সেলিনার নির্দেশে মুহূর্তে হল ঘরটাকে ক্যাটারিং এর লোকেরা খাওয়ার জন্য প্রস্তুত করে ফেলে। প্রত্যেককে হাত জোড় করে সেলিনা বলে, আপনারা যদি বসে যান তাহলে খুব ভাল হয়। প্রতীমবাবুকে বলল, তুমি বসবে না? না এখন না। তারপর বললেন তোমার সঙ্গে একটু কথা আছে সেলিনা, আসবে এদিকে? সেলিনা এক পাশে এগিয়ে গেলে প্রতীমবাবু বললেন, তোমার মা এসেছিলেন, এই উপহারগুলো আমার হাতে তুলে দিয়ে বলে গেলেন, আমি যেন এগুলো তোমার হাতে তুলে দিয়ে বলি, তোর মা তোকে বুক ভরে আশীর্বাদ করেছেন। আমি অনেকবার বলেছি, তবু তিনি তোমাদের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন না। আমি যাচ্ছি ওখানে, যে ভাবে তোক ধরে নিয়ে আসব। কোন দুশ্চিন্তায় আজকে অতিথি আপ্যায়নে যেন কোন ক্রটি না হয়। সেলিনা বলল প্রান্তিক জানে?না কেবল ওর মা জানেন। হয়তো এটা তার বুকে খুব বেজেছে। আমাকে যখন কাকু বলে ডেকেছে মা। আমি থাকবো। তোমার পাশে কোন ভয় নেই। কিন্তু আমাকে থেকে যেতে বলবে না। যে ভাবেই হোক আমাকে চলে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করে দিও। তাই দেব। কোন অস্বস্তিতে তুমি পড় তা আমি চাইবনা। কিন্তু কাকু মা না আসা পর্যন্ত মনটা কাটার খোঁচার মত ক্ষতবিক্ষত হতে থাকবে, তুমি যে ভাবে পার তাকে নিয়ে এস। হ্যাঁ তাই হবে। আমি চলে যাচ্ছি। উনি চলে গেলেন। একবার হল ঘরে এসে সেলিনা দেখলে সব ঠিক ঠাক মত আছে কিনা। তারপর এল মিনতি সেনের কাছে, সেলিনাকে দেখে জবার মা উঠে দাঁড়াল, বলল, বৌদিমনি, তুমি একটু বোস না দিদিমনির কাছে। দাদাবাবুকে বলুন না ডাক্তার ডাকতে। আমি দেখছি। তুমি যাও।
সেলিনা মিনতি সেনের মাথার কাছে বসে ডাকলো মা, চোখ মেলে তাকালেন মিনতি সেন। তারপর বললেন তুমি এখানে, যাদের বলেছি তাদের কি হবে? কোন চিন্তা নেই মা, সব ব্যবস্থা আমি করেছি, তা ছাড়া দাদু ভাই আছেন, তোমার সম্মান রক্ষার্থে, তিনি যা করার করবেন। কে? কাকু যাননি? তুমিতো অবাক করলে মা। আজকের দিনে উনি যাবেন কি করে? তুমি ঠাট্টাও বোঝনা? তাই যেন হয়। ওটা যেন ঠাট্টাই হয়। সেলিনা বলল, মা এসে চলে গেছে? তোকে কে বলল? যেই বলুক, তুমিতো আমায় বললেনা উল্টে চিন্তা করে করে শরীরের এই অবস্থা বানালে। কি করব বল, কি করে বলি তোর মা এসেও তোকে না দেখে চলে গেছে। কেমন ভাবে নিবি? যে ভাবেই নিইনা কেন? কথাটাতো সত্যি। আর উনি যদি এত জেদী হতে পারেন তবে আমার জেদী হতে আপত্তি কোথায়? নারে ওভাবে কথা বলতে নেই। ওর মনে যে আঘাত লেগেছে তা কি তুই বুঝবি না। খুব ভাল কথা মা, কিন্তু উনি যে ভাবে চলে গেলেন তাতে তোমার মনে আঘাত লাগবেনা। তাছাড়া আমিতো জানি তোমার মনে এমনিতেই ঝড় চলছে। কিসের ঝড়। আজ থাক মা। আর একদিন বলব। বরং চল অতিথিদের ওখানে। ওদর সঙ্গে কথা বল, দেখবে আস্তে আস্তে সব কিছু শান্ত হয়ে গেছে। এরপর মিনতি সেন