প্রতীমবাবু বললেন নমস্কার নীলাঞ্জনা দেবী, কেমন আছেন? ভাল আছি। নমস্কার। তারপর বললেন আমি কিন্তু ভাবতেই পারিনি আমাকে আপনি চিনতে পারবেন। তা হয়তো ঠিক। তবে আমার স্মৃতি শক্তি খুব একটা প্রখর নয়তো। তাই চিনেও না চেনার ভান করতে পারি না। অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পারেন নীলাঞ্জনা। বলেন, যারা চিনেও না চেনার ভান করেন হয়তো তার কোন গূঢ় অর্থ থাকতে পারে। আমাকে কিন্তু দয়া করে সেই দলে ফেলবেন না। না ফেলতে পারলে ভালো হয় কিন্তু কখন যে কোন দলে ভীড়ে যাবেন কে জানে? আর একটা কথা, আমার আসাতে যদি কোন অস্বস্তি হয়, তা হলে দয়া করে প্রান্তিক বা সেলিনাকে একটু ডেকে দিন না। আমি ওদের সঙ্গে কথা বলেই চলে যাব। নীলাঞ্জনা বললেন অস্বস্তি হওয়া বা কারও তো কিছু মনে করার নেই প্রতীমবাবু। বরং অনেক লজ্জার হাত থেকে আপনি যেমন বাঁচিয়েছেন তেমনি অনেক অপ্রস্তুত হওয়ার হাত থেকেও রক্ষা করেছেন, আর সেই আপনি গাড়ীতে বসে থেকে এদের সঙ্গে কথা বলে চলে যাবেন তা হয় নাকি? না ঠিক তা নয়। আসলে সেলিনার করুণ মুখের কথা মনে করে আমি না এসে পারলাম না। তারপর বললেন দেখেছেন ওকে নববধুর বেশে? কি অপূর্ব মানিয়েছে ওকে? অবাক হয়ে নীলাঞ্জনা বলে মানে? কি বলতে চাইছেন আপনি। সেলিনা নববধু এসব কি বলছেন আপনি? প্রতীমবাবু বললেন আপনি এখনো দেখেন নি ওদের? না এখনো দেখা হয়ে ওঠেনি। তাছাড়া প্রান্তিক বা অশ্রুকণা এদেরতো নতুন ভাবে দেখার কিছু নেই। নীলাঞ্জনা ও প্রতীমবাবু হাঁটতে হাঁটতে নীচের বসার ঘর পর্যন্ত এলেন। তারপর প্রতীমবাবু বললেন, দাঁড়ান নীলাঞ্জনা দেবী, মনে হচ্ছে আপনি কিছুই জানেন না। না জানার তো কিছু নেই। তাহলে অশ্রুকণার কথা উঠছে কেন? যতদুর জানি, অকশা এখানে আসেই নি। আসেনি মানে? তাহলে প্রান্তিক কাকে বিয়ে করেছে। সেই জন্যইতো বলেছিলাম নববধুর অপূর্ব সাজে দেখেছেন সেলিনাকে? মানে প্রান্তিক সেলিনাকে বিয়ে করেছে? প্রতীমাবু বললেন, ঘটনা চক্রে যা ঘটে গেছে তাকে ঠিক বিয়ে বলা যায় না, বলা যেতে পারে মুহূর্তের অভিনয়। কিন্তু অভিনয় ওতো কারো কারো জীবনে সত্য হয়। ওদের জীবনেও তাই হয়েছে। সেলিনাতো আপনার মেয়ে, একবার দেখবেন না নববধূর সাজ তার পূর্ণ হল কি না। নীলাঞ্জনার তখন নিজের কাছে নিজেকে এত অপমানিত লাগে যে, বললেন কোন দরকার নেই প্রতীমবাবু। আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। হঠাৎ কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কথা আসছে কেন? আসছে এই জন্য যে আমি ব্যাপারটা জানিনা। আর আপনি তা জানিয়েছেন বলে। তারপর অশ্রুর জন্য যে উপহার এনেছিলেন। তাই প্রতীমবাবুর হাতে দিয়ে বললেন। আমার একটা অনুরোধ রাখবেন প্রতীমবাবু? বলুন। ওটা ওর হাতে দিয়ে বলবেন ওর মা ওকে বুক ভরে আর্শীবাদ করেছেন, তবু আমি থাকতে পারছি না। কেমন যেন ভয় পেয়ে গেলেন প্রতীমবাবু। বললেন নীলাঞ্জনা দেবী। নীলাঞ্জনা বললেন অনেক বিশ্বাস নিয়ে এটা আপনার হাতে দিয়ে যাচ্ছি। আর যদি সম্ভব হয় কাল একবার আসবেন, আপনাকে আমার একটা ইচ্ছের কথা জানিয়ে যাবো।
