আমাকে যখন বলল, আমি সানন্দে রাজী হয়ে গেলাম। কয়েকদিন নীলাঞ্জনা পিসির জন্য ভীষণ মন খারপ করছিল। সেলিনা বলল, একটা কথা বলব? বল। তোমার পরীক্ষার আর কদিন বাকি আছে? ঠিক মত ধরলে ২৫ দিন। শেষ হতে আরো ১০ দিন। সেলিনা বলল তার মানে মোট ৩৫ দিন। এই ৩৫টা দিন তুমি আমাকে রেখে আসবে মায়ের কাছে? আমাকে বুঝি ভাল লাগছে না। তারপরে হেসেবললাম, বেশ রেখে আসব, কিন্তু ওখানে এতদিন থাকতে চাইছো কেন? দেখ মায়েরও একটা মন আছে। তোমার পরে তারও একটা দাবী আছে। কিন্তু সত্যি করে বলতো, মায়ের সেই দাবী কি তুমি পূরণ করেছে আরো বলল, তুমি হয়তো ভাবছো তোমার মায়ের শূণ্যতা যতবেশি পূরণ করতে পারবে ততটাই তোমার লাভ? বুঝলাম না। তুমি ভালো করে জান, তুমি না চাইলেও তোমার দাদুর এই বিশাল সম্পত্তির মালিকানা একদিন তুমি পাবেই। তোমার মা, এর কোন কিছুতেই কোন দিন হাত দেবেন না। আর সেই কৃতজ্ঞতায় তুমি এখান থেকে যেতে পারছ না। কিন্তু আমার মাতো তোমার পিসি, আজকের তোমাকে গড়ে তোলার কারিগরতো আমার মাই, তুমি অস্বীকার করতে পার? যা সত্য, তাকে অস্বীকার করা যায়? তা হলে এতদিনেও কয়েকটা রাত সেখানে থাকলেনা কেন? হয়তো তুমি ঠিক বলেছো সেলিনা আমি যে তা বুঝিনা তাও নয়, কিন্তু পিসিও তো একবারও বললেন না, তোরা কদিন থেকে যা প্রান্তিক। তিনি হয়তো অভিমানে বলেননি, তাই বলে তুমি থাকবেনা কেন? তাছাড়া মায়েরতো আজ কোথাও কেউ নেই। একটুও বুঝবেনা তার কথা?
ও যা বলছে কোন ভাবে তা অস্বীকার করতে পারিনা। বললাম, তাহলে পরীক্ষার এ কয়দিন আমরা ওখানেই থাকি। আমি কিন্তু সে কথা বলিনি প্রান্তিক। তারপর বলল দেখ, একটা কথা বলছি, তুমি অন্য ভাবে নিওনা। বল। আমি তোমার কাছে থাকলে তোমার পড়াশুনার ক্ষতি হবে। আমি বাধা দিয়ে বললাম, আমি যদি বলি তার উল্টোটা হবে। ও মৃদু হেসে বলল উল্টো টা যে হওয়ার নয় তার প্রমাণ গত একমাস। সুতরাং আমার পরে রাগ করোনা লক্ষ্মীটি, মায়ের ওখানে গিয়ে আমি যে কোন অজুহাতে থেকে যেতে চাইব। তুমি এতে না করোনা। কিন্তু পিসি যদি কিছু বলেন বা কারণটা জানতে চান? দোষটা নিজের ঘাড়ে চাপিয়ে নিও। বলবে তোমাব পড়াশুনার অসুবিধা হবে। আচ্ছা তাই হবে।
সিদ্ধান্তটাকে বাস্তবায়িত করতে খুব একটা অসুবিধা হয় নি। ওনারাও হয়তো মনে মনে চাই ছিলেন এমন কিছু। কিন্তু পিসির কাছে দুই দিন থাকতে হয়েছিল।
এই দুইদিনের মধ্যে প্রতীমবাবু একদিন ফোন করেন মিনতি সেনের বাড়ীতে। হ্যালো! মিনতি সেন ইজ স্পিকিং। ও নমস্কার, আমি প্রতীম চৌধুরি বলছি। নামটা শোনামাত্র অকারণ হাতটা কেঁপে গেল মিনতি সেনেব। কোন ভাবে নমস্কার করে বললেন কেমন আছেন? উত্তর এড়িয়ে গিয়ে প্রতীমবাবু বললেন, প্রান্তিক বা সেলিনা কেউ কি কাছে আছে? খুব দরকার? হ্যাঁ দরকার একটু ছিল। আমাকে বলা যায় না? যায়, তবে কিভাবে নেবেন। তা হলে থাক, আমি ওদের সংবাদ পাঠিযে দেবো। না দরকার নেই আপনাকেই বলছি, মিনতি সেন শোনার অপেক্ষায় চুপ করে থাকেন। প্রতীম চৌধুরী বলেন, প্রান্তিক কি আজ একবার আসতে পারবে? আজই? কেন অসুবিধা হবে? না, তা নয়, আসলে ওরা নীলাঞ্জনার ওখানে। ওদের বাড়ীতে তো কোন ফোন নেই। নীলাঞ্জনা অফিসে গেলে সংবাদটা দেওয়া যাবে। তা হলে থাক দরকার নেই। বরং ওরা আসলেই সংবাদটা