ঢাকুরিয়ার বাড়ীতে আমরা যখন পোঁছালাম তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেলে। জবার মা বলল কি সুন্দর মানিয়েছে বৌদিমনি তোমাকে? সেলিনা লজ্জা পেল এবং জবার মায়ের উত্তরে শুধু হাসল। মিনতি সেন নীলাঞ্জনার অফিসে ফোন করে বললেন নীলাঞ্জনা তুমি অফিস ফেরৎ আমাদের এখানে অবশ্য এস। নীলাঞ্জনা বলল, এত তাড়া কিসের? ছেলে এসেছে নাকি? মিনতি সেন বললেন শুধু ছেলে নয় ছেলের রৌও এসেছে। আসতে ভুল করোনা কিন্তু। অবাক হয়ে নীলাঞ্জনা বললেন, বৌ মানে কে? অশ্রু? এসেই দেখনা কে? কাকে বৌ হলে তোমার সুবিধা হয়। দেখ ছেলে তোমার, কাকে বৌ করবে সে তোমার ব্যাপার, আমার মেয়েটি এসেছে কি না তাই বল। এইতো মাত্র কদিন, তবু মনে হচ্ছে কতযুগ যেন দেখিনা ওকে? ওকি এসেছে? দাও না ওকে? মিনতি সেন বলল, দিচ্ছি ভাই দিচ্ছি, বলে হাক ছাড়লেন, সেলিনা তোর মা ডাকছে, যাই মা বলে এগিয়ে এসে ফোন ধরল সেলিনা। বলল, মা আমি সেলিনা বলছি। তবু ভালো, ফিরে এসেছিস আমিতো ভাবলাম, কোন বনে জঙ্গলে গেছিস বাঘের পেটে গেছিস কি না কে জানে? বাঘের পেটে কেন যাবো মা। ওখানেতো অশ্ৰুদি ছিল। নীলাঞ্জনা বললেন হ্যারে, শেষ পর্যন্ত প্রান্তিক অশ্রুকেই বিয়ে করল। একবার আমার কথা মনে করলনা। আমি কি বাধা দিতাম? সেলিনা বলল, অশ্ৰুদি তো থেমে গিয়ে আবার বলল, প্রান্তিক কাকে বিয়ে করে ঘরে আনবে সেতো তার ব্যাপার, তুমি আসছো তো! নীলাঞ্জনা বললেন প্রান্তিক তাহলে শেষ পর্যন্ত অশ্রুকেই বিয়ে করল। কণ্ঠে তার অভিমান। সেলিনা বলল, যাকে তার ভাল লেগেছে তাকেই সে বিয়ে করেছে। এতে তোমার আমার কি বলার আছে। তা ঠিক, তারপর বললেন, অশ্রুকে বধূর সাজে খুব সুন্দর মানিয়েছে তাইনা। তুমি এলেই দেখতে পাবে কেমন মানিয়েছে। নীলাঞ্জনা বললেন আমি না হয় পিসি আমাকে বলার দরকার মনে করেনি। তাই বলে মিনতি মানে ওর মাকেও বলল না। অশ্রুর বাবা-মা গিয়ে ছিলেন? মিটি মিটি হাসছে সেলিনা। বলল, তুমি কি সব সংবাদ ফোনেই নেবে নাকি? এসেই যা জানার, জেনে নাও না। নীলাঞ্জনা তবু আরো বললেন, তোর খুব মন খারাপ তাই না? আর তোকে না হয় ও নাই বা মেনে নিল, তাই বলে রেহানার কথা একবারও ভাবলনা। হয়তো ভেবেছিল, তারপর বলল, ওকে ডেকে দেবো? একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, না দরকার নেই। তাহলে তুমি আসছো তো? তুই চলে আয় তারপর এক সঙ্গে না হয় যাবো। সেলিনা বলল, পুরানো হলেও নতুন বৌ তো। তুমি নতুন বৌকে কিছু দেবেনা? দিতে তো হবেই। তুই বলনা, কি দেওয়া যায়। আমার মনে হয় একগুচ্ছ ফুল দিলে সব থেকে ভালো হয়। তাই হয় নাকি? হাজার হোক, প্রান্তিকততা আমার ছেলের মতন। নারে তা হয় না। তবে কি দেবে? সেই জন্যই তো তোকে আসতে বলছি। তাহলে তোমার ভাইপোকেও নিয়ে আসি কি বল? তা কি করে হবে মা, নতুন বৌকে ছেড়ে ও একা আসবে কি করে? নারে ও পাগলামি করিসনে। তার থেকে আমিই আসছি। কখন আসবে? কতদিন তোমাকে দেখিনা, ভীষণ তোমায় দেখতে ইচ্ছে করছে মা। মনে হচ্ছে এখনই ছুটে যাই তোমার কাছে, ক্ষমা চাই আমার অন্যায়ের। আর তোর অন্যায়। তুই আবার কি অন্যায় করলি? অন্যায় যদি কেউ করে থাকে সে প্রান্তিক করেছে। এখনতো মিনতিই ওর সব। আমি কে? আমার দুঃখ ব্যথায় ওর কি যায় আসে? ও কিন্তু তা বলেনা মা। বলছিল তুমি যা করেছে ওর জন্য পৃথিবীতে কেউ নাকি তা করেনি। বানিয়ে বলছিসনা তো। ওর হয়ে বানিয়ে বলতে যাবো কেন? যা ও বলেছে তাই বললাম। তাই যদি হতো, তা হলে ও মিনতির ওখানে না উঠে আমার কাছেই আসতো। আমিতো মিনতির কাছে শোনামাত্র ভেবেছিলাম ওর সঙ্গে আর কথাই বলব না। তা হারে তুই ভাল ছিলিতো। হ্যাঁ মা ভীষণ ভালো ছিলাম। অশ্ৰুদি ভীষণ যত্ন করেছে আমাদের। এতকথা ফোনে হয় না, তুমি এসো না? বেশ আমি আসবো। নতুন বৌকে যা হোক একটা কিছু দিতে তো হবে। দিয়েই চলে আসবো। তুইও কিন্তু চলে আসবি। তোকে আমি আর ওখানে থাকতে দেব না। বেশ তাই হবে, আগে তুমি এসোতো।
সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে এলে নীলাঞ্জনা এলেন। গাড়ী করেই এলেন। সেলিনাকে নিয়ে যাবেন, তাই গাড়ী নিয়ে আসা। ইদানীং বেশ কিছুদিন হলো অফিস থেকে গাড়ী পেয়েছেন নীলাঞ্জনা। তবে সাধারণত অফিসের কাজের বাইরে গাড়ী বাবহার করেন না উনি। সুন্দর ফুলের বাস্কেট, আর দামী সোনার হার নতুন বৌকে দেবেন বলে নিয়ে এসেছেন নীলাঞ্জনা। গাড়ীর হর্ণের শব্দে মিনতি সেন বেরিয়ে এসে দেখেন নীলাঞ্জনা। আরে তুমি? হ্যাঁ এলাম। তা বাড়ীতে একটা উৎসব উৎসব মনে হচ্ছে। আর কাউকে বলেছে নাকি? কয়েকজনকে বলেছি নীলাঞ্জনা। যারা আমার সুখ দুঃখের সঙ্গে সব সময় থাকে তাদের না বলে পারলাম না। তুমি তোমার ছেলের অন্যায়কে সমর্থন করলে? ছেলের অন্যায়? না নীলাঞ্জনা প্রান্তিক যে কোন অন্যায় করতে পারে না, সেতো তুমি ভাল করে জান। অন্যায় নয়? রেহানাকে ভালবেসে অন্যকে বিয়ে করা অন্যায় নয? তুমি কি ঝগড়া করবে? তারপর বললেন, রেহানাকে ও সত্যি ভালবাসতো, তাই বলে যাকে ও বিয়ে করেছে তাকে ও ভালবাসে না, একথা তোমাকে কে বলেছে? হয়তো বাসে, তবে একদিন কিন্তু ও বলেছিল, না ওকে ও ভালবাসে না, বলেছিল নাকি? কবে? তুমি আর ন্যাকামো করোনা মিনতি। যাক গে বৌমাকে ডাক। আমি আশীৰ্বাদ করেই চলে যাবো। আর সেই সঙ্গে সেলিনাকেও ডাকো, ওকে আমি নিয়ে যাবে। মিনতি সেন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন নীলাঞ্জনার দিকে। বলে কি নীলাঞ্জনা। ওকি তবে সত্যি জানেনা প্রান্তিক কাকে বিয়ে করেছে? ব্যারিষ্টার ভট্টাচার্জ সাহেব এসে ঢুকলেন সেই সময়। নীলাঞ্জনাকে দেখে বললেন, এনাকে তো চিনতে পারলাম না মিস সেন। ইনি প্রান্তিকের পিসি। ও নমস্কার, আমি সুরেশ ভট্টাচার্য বটতলার উকিল। নীলাঞ্জনা বললেন বটতলার উকিল যে এ বাড়ীতে প্রবেশাধিকার পেতে পারেন না, সে আমি জানি উকিল সাহেবা, কিন্তু সঙ্গে এটি কে? মেয়ে? হ্যাঁ আমার মেয়ে শান্তা। শান্তা এগিয়ে