দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে প্রতীমবাবু বললেন, আশ্রয়হীনতো হওনি। যদি হও, আমার দরজা তোমাদের জন্য চিরদিন ভোলা থাকবে মা। শুধু একটা কথা দাও, জীবনে যদি সেই দুঃসময় আসে কখনো, আমাকে না জানিয়ে কোথাও যাবেনা তোমরা। আমি ও সেলিনা প্রায় একসঙ্গে উচ্চারণ করলাম, তাই হবে কাকু।
একটা দুঃস্বপ্ন নিয়ে কাটে রাত। কতবারই চেষ্টা করেছি স্বাভাবিক হতে, পারিনি, বলতে গেলে সারারাত চোখের জল ফেলেছি। সেলিনা কোনদিন ভাবেনি, তার ভিতর আছে এমনি একটি নরম মন, তার অন্তরেও বাস করে এমন এক ভীরু নারী, যে নিজে পথ চেনে না। আমার হাত ধরেই সে পথ চিনতে চায়।
এক সময় শেষ হয় রাত। ও আমার বুকের উপর থেকে উঠে গিয়ে স্নান করে। তারপর অশ্রুকশার দামী শাড়ীতে সাজায় নিজেকে। তাড়া লাগায় আমাকেও স্নান করবার জন্য। আমি স্নান করে এলে, মোসলেউদ্দীন সাহেবের দেওয়া ধুতি ও পাঞ্জাবী তুলে দেয় আমার হাতে, বলে পরে এস। তাই করে এলে, সিঁদুরের কোঁটোটা আমার হাতে তুলে দিয়ে বলে, জানিনা প্রান্তিক জীবনে আর কোনদিন তোমাকে এমন করে পাব কিনা। তাই তোমার। দেওয়া সিঁদুরে আরেক বার রাঙিয়ে দাও আমার সিথ। নীরবে তাই করলাম প্রতিবাদ না, করে। তারপর আমাকে ও আবারও প্রণাম করে বলল, মা যদি গ্রহণ না করেন, কথা দাও প্রান্তিক, আমাকে গ্রহন করবার জন্য মাকে তুমি অনুরোধ করবে না। বললাম সেলিনা। এই শেষ বারের মতো তোমার অবাধ্য হচ্ছি প্রান্তিক, তোমাকে কথা দিতেই হবে। আমার জন্য তুমি কারো কাছে কোন অনুরোধ জানাবে না। দুঃখে বুক ভেঙে যাচ্ছে, তবু বললাম, তাই হবে সেলিনা।
ফেরার পথে কত কথাই মনে হয়েছে। কত স্মৃতি ভেসে আসছে। কত মান-অভিমান, রাগ অনুরাগের খেয়া পেরিয়ে এই যেখানে এসেছি সেই কি তবে শেষ ঠিকানা? সন্দেহের দোলায় দোলে মন। আবেগে কঠ আসে রুদ্ধ হয়ে। আজ পর্যন্ত কেউ তো আমায় অস্বীকার করেনি। কেউতো বলেনি, না, সেলিনা তোমার জীবনে আসতে পারেনা। আমার পিসিতে চেয়েছিলেন এই যেন হয়। মিনতি সেন সন্দেহের দোলায় দুললেও কখনো এটা ঘটতে দেবেন না এটাতো মনে হয়নি। অশ্রুকণাতত সেলিনাকে গ্রহণ করার জন্য বারবার বলেছে, তপতীতে তার হৃদয় দিয়ে বুঝেছে সেলিনার গভীর প্রেমের অনুভূতি। কে জানে রেহানা হয়তো এমনি কিছু অনুমান করে গভীর অভিমানে সরে গেছে কি না।
যখন হাওড়ায় এসে নেমেছি, সেলিনা বলল, বাড়ীতে এখনি ফিরবে? কেন? মিনতি পিসিকে একটা ফোন করলে হয় না? বুঝতে পারছি নারীর স্বাভাবিক দুর্বলতায় তার ভীরু মন বার বার কেঁপে উঠছে। যাদের ভালবাসা জীবনকে এই খানে নিয়ে আসতে সাহায্য করেছে, যারা কখনো বাঁধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়নি, কেমন করে এ ঔদ্ধত্য তাদের কাছে প্রকাশ করা যাবে। বললাম, ফোন করে কি বলব? ও বলল, ফোনটা ধরে আমাকে দাও। যা বলার আমি বলব। তুমি? হ্যাঁ আমি। কারণ, যা কিছু ঘটেছে তার সব দায়িত্ব আমার। বেশ, বলে স্টেশন থেকে মিনতি সেনকে ধরলাম হ্যালো? মিনতি সেন ইজ স্পিকিং। মা আমি প্রান্তিক বলছি। কোথা থেকে? হাওড়া থেকে। তাহলে বাড়ী না এসে ফোন করছিস। যে, কখন পৌঁছালি? সেলিনা তোমার সঙ্গে কথা বলবে না। দে হ্যালো? কে সেলিনা? হ্যাঁ, মা, বল আমায় তুমি ক্ষমা করতে পারবেতো মা। সে কি কথা সেলিনা। কি অন্যায় করেছিস যে ক্ষমা করার প্রশ্ন আসছে? আমার অন্যায়ের কোন সীমা নেই মা! বারে মেয়ে, কি যে করলি তাইতো বুঝতে পারছি না, অথচ ক্ষমা চেয়ে চলেছিস। অন্যায়, সে ছোট বা বড় যেমনই হোকনা কেন, তুমি আমায় ক্ষমা