নীলাঞ্জনা ওকে কাঁদতে দিলেন, কোন রকম সান্ত্বনা না দিয়ে শুধু একটা হাত ওর বুকের উপরে রেখে চুপ করে রইলেন। তারপর এক সময় ভোর হয়। ঘুম ভাঙে আমার। কিন্তু সেলিনা তো নেই কাছে। সারারাত তো পাশেই ছিল। যেন কত যুগ যুগান্তরের অতৃপ্ত আদর দিয়ে ওকে ভরিয়ে দিয়েছি, ও-ও দিয়েছে। দুটি যৌবন যা চায় তারই বিনিময় করেছি আমরা, তবু অতৃপ্ত মন ভোরের আকাঙ্খা নিয়ে আবার যখন ওকে কাছে পাওয়ার জন্য পাশ ফিরেছি, দেখি সে নেই। কুঞ্চিত চাদরটি পরিপাটি করে টানা। এতবড় হল ঘরের কোনদিকেই তো ও নেই। তাহলে গেল কোথায়? হয়তো বাথরুমে। অপেক্ষা করতে করতে কখন যেন ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম আবার। সেলিনা এল, যেন ভোরের যুই। এই সকালেও স্নান করেছে ও। পরেছে নিভাজ নতুন শাড়ী। লাল পাড় ভিতরের খোল আকাশী নীল। সিঁথিতে দিয়েছে সিঁদুর। কপালে পরেছে টিপ। সারা বিছানায় ছড়ানো ফুল কখন যেন একটা একটা করে তুলে নিয়ে ভরেছে প্লাস্টিকের প্যাকেটে, তারপর তা একদিকে গুছিয়ে রেখেছে, যদিও চুল ভেজায়নি সম্পূর্ণ ভাবে, তবু যেটুকু ভিজিয়েছে তোয়ালে দিয়ে মোছা সত্ত্বেও শিশির ফোঁটার মত চিকচিক করছে দুই কপালে গড়িয়ে পড়ার জন্য। আমি অপলক তাকিয়ে আছি ওর দিকে। লজ্জায় রাঙা হয়ে বলল কি দেখছো। বললাম ভোরের যুঁই। ও কাছে এসে বলল উঠবেনা? ইচ্ছে করছেনা। তাহলে তুমি ঘুমাও, আমি দেখি মা কি করছেন। মন ভীষণ ভাবে চাইছিল আমার ভালবাসা ওর অধর স্পর্শে ধন্য হোক। কিন্তু ও পালিয়ে গেল। বলল না না ওটা রাতের অপেক্ষায় থাকুক। রক্তে যখন নেশা লাগে, রাতকে মনে হয় কতইনা ছোট।
এরপর একদিন নেশালাগা সেই রাত এল যদিও, কিন্তু এমন তিক্ত ভাবে এল যে, আমর জীবনে যে ঝড় উঠলো। তা যেন আর শেষ হতে চায় না। কি হয়েছে সেলিনার জানিনে। সারাদিনে একবারও মনে হয়নি, ওর মনের মধ্যে অন্য কোন স্রোত বয়ে যেতে পারে। আমার চাওয়ার উত্তরে ও বলল, জানতো প্রান্তিক ভিখিরিকে করুণা করা যায়, দান। করা যায় না। দান গ্রহণ করতে হলে যোগ্যতা থাকতে হয়। সেলিনা এভাবে যে কথা বলতে পারে ভাবনারও অতীত। অপমানে ভিতরটা জ্বলতে লাগলো। প্রতি উত্তরে বললাম তা ঠিক, তবে গ্রহীতার যেমন যোগ্যতা থাকা দরকার, দাতারও তা থাকা দরকার। দাতার যে যোগ্যতা নেই জানলে কি করে? যে ভাবে জানতে পারলে গ্রহীতার যোগ্যতা নেই। ও বলল, যোগ্যতা যে তোমার নেই সে তো পরীক্ষিত সত্য। মানে? মানে তুমি বোঝনা? না বুঝিনা। তাহলে বুঝেও কাজ নেই। দেখ সেলিনা, এই সব কিছুর জন্য আমি দায়ী নই। দায়ী তুমি? আমি জানি, এবং তোমার থেকে ভালভাবেই জানি। যোগ্যতার নিয়ন্ত্রক কেবলমাত্র আমি। তার ভালোমন্দের দায়িত্বও আমার, আমি তোমাকে চেয়েছিলাম–নিজের যোগ্যতায়। সমস্ত বাধা অতিক্রম করে তোমাকে ছিনিয়ে এনেছি, আজ কেবল