্তার সাবলীলতা। বললেন, আমার না হয় আপনাকে থাকতে বলার অধিকার ছিল না। কিন্তু আপনার তো ছিল, সেই অধিকারটা কেন প্রয়োগ করলেন না। কেন অতরাতে মিথ্যে অজুহাতে ফিরে এলেন? সারাটা জীবনতে আঘাত পেয়ে চলেছেন, আর কত আঘাত পেতে চান? অবাক হয়ে প্রতীমবাবু বললেন, আঘাত? না মিস সেন, আঘাত আমার বুকে বাজেনা। নিজের বুকে বাজেনা বলে বুঝি অন্যের বুকে তা ফিরিয়ে দিয়ে আনন্দ পান?