এসে নীলাঞ্জনাকে প্রণাম করল। মিনতিকেও করল। দীর্ঘজীবি হও মা। তা উকিল সাহেব গিন্নী কই? আছে কোথাও চিন্তা করবেন না দেখা হয়ে যাবে। অধৈৰ্য্য হয়ে নীলাঞ্জনা বললেন কি হলো মিনতি ছেলে ছেলের বৌকে ডাক। মিনতি, ভট্টাচার্জ সাহেবকে বললেন, আপনি উপরে যান ভট্টাচার্জ সাহেব। আপনার কাকা আসবেন না? আসবেন তবে একটু দেরি হবে জানিয়েছেন। মিনতি সেন নীলাঞ্জনার হাত ধরে বললেন, অভিমান করো না ভাই, এতে ওরা দুঃখ পাবে? নীলাঞ্জনা বললেন, আমি না হয় পিসি মিনতি, কিন্তু এই আমি না থাকলে, ওকে কে চিনতো। সেই আমায় এতবড় আঘাত দিল? আমি জানিনা কি ভাবে ও তোমাকে আঘাত দিয়েছে। জান না? না না জানার ভান করছ মিনতি? ঠিক আছে, ও সেলিনাকে বিয়ে করবে না তাই বলে রেহানার জন্য অপেক্ষা না করে অশ্রুকে বিয়ে করতে হবে? এরপর আমি সেলিনার মুখের দিকে তাকাবো কি করে বলতো? এতক্ষণে মিনতি সেনের বোধ গম্য হয় নীলাঞ্জনার রাগের কারণ। কিন্তু রহস্য উন্মোচন না করে বলেন। অশ্রুওতো তোমার মেয়ের মতন, ওকেই মনে করো না তোমার সেলিনা। তাই মনে করতে হবে মিনতি, উপায় কি বল। দেখি প্রতীমবাবুকে বলব, অশ্রুরতো চাকরি প্রয়োজন নেই অশ্রুর চাকরিটা যদি সেলিনাকে দেন। প্রতীমবাবুর নাম শুনতেই চুপ হয়ে গেলেন মিনতি। বললেন তাই বলো। কিন্তু আমাকে এসব শুনিয়ে লাভ কি? আজকের দিনে ওনাকে নিমন্ত্রণ করোনি মিনতি? মিনতি সেন তাড়া লাগিয়ে বললেন তুমি কি এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলবে? এস ভিতরে এসো। প্রান্তিক ও তার বৌ তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। ঠিক সেই সময় বাইরে গাড়ী থামার শব্দ হল। আকবর হেঁটে এলেন হাতে একগাদা উপহার নিয়ে, এসে বললেন, গাড়ীতে সাহেব বসে আছেন। প্রান্তিক সাহেবকে, একবার ডেকে দেবেন? মিনতি বললেন, কিন্তু আপনাকে তো চিনতে পারলামনা কে আপনি? আমাকে চিনতে পারবেন না, আমি আকবর। তারপর বললেন, প্রান্তিক সাহেব আসতে না পারলে, অন্তত একবার সেলিনা মেমসাহেবকে বলুন না আসতে। সাহেব একবার তাকে ডেকেছেন। সেলিনার নাম শুনে চমকে উঠলেন নীলাঞ্জনা। বললেন, তোমার সাহেব এদের চেনেন? কেন চিনবেন না এই কয়কদিন তো ওনারা চৌধুরী সাহেবের কাছেই ছিলেন। কে চৌধুরী সাহেব? উত্মা প্রকাশ করে বললেন মিনতি সেন। আকবর বলল, সেকি? আপনারা চৌধুরী সাহেবকে চেনেন না। সুর এ্যান্ড সুর কোম্পানীর জেনারেল ম্যানেজার প্রতীম চৌধুরী? তিনি গাড়ীতে বসে আছেন কি অন্যায় কথা বলত। তার পর নীলাঞ্জনা আকবরকে বললেন যাও না ভাই প্রতীমবাবুকে উপরে ডেকে নিয়ে এসো। আকবর এগিয়ে গেলে নীলাঞ্জনা বললেন, মিনতি তোমার বাড়ীতে এসেছেন, তোমার কিন্তু একবার যাওয়া উচিত। মিনতি এব কোন প্রতিবাদ না করে বললেন, আমি প্রান্তিককে পাঠিয়ে দিচ্ছি। না তার দরকার নেই মিনতি, আমিই যাচ্ছি। কিন্তু তোমাকে ভাই অনুরোধ সেদিনের মত ব্যবহার করো না। চেষ্টা করবো, তুমি ওনাকে নিয়ে ওপরে এসো।
