খুব দামী শাড়ী পরেছে সেলিনা। মিনতি সেন তার সমস্ত মূল্যবান গয়না দিয়ে সাজিয়েছেন ওকে। হাতে এয়োতির চিহ্ন নোয়া যেমন আছে তেমনি আছে আরো অসংখ্য অলংকার। সিঁথির সিঁদুর ভোরের সূর্যের মত উজ্জ্বল। বেনীতে জড়িয়েছে বেল ও যুইয়ের মালা। উজ্জ্বল তিনটি লাল গোলাপ একেবারে উৎস মূলে। আমি পরেছি মূল্যবান পাজামা পাঞ্জবি। মিনতি সেনের বিরাট হল ঘরে আরো অনেকের সঙ্গে আমরা গল্পে মেতে আছি। শান্তার সঙ্গে খুব অল্প সময়ে মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে যায় সেলিনার। এত লোককে যে বলেছেন মিনতি সেন ভাবতে পারিনি। শুধু অভাব বোধ করছিলাম, অশ্রুকণা ও তপতীর। পিসিতো আসবেই জানা কথা।
আরেকটা ব্যাপারে মনটা বিষণ্ণতায় ভরে উঠেছে তাহলে আমার বাবা-মা। জানিনা তারা কেমন ভাবে নেবেন আমাকে। ভাগ্যের চাকা এমন ভাবে ঘুরে গেছে যে, আমি যেন আর ওদেব ছেলে নই। ওদের চিন্তা ভাবনার সঙ্গে আমার আকাশ পাতাল তফাৎ হয়ে গেছে। তবু বিশ্বাস আছে–গ্রামের সমাজ আমাদের গ্রহণ করতে না পারার জন্য বাবা মাও হয়তো চোখের জল ফেলবেন সমাজকে অস্বীকার করতে না পারার জন্য। তবু তাদের আশীর্বাদ থেকে হয়তো বা বঞ্চিত হবে না।
কমিশনার সাহেব এসে দাঁড়ালেন সামনে। আমি ও সেলিনা প্রণাম করলে, কমিশনার সাহেব তাকে আশীর্বাদ করে মিনতি সেনকে ডেকে বললেন, মিনু তোর বৌমাকে দেখে এত লোভ হচ্ছে যে, মনে হচ্ছে এখনি হাইজ্যাক করে নিয়ে চলে যাই। সকলে হেসে উঠলেন। সেলিনা বলল, কোন দরকার নেই, যখনি দরকার হবে, আমি নিজেই চলে যাবো। হাইজ্যাকের ঝামেলা পোয়াবেন কেন? আবারও সবাই হেসে উঠলো। কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি, অবাক হয়ে কমিশনার সাহেব তাকিয়ে আছেন সেলিনার দিকে। তার ঠাট্টার যে এমন একটা জবরদস্ত উত্তর হতে পারে, বোধ হয় তিনি তা ভাবতেও পারেননি। কিন্তু উনিতো শুধু মিনতি সেনের কাকা নন, তিনি জবরদস্ত পুলিশ কমিশনার, জবাবেরও একটা জবাব দেওয়া দরকার। বললেন তা তুমি পারবে দিদি ভাই, কারণ হাইজ্যাক তোমার রক্তে মিশে আছে। ঠাট্টার সঙ্গে নিলে কথাটাকে ঠাট্টা হিসাবেই গ্রহণ করা যায়। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত অর্থ গ্রহণ করতে গেলে অপমান বাজতেই পারে বুকে, তাই সেলিনাও হেরে যেতে রাজী নয়, বলল, তা আপনি এক অর্থে ঠিকই বলেছেন, যে রক্তকে আপনি এত গৌরাবান্বিত করতে চেয়েছেনে, আমিতো সেই রক্তেরই উত্তরাধিকার। চুপ হয়ে গেলেন কমিশনার সাহেব। অন্যেরা জবাবের জন্য মনে মনে খুশী হলেও বাইরে কিছু প্রকাশ করলেন না। কমিশনার সাহেব বললেন তোমার চাতুর্যকে প্রশংসা না করে উপায় নেই, কিন্তু দিদি ভাই আমাকে যে যেতে হবে। যাবেন, আপনিতো আমার অতিথি নন, মায়ের অতিথি তিনিই বুঝবেন আপনি যাবেন কি থাকবেন। এ জবাবও আশা করেননি কমিশনার সাহেব। শুধু একটু হাসলেন তারপর মিনু মিনু করে চিৎকার করতে করতে বাইরে চলে এলেন।
