গাড়ীটা থেমে গেল এক সময়। চারিদিকে সবুজ মাঠ। মাটি কাটা হচ্ছে একটু দূরে। আকবর বলল এসে গেছি সাহেব। এবার নামতে হবে। গাড়ী আর যাবে না? জিজ্ঞাসা করলাম আমি। বলল না। সামান্য পথ হাঁটতে হবে। আকবর আগে। আমি তারপরে, আর আমার হাত ধরে আছে সেলিনা। আমরা এগিয়ে চলেছি। আমি সেলিনার সাহস দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছি। সিঁথিতে উজ্জ্বল সিঁদুর হাতে নোয়া। পরনে লাল শাড়ী, যেন বিজয়িনী চলেছেন দিগ্বিজয় করে।
প্রতীমবাবু বেরিয়ে এলেন। সেলিনার দিকে তাকালেন উৎসুক দৃষ্টিতে। তারপর আমাকে বললেন কোন অসুবিধা হয়নি তো। বললাম না। সেলিনা বলল, কাকু একটু দাঁড়ান না। অবাক হয়ে দাঁড়ালেন প্রতীমবাবু। সেলিনা ওই ভাবে প্রতীমবাবুকে প্রণাম করল। তারপর বলল, আশীর্বাদ করলেন না। বললেন করেছি মা! কি আর্শীবাদ করলেন। উনি বললেন যে সত্যের সন্ধান তুমি পেয়েছে তা যেন তোমার জীবনে চিরস্থায়ী হয়। সেলিনা বলল, তা হলে আপনি বলছেন এতদিন যা আমি চেয়েছি তা আমি পেয়েছি? পেয়েছে যে তারতো উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তোমার ঐ রক্তিম সিঁথি, তোমার হাতের নোয়া, তোমার লাল শাড়ী। লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো সেলিনা। তাহলে আপনি আমাকে মেনে নিচ্ছেন তো। প্রতীমবাবু বললেন, আমি মানার কে মা? তোমার হৃদয় তোমার আকাঙ্খা পেয়েছে পরিণতি। মেনেছে তোমার মন। কিন্তু একটা কথা জানকি সেলিনা? বলুন। হিন্দু নারীর কাছে সিঁথির সিঁদুরের মূল্য যে কি অমূল্য, জানি না সে ধারণা তোমার আছে কি না। যদি খেয়ালে ও সিঁদুর ধারণ না করে থাকো, তাহলে আমি আশীর্বাদ করছি তুমি সীমন্তনী হও। লজ্জা ও নম্রতায় সেলিনা বলল, আপনার ইচ্ছেকে যেন যোগ্য মর্যাদা দিতে পারি।
১৭. তারপর আর কোন কথা না বলে
তারপর আর কোন কথা না বলে, তাড়া লাগালো, কাকু এবার বসে যান, আমি ব্রেকফাষ্ট পরিবেশন করছি। তুমি করবে? কেন বেয়ারা তো করতে পারে? তা পারে কিন্তু ওকে আজ ছুটি দিয়ে দিন। তা হলে দুপুরে খাবে কি? কেন আমি রান্না করব, আজ আপনি ও আপনার সহকর্মীরাই হোন না আমার ও আমাদের অতিথি। প্রতীমবাবু মৃদু হেসে বললেন তাই হোক মা। তারপর নিজের গলার মূল্যবান সোনার চেনটি খুলে তার গলায় পরিয়ে দিয়ে বললেন, আজ তো আর কিছু নেই মা। সেলিনা কেঁদে ফেলল, প্রতীমবাবু বললেন ভয় নেই মা। যত ঝড়ঝঞ্জা আসুক জীবনে, আমি থাকবো তোমাদের পাশে, আর সেই সময় আমি নীচু হয়ে ওনাকে প্রণাম করলাম।
সারাটা দিন কেটেছে এক গভীর আনন্দে। জীবনে কোন স্মৃতিতো মুছে ফেলার নয়। সন্ধ্যার আগে ফিরছি এক সঙ্গে। হিন্দু বধুর কি ভাবে চলা উচিত, কি তাদের করা উচিত এই সব নিয়ে জ্ঞান দিতে দিতে এলেন প্রতীমবাবু।
