এবার চলুন। নীলাঞ্জনা বললেন, আমার এখানে আপনাকে কে আসতে বলেছে। এসেছি আমি নিজে, তবে সেলিনাকে বলে এসেছি, ও বেচারা জানেই না যে আপনি গিয়েছিলেন।
বেশ চলুন, কিন্তু আমাকে এই রাতেই ফিরে আসতে হবে। তাই হবে নীলাঞ্জনা দেবী। যদি সত্যি ফিরতে পারেন, আমি আপনাকে পৌঁছে দেব।
নীলাঞ্জনাকে নিয়ে প্রতীমবাবু যখন মিনতি সেনের বাড়ীতে পৌঁছালেন, তখন অতিথিরা সব চলে গেছে। শুধু প্রান্তিক, সেলিনা, জবার মা ও মিনতি সেন ছাড়া বাড়ীতে আর কেউ নেই। আর কেউ আসবে না বলে জবার মা মেইন গেটে তালা দিয়ে দিয়েছে এ সময় গাড়ীর হর্ন বার বার বেজে উঠলো। মিনতি সেন নামতে চাইলে আমি বললাম আমি দেখছি। গেট খুলে দিতেই গাড়ী থেকে নামলেন প্রথমে প্রতীমবাবু তারপর নীলাঞ্জনা পিসি। আমি অভিমান করে বললাম, পিসি তুমি এসেও আমার সঙ্গে দেখা না করে চলে গেলে? তারপর প্রতীমবাবুকে বললাম, কাকু আসুন। আকবরকে বললাম, আকবর তুমিও গাড়ীটা লক করে এস।
আকবরকে বাইরের ঘরে বসিয়ে আমি পিসি ও প্রতীমবাবুকে নিয়ে উপরে এলাম। সেলিনা ও মিনতি সেন কথা বলছেন। মিনতি সেন শুয়ে আছেন। আর তার শিয়রের কাছে বসে সেলিনা একথা সেকথা বলে চলেছে। আমি বললাম, মা, কাকু ও পিসি এসেছেন। সেলিনা দৌড়ে এসে নীলাঞ্জনার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বললে, আমি তোমার সঙ্গে কথা বলবো না মা, কিছুতেই কথা বলবো না। কেন তুমি আমার সঙ্গে দেখা না করে চলে গেলে। তুমি ছাড়া কে আছে আমার বল, বলতে বলতে চোখের জলে ভিজিয়ে দিল নীলাঞ্জনার শাড়ীর আঁচল। আর তাতেই সিঁথির সিঁদুর আর কপালোর টিপ এলো মেলো হয়ে গেল। নীলাঞ্জনা বললেন ছাড় আমাকে। কি পাগলামি করছিস। আজতো আমার আনন্দের দিন। আনন্দ না ছাই, তা হলে তুমি চলে গেলে কেন? এভাবে বলিস নে মা, তারপর বললেন কেন যে গেলাম আবার কেন এলাম তাও জানিনা। মিনতি সেন যেন মুহূর্তে সুস্থ হয়ে গেলেন, সেলিনাকে বললেন সেলিনা এবার ছেড়ে দে মাকে। প্রতীমবাবুকে বললেন বসুন মিঃ চৌধুরী। তারপর কাউকে না বলে যাওয়ার জন্য সত্যি রাগ হয়েছিল, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, রাগ হওয়াটা আমার ঠিক হয়নি। কখন খেয়েছেন? খাবেন তো? নীলাঞ্জনা, তুমি দেখনা সেলিনা ওর কাকুকে কি খাওয়াবে? বাঃ আমি কেন দেখব? তুমি কি করবে? আমার কাকু এসেছেন তোমার বাড়ীতে আর তাকে খাওয়াবার দায়িত্ব নেব আমি তা হবে না। তুমি বরং দেখ কি খাওয়াবে, আমি ততক্ষণ আকবরকে দেখছি। লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলেন মিনতি সেন। নারীর লজ্জা সে যেন সব বয়সে এক। নীলাঞ্জনা বললেন, সেলিনা ঠিকই বলেছে মিনতি, তুমি ওকে খেতে দাও। আমি বরং ততক্ষণ সেলিনার সঙ্গে নীচে কথা বলছি।
