ও ঘরে মিনতি সেন ও নীলাঞ্জনা পিসি তখনো কথা বলে চলেছেন। নীলাঞ্জনা বলছেন, আজকের জন্য প্রতীমবাবুকে ধরে রাখতে পারলে না। আমার তো মনে হয় তুমি আরেকটু জোর করলে উনি রাজী হয়ে যেতেন। জানি না নীলাঞ্জনা, উনি যে থাকতে চাননি, যেকোন অজুহাতে চলে যেতে চেয়েছেন এটাই যেন স্বস্তি। এ তোমার স্বার্থ পরের মতো কথা মিনতি। ভাবতে পারছ উনি কখন পৌঁছাবেন বাড়িতে। হয়তো একটু রাত হবে, কিন্তু পোঁছবেন তো। আর পৌঁছালেই কষ্টের লাঘব হবে এক সময়। তার মানে বলতে চাইছে এখানে থাকলে তার কষ্ট হতো। হ্যাঁ নীলাঞ্জনা ভীষণ কষ্ট হতো, সে কষ্ট অসহ্য। তার থেকে আমি যে তাকে ছুটি দিতে পেরেছি, এটাই আনন্দের। নীলাঞ্জনা বললেন তুমি তার কষ্ট দেখছ, নিজের কষ্টটা দেখছনা? নিজেরটা দেখেছি বলেই তো তারটা এমন উপলব্ধি করতে পারছি। তারপর বললেন, যাকগে নীলাঞ্জনা, ছেড়ে দাও ওসব কথা। বরং বল, কি ভাবে প্রান্তিকের বাবা-মা সেলিনাকে মেনে নিতে পারে। ওবা যে মানবে না এমন কোন ইঙ্গিৎ তো নেই, তবে কেন আগে আগে ভাবতে যাবে। তার থেকে বরং সীতাংশুদাকে আসতে বলি। সেই ভাল, তা হলে তুমি তাই কর নীলাঞ্জনা।
সারারাত নীলাঞ্জনার পাশে এ পাশ ও পাশ করেন মিনতি সেন। নীলাঞ্জনা বলল, মিনতি, কেন মিছেমিছি কষ্ট পাও। সে তোমাকে বুঝাতে পারব না কেন কষ্ট পাই। একটা দুটো বছর নয়। পচিশটা বছর কেটে গেছে। একটা ছোট্ট চিঠি দিয়ে বলেছিলেন, যদি মনে করেন আমরা এক সাথে পথ চলতে পারব, আমি অপেক্ষা করব। এযে কি কষ্ট তোমাকে বুঝাতে পারবনা। দেখ যতদিন ওকে দেখিনি, এমন হয়নি। কাজের ভিতরে ডুবে থেকে নিজেকে ভুলতে চাই, ভুলতে চাই অতীত। কিন্তু ভোলা কি যায়! ওকে দেখে বুঝতে পারছি কি কষ্ট বয়ে চলেছেন। উনি বয়ে চলেছেন আর তুমি বয়ে চলছোনা? জানিনা নীলাঞ্জনা, কিছুই জানি না। তারপর বললেন জান নীলাঞ্জনা কথার পরে কথা বলতে গিয়ে ওকে যখন বললাম, আপনাকে থাকতে যে বলব সে অধিকার কোথায়? উনি বললেন কোন অধিকার কি নেই? কথাটা বলেই কেমন যেন লজ্জিত হয়ে পড়েন, পরে অবশ্য ব্যাখ্যা কবে যদিও বললেন, আসলে আমি সেলিনার কাকা সেটা কি একটা অধিকার নয়? কিন্তু উনি যা বলতে চেয়েছিলেন, এতো তা নয়, তার ভিতরের না বলা কথা, বলতে চেয়েও বলতে না পারার যন্ত্রণায়, চোখ ফেঁটে জল আসতে চাইছিল, বহু কষ্টে সংযত করলাম। সে সময় নিজে যে কি পরিমান দুর্বল হয়ে গিয়েছিলাম তোমাকে কি বলব। কিন্তু বাঁচাল সেলিনা, ও সেই সময় এসে বলল, কাকু তোমার যে দেরি হয়ে যাচ্ছে। নীলাঞ্জনা বললেন, আমি বুঝি মিনতি, তোমাকে একটা কথা বলব? বল তুমি ওকে ফিরিয়ে নিয়ে এস। তা হয়না নীলাঞ্জনা। কেন হয় না? কেন যে হয়না তা তোমাকে বলতে পারবো না, তবে এটা হয় না এটাই সত্যি। তারপরে বললেন ভুলে যাচ্ছ কেন আমি প্রান্তিকের মা। তুমি কি পারবে সেলিনাকে অস্বীকার করে পরিমলবাবুর কাছে ফিরে যেতে? একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নীলাঞ্জনা বলল পরিমলবাবুর সঙ্গে তুমি প্রতীমবাবুর তুলনা করো না, মিনতি, অন্ধকার এবং আলো কখনো এক হতে পারে না। এ তোমার অভিমান। না অভিমান নয়। অভিমানের জন্য চাই