করতে পারবে কি না তাই বল। যদি না পারি। তা হলে এমুখ আর তোমাদের দেখাবো না। এখান থেকে দুচোখ যে দিকে যায় চলে যাব। মিনতি সেন বললেন তুই যখন বলতে পারবিনা, তা হলে প্রান্তিককে দে, ওর কাছে জিজ্ঞাসা করি কি অন্যায় করেছিস। তার মানে ক্ষমা পাওয়ার যোগ্যতা আমার নেই তাই না মা। বেশ দিচ্ছি প্রান্তিককে, ধর, আর আমিও চলে যাচ্ছি। ব্যথায় কেঁদে ওঠে মিনতি সেনের বুক বললেন, সেলিনা। কোথায় সেলিনা? তার আগে ও আমার হাতে ফোন দিয়ে সরে দাঁড়িয়েছে। মিনতি সেন বললেন, কি এমন তোরা করেছিস যে আমার ক্ষমা না পেলে ওকে চলে যেতে হবে। আমি ধীরে ধীরে বললাম, মা, একদিনতো রেহানাকে তুমি হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করেছিলে। আজ কি পারবেনা সেই জায়গায় সেলিনাকে জায়গা দিতে। মিনতি সেন বললেন, প্রান্তিক, আমি গর্ভে ধারণ না করেও তোদের মা। তোর মা, রেহানার, আর আজ থেকে সেলিনারও মা। মা কি পারে অনুতপ্ত সন্তানের অন্যায়কে ক্ষমা না করে? তোরা অনেক কথা বলেছিস। কিন্তু কি অন্যায় করেছিস সেটা শুধু বলিসনি। ঠিক আছে, আমি আসছি, তোরা অপেক্ষা কর ওয়েটিং রুমে। আমি আধ ঘন্টার মধ্যে পৌঁছে যাবো। ছেড়ে দিলেন ফোন মিনতি সেন।
সেলিনা বলল, আমিতো তোমায় বলেছিলাম আমার জন্য তুমি কাউকে কিছু বলবেনা। কোন অনুরোধ করবে না। তুমি কথা দিয়েছিলে, কিন্তু রাখলে না সে কথা। ব্যথায় যেন ভারি হয়ে ওঠে বুক। বললাম হ্যাঁ কথা দিয়েছিলাম, কিন্তু তোমার জন্য তো কিছু বলিনি সেলিনা তাছাড়া অবুঝ হয়ো না। মিনতি সেন তো জানে না কিছুই। কেন তার প্রতি এই ভুল ধারণা করছ। সেলিনা বলল না প্রান্তিক আমি চলে যাবো। আমি একটু রেগে গিয়ে বললাম তুমি কি ইচ্ছে করলে যেতে পার নাকি। না পারিনা তোমার অমতে আজ আমি কিছুই পারিনা। কিন্তু আমি জানি, তুমি আমায় বাধা দেবে না। কি ভাবে জানলে আমি বাধা দেবো না। এতদিন তো বাধা দাওনি। এতদিন আর আজকের মধ্যে কি কোন পার্থক্য নেই? জানিনা। যদি না জান তাহলে মিনতি সেনের কাছে ক্ষমা চাইতে গেলে কেন? দেখ সেলিনা, তোমার হাতের নোয়া তোমাব সিঁথির সিঁদুর, তোমার কপালের ওই রক্তিম টিপ সব কিছু জ্বল জ্বল করে জানিয়ে দিচ্ছে, আজ স্বেচ্ছায় তুমি কিছু করতে পার না। আজ তুমি আমার স্ত্রী সেলিনা। সাক্ষী মনোয়ারা বেগম, মোসলেউদ্দীন সাহেব, আকবর, আর সব থেকে বড় সাক্ষী প্রতীমবাবু নিজে। এই সব কিছুকে অস্বীকার করে পারবে তুমি চলে যেতে আমাকে ছেড়ে? না পিরবো না, কোন ভাবেই পিরবো না। আমাকে তুমি পথ বলে দাও আমি কি করব। বললাম, তুমিতো পথ হারাওনি, যদি সত্যি কোন দিন পথ হারিয়ে ফেল, আমি থাকব তোমাকে পথ দেখানোর জন্য। সত্যি প্রান্তিক! হ্যাঁ সেলিনা, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত থাকব তোমার পাশে। আবেগকে গাঢ় করে সেলিনা বলল, বিশ্বাস কর প্রান্তিক, তোমাকে ছেড়ে যেতে হবে এই চিন্তা আমায় পাগল করে দিচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে বলত। আমি সবে বলতে আরম্ভ করেছি যুগ যুগ ধরে বহমান সংসার আর ঠিক সেই মুহূর্তে সামনে এসে দাঁড়ালেন মিনতি সেন। আমার কাঁধ থেকে ওর মাথাটা তুলে দিয়ে বললাম, দেখ সেলিনা, তোমাকে নিতে মা এসেছেন। সেলিনা উঠে গিয়ে মিনতি সেনকে প্রণাম করতেই, তাকে দু হাতে তুলে নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে বললেন, ওরে পাগলি মেয়ে, কোন অভিমানে পালিয়ে যেতে চাইছিস? আমার ক্ষমা পাবিনা বলে? ওরে পাগলী তোদের সব কথা অশ্রুকণা জানিয়েছে আমাকে।