রাতের ডিনারের পরে সেলিনা চলে গেছে ঘরে। প্রতীমবাবু বললেন, একটা কথা জিজ্ঞাসা করি প্রান্তিক, যদি কিছু মনে না করো। বলুন? যা তোমরা করেছে আমি নিজেও চেয়েছিলাম তোমাদের জীবনে এটা ঘটুক, কিন্তু এ তোমাদের হঠাৎ খেয়াল নয়তো। একথা বলছেন যে। উনি বললেন না এমনিই জিজ্ঞাসা করছি। তবু যদি কিছু মনে না কর তাহলে বলবে কি কেন এ কাজ তোমাদের করতে হল হঠাৎ? আমি বললাম আপনি কি আমাদের জন্য খুব কষ্ট পাচ্ছেন? না প্রান্তিক, আমি তোমাদের একজন শুভাকাঙ্খী। তবু তোমরা যা করলে, তার জন্য আমি তো আমার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারি না। কেন? প্রতীমবাবু বললেন, আমি তোমাদের এখানে আসতে বলেছিলাম। অবশ্য তার জন্য একটা বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল। সে যাই হোক। এখানে আসার পরে তোমরা যা করলে তার জন্য কারো কারো কাছে কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন তো আমায় হতেই হবে। কেন তোমরা সকলকে এড়িয়ে এ কাজ করলে। যদি অসুবিধা না থাকে বলা যাবে কি? বললাম, আপনাকে বলতে চেয়েছি বারবার, কিন্তু সেই মুহূর্তটুকু তৈরি করা যায় নি। এবার মনে হয় বলা যেতে পারে। বলে যা যা ঘঠেছিল সব বললাম ওনাকে। উনি অবাক হয়ে শুনলেন। তারপর বললেন, কিন্তু তোমার মা যখন শুনবেন হয়তো আঘাতও পেতে পারেন, কি বলবে তাকে? শুধু মা নয়, আঘাত তো পেতে পারেন আমার পিসিও, তাইতো এ দায়িত্ব আমরা আপনাকে গ্রহণ করতে বলছি। আমাকে বলছ? হা কাকু, আপনাকেই বলছি, কারণ আমি জানি, যে শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস আপনার উপর আমার মা ও পিসির আছে, তাতে এক মাত্র আপনিই পারেন সবকিছুকে ঠিকঠাক মত পরিচালিত করতে। একটা কথা শুধু আপনাকে বলতে পারি, আবেগ ও রোমান্টিক স্বপ্ন ও কল্পনা আমাদের যেখানেই ভাসিয়ে নিয়ে যাকনা কেন, আমি ও সেলিনা আপনাকে কথা দিচ্ছি, তারা গ্রহণ না করা পর্যন্ত পরিশীলিত সংযম আমাদের রক্ষা করবে। উনি বললেন জানি। এ বিশ্বাস তোমাদের উপর আছে। কিন্তু যদি এমন হয় যে তোমাদের কোন ভাবেই এই অবস্থায় গ্রহণ করতে পারলেন না কেউই। কি হবে?
খেয়াল করিনি কখন এসে দাঁড়িয়েছে সেলিনা পিছনে। প্রতীমবাবু ও খেয়াল করেন নি। সেলিনা বলল এমন অবস্থার মুখোমুখি হতে হলে, জানি আপনি দুঃখ পাবেন, তবু আপনাকে কথা দিচ্ছি কাকু, আমি সরে যাবো। আমি আমার সত্যকে নিয়ে একা একা পথ চলবো। কিন্তু আজ আর জীবন থেকে এসব মুছে ফেলার উপায় নেই কাকু। জানি মা, জীবনে এমন কিছু কিছু ঘটনা ঘটে সারা জীবন দিয়ে তার দেনা শোধ করতে হয়। সেলিনা বলল তাই করব, তবু আজ আর প্রান্তিকের জীবন থেকে সরে যেতে বলবেন না, পিরবো না, বলে প্রতীমবাবুর পায়ের উপরে উপুড় হয়ে বসে পড়ল সেলিনা। আর তিনি তার মাথায় নীরবে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, সব বুঝি মা। কিন্তু আমিতো প্রান্তিকের কেউ নই। হয়তো ঠিক অথবা ঠিক নয়। কিন্তু যা ঘটেছে তাতে আমরা ইচ্ছে করে ঘটাইনি, আর যে ভাবেই হোক ঘটে যা গেছে তা অস্বীকার করব কি করে। তারপর বলল, সবার প্রতি গভীর বিশ্বাস নিয়ে প্রান্তিকের সঙ্গে নিশ্চয়ই ফিরব কাল, কিন্তু যদি সত্যিই আশ্রয়হীন হই, আপনি দেবেন না আমাদের আশ্রয়। বলুন কাকু দেবেন না?