বিশ্বাস, অধিকার বোধ, যা তোমাদের আছে, আমার তা নেই। পরিমলবাবু সারা জীবন আমার সঙ্গে অভিনয় করে গেছেন। শুধু তাই নয়, মিথ্যে অজুহাতে আমাকে মাতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করেছেন। চিরকাল ছলনার অভিনয় করে আমাকে ঠকিয়েছেন, আমার জীবনের কোন জায়গায় আজ তার জন্য বিন্দু মাত্র করুণা নেই। হয়তো এ তোমার ভুল, ক্ষণিকের জন্য তিনি যেটা করেছেন, সেটাও তার এক চরম অভিমান। নীলাঞ্জনা বললেন, তোমার কথা যদি সত্যি হতো, আমি তোমারই মত কষ্ট পেতাম, আনন্দ আর গর্বে আমার বুক ফুলে উঠতো। কিন্তু তাতো নয় মিনতি। একদিন খুঁথিকে ঠকিয়ে সে আমার কাছে এসেছিল তার অতীতকে গোপন করে। ও যদি গোপন না করে সত্যি কথাটা বলতো, তার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে না পারলেও তারজন্য একটা করে অনুভূতি আমার থাকতো। তবু ওর কাছে আমি কৃতজ্ঞ, যে কটা দিন ছিল ও আমার কাছে, ওর ভালবাসা পেয়েছি, ওর আদর পেয়েছি, ওর স্বপ্নে নিজেও স্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু তুমি? আমিও যে ওর কাছ থেকে অনেক পেয়েছি,নীলাঞ্জনা, সে যে আমার সাত রাজার ধন। বলতে পার, কে অমন করে জীবনকে তিলেতিলে ক্ষয় করতে পারে একটা মেয়ের জন্যে? তুমিতো জান ওর সঙ্গে আমার কোন ভালবাসার সম্পর্ক ছিল না। আমাদের বিয়ে হতে যাচ্ছিল সম্বন্ধ করে। কিন্তু ভেঙে গেল একটা দুর্ঘটনায়। তারপর তো অনেক ঝড় চলে গেছে জীবনের উপর দিয়ে। একদিন যখন সেই ঝড় থামল, এসেছিলেন উনি। ফিরিয়ে দিয়েছিলাম, বলেছিলাম এ আর হয় না। তার উত্তরে ঐ ছোট্ট চিঠি, ভাবিনি এমনি করে কেউ অপেক্ষা করতে পারেন। কোন ভালবাসার স্মৃতি অনুভূতি এসবের পরশ না পেয়েও যে কোন পুরুষ অপেক্ষা করতে পারেন, ওঁকে না দেখলে আমি জানতেই পারতাম না। ২৫ বছর পরে তোমাদের বাড়ীতে প্রথম দেখে চমকে উঠেছিলাম। বিশ্বাস কর ওকে অনেক কথা জিজ্ঞাসার থাকলেও পালিয়ে বেঁচেছিলাম সেদিন। আর আজতো পালাবারও উপায় ছিল না। আজতো একা পেয়েছিলে তবে জিজ্ঞাসা করলে না কেন? পারলাম না নীলাঞ্জনা, কিছুতেই পারলাম না। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল, ও যেন নীলকণ্ঠ। সমস্ত বিষ একাই হজম করে পৃথিবীকে নির্বিষ করেছেন। তারপর বললেন কি অদ্ভুত এই নারীমন তাইনা? কেন? ও যখন হাত মুখ আঁচিয়ে একটা রুমাল খুঁজছিলেন হাত মুখ মোছর জন্য, ধারে কাছে কোন তোয়ালে না থাকায় ছেলে মানুষের মত মনে হয়েছিল হাতের কাছে যখন। কিছুই নেই আছেতো আমার শাড়ীর আঁচল, ওটা দিয়েতো কাজ সারতে পারেন। তা তুমিতো বলতে পারতে। চেয়েছিল মন, বার বার চেয়েছিল, কিন্তু পারলাম না নীলাঞ্জনা কিছুতেই পারলাম না। ২৫ বছর আগে মনকে যে ভাবে প্রস্তুত রাখা যেতো, আজ আর হাজার চেষ্ঠাতেও তা হয় না। তাইতো ঘরে গিয়ে নতুন ভোয়ালে এনে তার হাতে তুলে দিতে হল। শুধু একটা সান্ত্বনা, যে পাজামা পাঞ্জবি পরে ও গাড়ীতে উঠলো, ওটা কাল হঠাৎই কিনেছিলাম। কেনার পরে মনে হল কেন কিনলাম। আজ মনে হচ্ছে ওটা হয়তো ওঁর জন্যই কিনেছিলাম। আমার এই ক্ষুদ্র স্মৃতি থাকুকনা তার কাছে। কেঁদে ফেললেন মিনতি।