জানতে চাইলেন তোর কাকু চলে গেছেন? আমাকে বলে গেছেন, কি একটা জরুরী কাজ আছে, সেরেই আসবেন। কিন্তু মা, যত বড় অফিসারই হোক উনিতো আর বাব ভাবুনন, তবে ওনার সঙ্গে কথা বলতে গেলে তোমাকে এত আড়ষ্ট লাগে কেন? এর আগে মায়ের ওখানেও দেখেছি তুমি প্রায় এড়িয়েই চললে ওনাকে। আজও ওনার কাছ থেকে উপহার গুলো নিতে তুমি কেমন কেঁপে উঠলে। কেন এরকম কর? তোমার সঙ্গে কি আগে ওনার পরিচয় ছিল? মিনতি সেন কি উত্তর দেবেন এর? বললেন। প্রান্তিক তোকে কিছু বলেনি? কি ব্যাপারে। তোর কাকুর সম্পর্কে। না তো। তা হলে তোর আর জেনে লাভ নেই। না মা আমাকে জানতেই হবে। কেন এত জোর করছিস। কাকুকে আমার ভীষণ ভালো লাগে, তুমি এমন করলে তো উনি আসতে চাইবেন না। নাই বা এলেন, তোরা যাবি ওনার কাছে। আমারা যাব আর উনি আসবেন না, একি আমাদের ভাল লাগবে? থাক তোর কাকুর কথা এখন, বরং চল, দেখি ওদের খাওয়া কতদূর হল।
নীলাঞ্জনা কিছুতেই আসবেন না। বললেন না প্রতীমবাবু, কত আশা ছিল ওকে আমি মনের মত সাজিয়ে বাসরে পাঠাবো। নিজের গর্ভে তো কেউ এলো না। তাই আমার মাতৃহৃদয় উজাড় করে দিয়েছিলাম ওকে। ওকে যেদিন প্রথম দেখেছিলাম, প্রান্তিকের অসুখের সময়, মাত্র কয়েক মিনিটেই আপন করে নিল আমাকে। পরে রেহানাকেও দেখলাম। এমন মিষ্টি মেয়ে আর হয় না। দুই বোনের মধ্যে চিন্তা ভাবনায় আকাশ পাতাল তফাৎ। কিন্তু প্রথম দিন থেকে আমার মনে হয়েছে, রেহানা নয় সেলিনাই বেশী ভালবাসে প্রান্তিককে। কিন্তু বিশ্বাস করুন প্রতীমবাবু প্রান্তিকের কোন সাড়া না পেয়ে আমি এ ব্যাপারে চুপচাপ ছিলাম। তাছাড়া যেহেতু প্রান্তিক রেহানাকে ভালবাসে বলে, মনকে সেই ভাবে প্রস্তুত করি। এরপরে তো রেহানা চলে যায়। কোথায় যে গেছে আজ জানিনা। রেহানা থাকতে সেলিনা যা পারেনি, ওর অবর্তমানে কিন্তু ও ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় ওর দিকে। আমার সমর্থন ছিল। মনে প্রানে চাইছিলাম, রেহানা যদি ফিরে না আসে, তাহলে যেন সেলিনাকেই গ্রহণ করে প্রান্তিক। যদিও প্রান্তিককে আমি এসব কথা কোন দিন বলিনি, সেলিনাকেও নয়। আজ যখন আমার স্বপ্নই বাস্তবায়িত হলো। অথচ আমি জানলাম না, কেমন করে মেনে নেবো বলুন। প্রতীমবাবু বলেন আপনার জায়গায় আমি থাকলে হয়তো আমিও তাই ভাবতাম। কিন্তু নীলাঞ্জনা দেবী পৃথিবীতে কাউকে না কাউকে হয়তো আঘাত সইতে হয়। তা না হলে জীবনের সুন্দর ও মধুর মুহূর্তগুলো ধ্বংস হয়ে যায়, আপনি বোধ হয় জানেন না, আপনার ওই ভাবে চলে আসায় মিনতি দেবী ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, একা ঐ বাচ্চা মেয়ে অতিথিদের সামলাবে কি করে। আর যদি কোন ভাবে সামলানোও যায় অসুস্থ মানুষকে নিয়ে কি করবে ও? তার থেকে চলুন। এ সময় আপনার ওনাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো একান্ত প্রয়োজন বলে মনে করি।