দেবেন। তা না হয় দেব, কিন্তু আপনার প্রয়োজনটা কিন্তু বলেননি, তাছাড়া আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনার শরীরটাও ভাল নেই। না না শরীর ঠিক আছে। তবে যা মনে হচ্ছে সেটা ২/৩ দিন অফিসে যাচ্ছিনা বলেই হয়তো মনে হচ্ছে। কেন অফিসে যাচ্ছেন না কেন? ভাবলাম ২/১ দিন বিশ্রাম নেওয়া যাক তাই আর কি? আপনার কোযর্টার কি অফিস লাগোয়া? হ্যাঁ অফিস কমপাউন্ডের মধ্যে তবে আপনার চিন্তার কোন কারণ নেই, প্রান্তিক চেনে। আজো অফিসে যাবেন না। না ভাবছি আরো কয়েকটি দিন বিশ্রাম নিয়ে দেখি। কাজের মধ্যে আনন্দ পাওয়া যায় না বিশ্রামের মধ্যে। সেলিনাকে পাঠিয়ে দেব? কয়েকদিন থেকে আসবে আপনার কাছে। না না দরকার নেই মিস সেন। বড্ড বেশী লোভ হয়ে যাবে তাছাড়া প্রান্তিকের তো পরীক্ষা এসে গেলো মনে হয়। তারপর বেশ জোরের সঙ্গে বললেন কোন দরকার নেই মিস সেন বরং আজ বা কাল যদি কিছুক্ষণের জন্য প্রান্তিক আসতে পারে ভাল হয়। আচ্ছা দেখছি, ধন্যবাদ। ফোন ছেড়ে দিলেন প্রতীমবাবু। মিনতি সেন ভাবছেন কি করবেন, অফিসে যাচ্ছেন না ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছেন, অথচ বলছেন শরীর ঠিক আছে। এখন যদি প্রান্তিককে বলি, তাহলে হয়তো তার পড়াশুনা বন্ধ করে ওখানে কয়েকদিন যাতায়াত করবে অথবা থাকবে। অসম্ভব নয় তাতে ওর পড়াশুনার ক্ষতি হবে। এমনিতেই তো যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে। এক নিজে গিয়ে দেখে আসা যায়। মনে মনে ভাবলেন যদি কিছু ভাবেন? একটা মন যুক্তি খাড়া করে ভাবে ভাববেন, তাই বলে এত আশা করে যিনি ফোন করলেন, তার প্রয়োজনটাও তো জানা দরকার। অবশেষে অফিসে যাওয়ার নাম করে বেরিয়ে পড়লেন মিনতি সেন, আর এই প্রথম কোন এক জনের কাছে যাচ্ছেন মিনতি সেন, যিনি তার প্রেমিক নন, তার স্বামী নন, অথচ তার মনের অবচেতনায় আজো যিনি বেঁচে আছেন স্বপ হয়ে, যে স্বপ্ন কোন দিনই হয়তো পূর্ণ হবে না। পূর্ণ হওয়ারও নয়। পা কাঁপছে, বুকের মধ্যে দুরুদুরু একটা আশঙ্খ। কি জানি যদি কিছু মনে করেন উনি। আবার ভাবেন যদি কিছু মনে করেন, করবেন। কিন্তু যে মানুষটা তারই একটা ছোট্ট উত্তরের জন্য আজ দীর্ঘ ২৫টি বছর জীবনের স্বাদ আহ্লাদ ত্যাগ করেছেন, বিপদের সময় তার পাশে গিয়ে দাঁড়ানো কি তার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে না? প্রতীম বাবুর অফিস চত্তরে ঢুকে, কেমন যেন পা দুটি আর চলতে চাইছেনা। একটা ভীতি ময় অনুভূতি তাকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। একজন বেয়ারাকে ডেকে জিজ্ঞাস করলেন, বড় সাহেবের বাংলো কোনটি? বেয়ারা কোন রকম প্রশ্ন না করে তাকে নিয়ে এলেন বড় সাহেবের বাংলোতে। কাঁপা কাঁপা হাতে বেল টিপলেন মিনতি সেন। একজন নার্স বেরিয়ে এলেন। কাকে চাই? সাহেব ঘরে আছেন? হ্যাঁ। আছেন একটু ডেকে দেবেন? উনিতো অসুস্থ? অসুস্থ? কতদিন। তা বেশ কিছুদিন হল। আপনি? আমি এখানকার একজন সিস্টার। ওনাকে দেখাশুনা করি। আপনি একাই দেখাশুনা করেন? হ্যাঁ সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত আমি দেখাশুনা করি। আর রাতে, ওর অফিসের একজন বেয়ারা থাকেন। মিনতি সেন জানতে চাইলেন ভিতরে আসতে পারি? হ্যাঁ হ্যাঁ আসুননা।