এতক্ষণে প্রতীমবাবু এগিয়ে এলেন, সেলিনা ওকে দেখতে পেয়ে একবোরে দৌড়ে ওর কাছে এসে বলল, কাকু তুমি কখন এলে? আজ কিন্তু থেকে যেতে হবে কোন অজুহাত কিন্তু শুনবো না। প্রতীমবাবু অবাক হয়ে যান মেয়েটির মুহূর্তের উত্তরণে। ঠিক আছে দেখব। তার আগে একবার ঠিক করে দাঁড়াও তো, তারপর প্রান্তিককে বললেন, প্রান্তিক তোমার মাকে ডাকো। প্রান্তিক বেরিয়ে গিয়ে মিনতি সেনকে ডেকে নিয়ে এল। তখনো পর্যন্ত কমিশনার সাহেব যাননি বলে, তাকেও জোর করে ভিতরে নিয়ে এলেন। মিনতি সেন কাছে এসে দাঁড়ালে এক গাদা উপহারের বাক্স তার পায়ের কাছে রেখে প্রতীমবাবু বললেন, সেলিনার জন্য এনেছিলাম, গ্রহণ করলে নিজেকে ধন্য মনে করব। মিনতি সেন বললেন, আপনি এনেছেন, ওকেই আপনি দিয়ে দিন। আমাকে বলছেন কেন? ওরা যদি আমার বাড়ীতে কখনো যায়, আমি নিশ্চয়ই আপনাদের অনুরোধ করবো না। আপনি প্রান্তিকের মা হতভাগ্য মেয়েটিকে আপনি যে মেনে নিয়েছেন এতে যে আমার কি আনন্দ হচ্ছে তা বলতে পারবো না। তাই কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ওটা আমি আপনার মাধ্যমে তুলে দিতে চাই।
দেখতে পাচ্ছি, মিনতি সেন কাঁপছে। কত বছরের স্মৃতি বুকে নিয়ে পথ চলা। আজ তারা মুখোমুখি। ভিতরটা কি ভেঙে যাচ্ছে না? অবশ্যই যাচ্ছে, তাই হয়তো মিনতি সেন পালিয়ে যেতে চাইছেন। কোন ভাবে উপহারের বাক্সগুলি একে একে সেলিনাকে দিয়ে প্রতীমবাবুকে বললেন, আপনি খুশীতো। শুধু খুশী নই ভীষণ আনন্দিত। আপনার জন্য আমার গভীর শ্রদ্ধা রইল। মিনতি সেন আমারও বলে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে তাল সামলাতে না পেরে প্রায় পড়ে যাচ্ছিলেন, এগিয়ে এস মিনতি সেনকে ধরে ফেললাম। বললাম, তোমার শরীর খারাপ মা। না, আমি ভাল আছি। তুই দেখতে প্রান্তিক জবার মা কোথায় গেল। যাদের আসতে বলেছিলাম তারা মনে হয় সবাই এসে গেছেন। এদের তো কিছু খাওয়ার বন্দোবস্তও করতে হবে। এই সময় আমি জানতে চাইলাম পিসি আসেননি? মিনতি সেন কোন উত্তর না দিয়ে আস্তে আস্তে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন। কি হয়েছে মার অমন করছেন কেন? আমি ঠিক জানিনা, তুমি দেখনা কি হয়েছে। তারপর জবার মাকে ডেকে আনতে বেরিয়ে গেলাম। এবার সেলিনা কমিশনার সাহেবে কে বললেন, এখন কিন্তু দাদু আপনি আমার অতিথি। মানে? বা মা অসুস্থ, অতিথি আপ্যায়নের দায়িত্বতো আমার। তাই বলছি, একদম চলে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না, তা হলে হয়তো উল্টো ভাবে হাইজ্যাক হয়ে যেতে হতে পারে। হাসছে সেলিনা, খারাপ হয় না দিদিভাই এই বৃদ্ধ বয়সে হাইজ্যাক হতে, বললেন কমিশনার সাহেব। তারপর অনুরোধ করে বললেন, কিন্তু দিদি ভাই সত্যি দেরি হয়ে যাবে। তোমার আপ্যায়নটা যদি একটু তাড়াতাড়ি কর ভাল হয়। এই করি দাদু।