ওরা আর অপেক্ষা না করে নীচের ঘরে চলে গেল। মিনতি সেন বললেন, আপনি কি এই ভাবেই খাবেন, না পোষাকটা বদলে নেবেন। প্রতীমবাবু বললেন, আপনার যদি অসুবিধা হয় তাহলে বদলাতে হবে, তা না হলে এতে আমার কোন অসুবিধা নেই। এ ভাবেই সবকিছু অভ্যেস হয়ে গেছে। মিনতি সেন বললেন, কিন্তু প্রয়োজনে তো অনেক অভ্যেস বদলাতে হয়। তা হয়, তবে জানেন কি, প্রয়োজনটা এত সামান্য যে বদলাবার দরকার হয় না। এর মধ্যে আমি ভিতরে গিয়ে পায়জামা পাঞ্জবি আর তোয়ালে এনে প্রতীমবাবুর হাতে দিয়ে বললাম, আপনি বরং একটু ফ্রেশ হয়ে নিন কাকু। বেশ তোমরা যখন বলছ তখন দাও। কিন্তু প্রান্তিক, আমার একটু তাড়া আছে। মিনতি সেন বললেন, মেয়ের বাড়ীতে এসে না থেকে চলে যাবেন। রাতটা থেকে গেলে খুব কি অসুবিধা হবে? প্রতীমবাবু তার কোন উত্তর না দিয়ে ওই সব নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলেন, এবং মিনিট ১৫ পরে যখন বেরিয়ে এলেন দেখে মনে হচ্ছে সত্যি যেন ক্লান্তি দূর হয়েছে। জবার মা এসে সংবাদ দিল, দাদাবাবু, বৌদিমনি নিচেই ডাকছেন আপনাকে। আসছি বলে, চলে এলাম আমি।
জীবনে এই প্রথম মুখোমুখি মিনতি সেন ও প্রতীম চৌধুরী। মিনতি সেন বুললেন, কিছুই খাচ্ছেন না যে। বেশী খেতে পারি না মিস সেন, তা ছাড়া নীলাঞ্জনা দেবী জোর করে খাইয়ে দিলেন। তা হলে দরকার নেই, শরীর খারাপ করতে পারে। আমার শরীর খারাপ করে না। ঈশ্বর বোধহয় ওটা দিতে আমাকে ভুলে গেছেন। তা আপনি এখন সুস্থ তো। জানেন মিস সেন, আপনি যখন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন, আমার খুব খারাপ লাগছিল। কেন? কেন আবার কি? সবাই দেখলেন সেলিনার জন্য আনা আমার উপহার গুলো যেন আপনি অনিচ্ছায় গ্রহণ করছেন। নিজের ছেলের বৌয়ের জন্য আনা উপহার কি কেউ অনিচ্ছায় গ্রহণ করতে পারে? আসলে যখন জানলাম, নীলাঞ্জনা সেলিনার জন্য আনা উপহার আপনার হাতে দিয়ে কাউকে কিছু না বলে চলে গেছে, তখন থেকেই ভীষণ হতাশ লাগছিল। ওটা ছিল তারই প্রভাব। এজন্য আপনি অন্য কিছু মনে করবেন না। না না মনে করার কিছু নেই, আমাকে যে আপনারা গ্রহণ করেছেন এটাই বড় কথা। তারপর মিনতি সেনকে বাধা দিয়ে বললেন না না আর দেবেন না। মিনতি সেন বললেন, কিন্তু এটা যে আপনার মেয়ের রান্না। ও যদি দুঃখ পায়। ওতো মেয়ে, দুঃখ পেলে পাবে। কিন্তু আপনি পাবেন না তো।
একি হল মিনতি সেনর? ২৫ বছর আগের ঘটনা গুলো কেন এক এক করে ভেসে উঠছে। চোখের সামনে ঠিক ছবির পর্দার মতো। প্রতীমবাবু বললেন, কি হল মিস সেন, অমন কাঁপছেন কেন? শরীর খারাপ লাগছে? নিজেকে সংযত করে বললেন, না না। কোন অসুবিধা নেই। আপনি খান, আর যদি খেতে ইচ্ছে না করে তা হলে একদিকে সরিয়ে রাখুন। দুঃখ পেলেন? আজ কাল আর দুঃখ পাইনা মিঃ চৌধুরী। সেই ভাল, দুঃখ একটা বিলাসিতা মাত্র। বিলাসিতা যত বর্জন করা যায় ততই মঙ্গল। আপনি বোধ হয় সম্পূর্ণ ভাবে বর্জন করতে পেরেছেন? জানিনা, তবে চেষ্টার ত্রুটি করিনি। আমাকে শিখিয়ে দিতে পারেন কি ভাবে দুঃখকে বর্জন করতে হয়। প্রতীমবাবু বলেন, এতো অতি সোজা ব্যাপার মিস সেন, কাজের মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত করুন। শুধু কাজ আর কাজ। দেখবেন দুঃখকে ভাববার সময়ই পাচ্ছেন না। মিনতি সেন বললেন চেষ্টা করব।