তুমি আমারই। তোমার নিজস্ব কোন স্বতন্ত্রতা থাকতে নেই থাকতে পারে না। ভালো লাগা মন্দ লাগার অধিকারটুকুও শুধু আমারই থাক। বললাম এটাই তোমার শেষ কথা? শেষ কথা বলে কোন জিনিষ হয় না প্রান্তিক। আমি চাইনা আমার ভালবাসার নেশায় তুমি ভেসে যাও। তোমার ভবিষ্যৎকে আমি এভাবে নষ্ট করে দিতে পারি না। তার মানে তুমি বলতে চাও তোমার দাম্ভিক অহংকারের কাছে আমাকে মাথা নত করতে হবে? এতে নতুন কথা নয়। সে তো তুমি করেছছই। আর করোছো বলে তোমার ভিতরটা জ্বলে যাচ্ছে। তাই সেলিনাকে আদর করতে গিয়ে রেহানার মুখ ভেসে ওঠে। সেলিনা নামে ডাকতে গিয়ে অসতর্কে উচ্চরিত হয় রেহানা। তবু তুমি বলতে চাও তুমি শুধু আমারই। তার থেকে তুমি একটা কাজ কর না প্রান্তিক, আমার নামটা বদলে নিয়ে রেহানা করে দাও। তাতে তোমারও কষ্ট হবে না, আমিও বাঁচব।
এরপর আর কথা চলে না। পৌরুষে আঘাত লাগা সত্ত্বে বললাম, আমাকে তুমি জান সেলিনা, আমার দোষ গুণ সব মেনে নিয়েই আমাকে তুমি গ্রহণ করেছিলে, রক্তে মিশে আছে যে স্মৃতি তাকে ইচ্ছে করলে কি মুছে দেওয়া যায়? জানি যায় না, তা হলে দ্বিচারিতা না করে তাই বলতে পারতে। বললে কি করতে? তোমাকে মুক্তি দিতাম। পারতে না সেলিনা, আজ নিজেকে যতই শক্তিশালী মনে করোনা কেন, আমাকে হাজার অপবাদ দিলেও আমাকে মুক্তি দেবার শক্তি তোমার ছিল না, আজও নেই। কেন মিথ্যে দম্ভ কর। গোলাপের সৌন্দর্য তার কাটায় লোপ পায় না, কিছুটা দুর্বলতায় ভালবাসা উজ্জ্বলতা পায়। এটা যে তুমি বোঝনা তা নয়। তবু তুমি আঘাত দিতে চাও। দিয়ে যদি তুমি সুখী হও, বুক পেতে দেব তোমার আঘাত গ্রহণ করার জন্য। কিন্তু মাত্র কদিনেই তোমার এই পরিবর্তন আমাকে যে কি কষ্ট দিচ্ছে তা তোমাকে বোঝাতে পারব না। এরপরেও কি আমাদের ভালবাসা শুধু দেনা পাওনার হিসাব কববে না? তুমিতো নিজেই বলেছো রেহানা যদি কোনদিন ফিরে আসে তার হাতে আমাকে তুলে দিয়ে তুমি যে দিকে দুচোখ যায় চলে যাবে। এখনো বলছি। তাই যদি মনে হয়, তাহলে আমার মনের অসতর্ক মুহূর্তে উচ্চারিত রেহানা নামটাকে এত ভয় পাও কেন? তারপর বললাম প্রতীমবাবু ও মিনতি সেন, কেউ কাউকে পায়নি কোন দিন, তাই বলে তাদের জীবন উপলব্ধিকে তুমি অস্বীকার করতে পারবে? তারপর বললাম বলত সেলিনা ওদের নিবেদিত ভালবাসার কোন তুল্য বিকল্প দেখেছো কোথাও? না দেখিনি। তাই বলে না পাওয়াব মধ্যে যে সত্য আছে তার গুরুত্বকে অস্বীকার না করেও বলব, যে জ্বালা শুধু কাদায় আনন্দে ভাসায় না, তা আমি চাইনে। ভুল বললে সেলিনা, ওদের ওই অবয়বহীন ভালবাসায় যদি আনন্দ না থাকতো পৃথিবীর কোন কর্তব্যই তাদের পক্ষে পালন করা সম্ভব হতো না। থাক এসব কথা, রাত হয়েছে অনেক এবার ঘুমিয়ে পড়। তুমি ঘুমিয়ে পড়। আমার যখন ঘুম আসবে তখন আমি নিজেই ঘুমাবো। আমি ঘুমাবো আর তুমি জেগে