নীলাঞ্জনা ও প্রতীমবাবুর দেরি দেখে মিনতি সেন এদিকেই আসছিলেন, হঠাৎ প্রতীমবাবুকে ওই ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন, এলেনই যদি তাহলে এখানে দাঁড়িয়ে কেন? উপরে যাবেন না? হ্যাঁ যাবে। তা আপনি কেমন আছেন মিনতি দেবী। ভালো, আপনি ভালো আছেন তো? হা নিশ্চয়ই ভাল আছি, আর ভাল না থেকে কোন উপায়ও নেই মিনতি দেবী। এই দেখুননা কি কথা বলতেই, নীলাঞ্জনা দেবী তার সমস্ত উপহার আমার হাতে দিয়ে বললেন, এগুলো যেন আমি সেলিনাকে দিয়ে বলি তার মায়ের বুক ভরা আশীর্বাদ রইল এর সাথে। তারপর চলে গেলেন। অনেক করে বোঝাতে চাইলাম, কিন্তু চলেই গেলেন নীলাঞ্জনা দেবী। সুতরাং বলতেই হবে ভাল আছি। এবার চলুন একবার উপরে যাওয়া যাক। চলুন। মিনতি সেন ওনাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলেন, যে ঘরে আছে, সেলিনা ও প্রান্তিক।
দেখতে দেখতে দলবল নিয়ে হৈ হৈ করে এলেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার সাহেব। সামনে প্রতীমবাবুকে দেখে বললেন আপনি? মিনতি সেন বললেন উনি প্রতীম চৌধুরী, প্রান্তিকের কাকা। আজকের দিনে আমাদের বিশেষ অতিথি, আপনি কথা বলুন কাকু, আমি আসছি। কমিশনার সাহেবের গলা পেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন ব্যরিষ্টার ভট্টচার্জ সাহেব। কমিশনার সাহেবের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময়ের পরে জিজ্ঞাসা করলেন আপনি মি: চৌধুরী কখন এলেন? এই সবে মাত্র। কমিশনার সাহেব জানতে চাইলেন ভট্টাচার্জ সাহেব আপনি চেনেন নাকি একে। চিনি বৈকি, উকিল মানুষ। মক্কেলকে হাত ছাড়া করতে নেই। তারপর একটু হেসে বললেন, আপনিও চেনেন, তবে পুলিশি কর্ম ব্যস্ততায় ভুলে গেছেন এই যা। তবু। বললেন কমিশনার সাহেব। ব্যরিষ্টার ভট্টাচার্জ বললেন, উনি সুর এত সুর কোম্পানীর জেনারেল ম্যানেজার প্রতীম চৌধুরী। কমিশনার সাহেবের যেন হঠাৎ সব মনে পড়ে গেছে, বললেন হ্যাঁ হ্যাঁ, কয়েক দিন ধরেতো কাগজে নামও দেখেছি। শিলোয়নের সঙ্গে সমাজেরও যাতে উন্নতি হয় তার জন্য ওর অক্লান্ত চেষ্টার কথা। কয়েকদিন ধরে কাগজে বেরিয়েছে কিন্তু আপনার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সময় হয়ে ওঠে নি। একটু চিন্তা করে বললেন মনে হচ্ছে কোথায় যেন আপনাকে দেখেছি। অনেকটা চেনা চেনা মনে হচ্ছে। ভট্টাচার্জ সাহেব বললেন, তা অনেক সময় হয়। হঠাৎ হঠাৎ কিছুতেই মনে করা যায় না, তারপর আবার সব মনে পড়ে যায়। তাই বলছিলাম এখন আর ও সব ভেবে লাভ নেই। যখন মনে পড়বে, তখন দেখা যাবে। এখন চলুন ওপরে। আচ্ছা তাই চলুন বললেন কমিশনার সাহেব। আজ বিয়েও নয়, ফুলশয্যাও নয় তবু কেন মিনতি সেন আমাদের উপরের ঘরে প্রায় বন্দী করে রেখেছেন কে জানে?
