তারপর চুপচাপ দুজন। যেন কারো কোন কথা নেই। মিঃ চৌধুরী নীরবে এটা ওটা নাড়া চাড়া করছেন, বলতে গেলে প্রায় খাচ্ছেন না কিছুই–মিনতি সেন মিষ্টি নিয়ে এলে প্রতীমবাবু বললেন, আমি মিষ্টি খাইনে। খাননা? তাতে কি হয়েছে, আজ না হয় খেলেন। মেয়ের বাড়ীতে এক টুকরো মিষ্টি না খেলে চলবে কেন? তা যা বলেছেন। আহা দিন। অসুবিধা হলে থাক। মুখে বললেও ২/৩টে মিষ্টি নামিয়ে দিলেন প্রতীমবাবুর খাওয়ার থালায়, প্রতীমবাবু কোন রকম প্রতিবাদ না করে খেয়ে নিলেন।
খাওয়া শেষ হলে মিনতি সেন জল নিয়ে এগিয়ে এলেন। এতীমবাবু বললেন আমি বেসিনে হাত ধুয়ে নিচ্ছি। মিনতি সেন বললেন, বেসিনটা নোংরা আছে, আপনি হাত এগিয়ে দিন আমি জল দিচ্ছি। কিন্তু হাত মুছতে গিয়ে দেখেন পকেটে রুমাল নেই। ধারে কাছে কোন তোয়ালেও নেই সেই বাথরুমে, মিনতি সেন ঘর থেকে একটা নতুন তোয়ালে এনে দিলেন হাত মুছতে।
প্রতীমবাবু বললেন, এবার আমাকে উঠতে হবে মিস্ সেন। আপনাদের মনে হয় খাওয়া হয় নি। তারপর বললেন দেখি আকবরের হোল কিনা। মিনতি সেন বললেন, আপনি যে এসেছেন এটাই কৃতজ্ঞ চিত্তে মনে রাখা উচিত, সেখানে আবার থাকতে বলি কোন অধিকারে।
এমন যে সংযত মানুষ প্রতীমবাবু, তিনি যেন কেমন করে বলে ফেললেন, কোন অধিকার কি নেই? অবাক হয়ে তাকালেন মিনতি সেন। আর প্রতীমবাবু কথাটি বলে ফেলে বড় অসহায় বোধ করতে লাগলেন। তারপর নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে বললেন, অন্য ভাবে নেবেন না মিস সেন, আসলে সেলিনার আমি কাকা, এইটুকু অধিকারতো দাবী করা যেতে পারে। মিনতি সেন যে কি একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন, সেলিনা বলল, কাকু তোমার দেরি হয়ে যাচ্ছেনা? তুমি যে বললে শিয়ালদার একজায়গায় না গেলেই নয়? তা হলে আর দেরি করছ কেন? হ্যাঁ মা, বড্ড দেরি হয়ে গেছে। আমি না গেলে ওদের সব নষ্ট হয়ে যাবে। আজ তা হলে আসি মিস সেন, নমস্কার। নমস্কার, তারপর মিনতি সেন সেলিনাকে বললেন, যাতত মা, ওনাকে একটু গাড়ী পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আয়। নীলাঞ্জনা বলল তুমি যাও মিনতি। সেলিনা বরং এদিকটা একটু দেখুক। অগত্যা মিনতিকেই পায়ে পায়ে এগুতে হয় প্রতীমবাবুর সঙ্গে। গাড়ীতে ওঠেন প্রতীমবাবু। তাকান উভয়ে উভয়ের দিকে। কত কথাই যেন বলার ছিল। কিন্তু কোন কথাই বলা হয় না। প্রতীমবাবু শুধু বল্লেন শরীরের প্রতি যত্ন নেবেন। প্রেসারটা বাড়তে পারে। ওটা চেক করে নেবেন। মিনতি সেন বল্লেন, আবার করে আসবেন? যদি আমার আসাতে অস্বস্তি না হয় তা হলে যেদিন বলবেন সেদিন আসব। আপনার এত কাজ ফেলে পারবেন আসতে? আকবর গাড়ীতে স্টার্ট দিল। প্রতীমবাবুর উত্তরটা শোনা হল না। কিন্তু মিনতি সেন কিছুতেই বুঝতে পারছেনা, যে ঝড় থেমে গিয়েছিল ২৫ বছর আগে, তাই কেন এবং কেমন করে পথভ্রষ্ট হয়ে হঠাৎ মনের মধ্যে ঢুকে পড়ে সব এলোমেলো করে দিল। ধীরে ধীরে মিনতি সেন উঠে এলেন উপরে।