থাকবে, আমি ঘুমাতে পারব? যদি না পার। তাহলে তুমিও জেগে থাক। ঠিক আছে দেখি তোমার সঙ্গে জেগে থাকা যায় কি না। ইস্ কত যেন ভালবাস আমায়? আমি ওব একটা হাত নিজের বুকের পরে রেখে বললাম, সত্যি তোমায় ভালবাসি না? তুমি বলত, কেমন করে বললে একথা? বলতো আমি কে? আবর সেই ছলনা আবার সেই কথার মারপ্যাঁচ উত্তরে বললাম তুমি! তুমি! ও জেদ ধরে বলল তুমি তুমি কি, বলনা আমি কে? আমি পাশ ফিরে ওকে আমার একেবারে বুকের পরে টেনে নিয়ে বললাম, তুমি আমার সেলিনা, কেবল আমারই সেলিনা। না গো আমি শুধু সেলিনা নই। আমি সেলিনার মধ্যে রেহানা। তারপর বলল তোমার কষ্ট আমি বুঝি প্রান্তিক। শুধু দুঃখ হয় যখন অনুভব করি তুমি আমার কষ্টটা ঠিক মত বোঝ না। কে বলেছে বুঝিনা? সেলিনা বলল আমি বলছি আমার মন বলছে। তা না হলে এক বারও কি তুমি আমার কষ্টের কথা জানতে চাইতে না? জানতে চাইতে না আমার এত কষ্ট কি ভাবে লাঘব হতে পারে। তারপরে বলল তুমি ঘুমিয়ে গেলে আমি যে বাকি রাতটা না ঘুমিয়ে কাদি একবার কি জানতে চাইতেনা কেন আমার চোখে জল? ওর কথা শুনে নিজের পরে ধিক্কার হয়, আমি কি সত্যিই অন্ধ? উত্তরে বলি, সেলিনা প্রেমের দেবী দিয়েছেন আমার ভিক্ষা পাত্র পূর্ণ করে, আমি যে দীন ভিখারি। তাই হয় তো বুঝিনা তোমার আসল কাটা কোথায়? সেলিনা বলল তাই বলল। তোমাদের মহাদেবতো স্বয়ং ভিখিরি। হিন্দু কুমারীতো তবু তারই মত বর খুঁজে ফিরেছে যুগে যুগে। তারপর আমাকে নিবিড় ভাবে আকর্ষণ করে বলল আমার মাথা ঠিক ছিল না। আর আমি যখন তোমারই, পারলে না আমায় আঘাত করতে? আঘাত যে তোমাকে অনেক দিয়েছি তোমার কষ্টই তো তা বলে দিচ্ছে। আরো আঘাত চাও? হ্যাঁ চাই, যত পার আমায় আঘাত কর। আঘাতে আঘাতে আমায় তুমি তোমার করে নাও প্রান্তিক। সেলিনার মধ্যে বেঁচে থাকুক তোমার রেহানা, ও মারা গেলে যে হারিয়ে যাবে তোমার সেলিনাও। এখনো অভিমান। না গো, বিশ্বাস করো, যতক্ষণ তোমায় পাব, যেন সবটুকু তোমাকে পাই। আর তোমার পূর্ণতা তো রেহানা ও সেলিনার প্রেমে। তাহলে কেন কষ্ট পাও? আমার তো কোন কষ্ট নেই। তারপর বলল কিছু চাইবেনা? চাইবো? না তুমি দাতার মত দুহাত ভরে দেবে? আজ আমি শুধু গ্রহণ করব। ভিখিরি মহাদেবের ভিক্ষের দানে নিজেকে নেব পূর্ণ করে, দেবেনা? দাও প্রান্তিক দাও আমাকে পূর্ণ করে, তোমার প্রেমে, তোমার ভালবাসায়, তোমার অতৃপ্ত আকার সর্বগ্রাসী বন্যার মতো আমায় তুমি ভাসিয়ে নিয়ে যাও প্রান্তিক।
১৮. পরীক্ষার মাস খানেক বাকি
পরীক্ষার মাস খানেক বাকি আছে। মিনতি সেন একদিন সেলিনাকে ডেকে বললেন, তোর মা কাল ফোন করেছিল একবার ওখানে যেতে। যাবি আজ? নিশ্চয়ই যাব। তা হলে প্রান্তিককে বল। তুমিও চল না। দূর পাগলি, তোরা যাবি মায়ের ওখানে আমি কেন যাবো? মিনতি সেন আর কোন কথা না বাড়িয়ে নিজের কাজে মন দিলেন।