রাত প্রায় ১২টা। জবার মা আবার সবকিছু বন্ধ করে এলেন। আমি সেলিনা নীলাঞ্জনা পিসি ও মিনতি সেন এক সঙ্গে খেয়ে নিলাম। জানিনা কেন এবং কি ভাবে পিসির অভিমান জল হয়ে গেছে।
খাওয়া দাওয়া শেষ হলে, মিনতি সেন বললেন, সেলিনা আজ সারাটা দিন কেমন ঝড়ের মত কেটে গেছে, একটুও বিশ্রাম পাসনি, এবার যা শুয়ে পড়। দেখতে পাচ্ছি সেলিনার দৃষ্টিতে অসহায়তা। কি করবে বুঝতে পারছেনা। আমি নিজেও বুঝতে পারছি না ওর সঙ্গে এক ঘরে আমিও রাত কাটাবো কি না। সেলিনা এগিয়ে গেল। আমি তখনো দাঁড়িয়ে আছি। মিনতি সেন বললেন কিছু বলবি? না তাহলে বসে আছিস কে? ও তোর জন্য কতক্ষণ অপেক্ষা করবে? অগত্যা আমাকেও সেলিনার পিছু পিছু যেতে হয়।
অনেকগুলো ঘর নিয়ে মিনতি সেনের বাড়ী। এ ঘরে আগে কোন দিন ঢুকিনি। সুন্দর করে বিছানা পাতা। বিরাট বিছানায় পাশাপাশি বালিশ। খাটটা ফুল দিয়ে সাজানো। সমস্ত বিছানায় শুধু ফুল আর ফুল। বিরাট খাটের দুই পাশে বড় বড় আয়না। শুলে সমস্ত শরীরটা প্রতিবিম্বিত হয় আয়নার মধ্যে। খাট থেকে একটু দূরে দেওয়ালের সঙ্গে বড় ড্রেসিং আয়না। জামা কাপড় রাখার আলনা তার পাশে। তার থেকে কিছু দূরে আলমারী। মিনতি সেনের রুচি বোধের প্রশংসা না করে উপায় নেই। সেলিনা এগিয়ে এসে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে মেঝেতে বসে পড়ে। আমি বললাম মেঝেতে বসলে যে, ঠান্ডা লাগবেনা। না লাগবেনা সারাটা দিন কি গরমটা গেল। তারতো কোন আঁচ পেলে না। কি করে পাব বল, আজকের দিনটা যেন তোমারই, কেউ যেন আমাকে চেনে না। সেলিনা হাসছে। হাসছো যে, না হেসে কি করি বল, ঘাড় থেকে নামাতে চেয়েছিলে পারলে না, তাই হাসি পাচ্ছে। ওঃ তাই বল, মানে সারা জীবন এই জীবন্ত বোঝা বয়ে চলতে হবে এইতো। তা একবার ঘাড়ে ওঠ, পরীক্ষা করে দেখা যাক ওজনটা কত। সেলিনা বলল ভয় নেই প্রান্তিক। আমার এত বড় বোঝা বইতে পারবে না, তার থেকে যতটা বইলে তোমার কষ্ট হবে না সেই অংকটা করেই ফেল না। করব, কিন্তু তুমি কি সারা দিনের এই ভাবি পোষাক পরে থাকবে নাকি? কেন এগুলো কি তুমি সহ্য করতে পারছনা? আমি বললাম, দেখ, কিছু কিছু জিনিষ আছে তা ক্ষণিকের জন্য সুন্দর। সর্বক্ষনের জন্য নয়। এই ভারি পোষাক আর গয়নার আড়ালে আসল তোমাকে খুঁজে পাওয়া সত্যিই কষ্টকর। তাই যদি মনে হয়। তা হলে এগুলোকে আস্তে আস্তে খুলে দিয়ে তোমার আসল সেলিনাকৈ খুঁজে নাও না। আমি হাসতে হাসতে এগিয়ে এলাম ওর কাছে তারপর ওর আঁচলে যেইনা হাত দিয়েছি সে যেন তেড়ে এসে বলছে এই করছ কি দাঁড়াও। আমি বললাম, আমি যাকে চাই তাকেই তো খজে দেখছি আবরণ ও আভরনের জঙ্গলে। ও বলল, না লক্ষ্মীটি, তুমি যাও, বোস গিয়ে ওখানে। তোমার পরিচিত সেলিনা হয়েই আমি আসছি? তা হলে হার স্বীকার করলে। ও বলল এ হারের স্বাদ যে আলাদা প্রান্তিক, এখানে যে জয়ী হতে চায় তার মত বোকা আর কেউ নেই। লাগোয়া বাথরুমে ঢুকে যায় সেলিনা। আর আমি শুধু প্রতীক্ষার প্রহর গুনি।
