একি অপরূপা এলে তুমি আজ
দুয়ারে আমার
গভীর রাতের আঁধার পেরিয়ে
একি তর অভিসার
চোখের কাজলে
বিদ্যুৎ হানি করেছ কি
অনুমান–
হৃদয় আমার উন্মুখ
কেন কাঁপে বুক
অকারণ।
কাটার আঘাতে বিক্ষত মন
সেকি তবে অভিমান?
ও বলল, উঠবেনা? কটা বাজে জান? এখনিতো আকবর আসবে। মনে পড়ে যায়, কাল রাতের সব ঘটনা। এইকি তবে সেই সেলিনা। যে অশ্রুকে আমার হাতে তুলে দিয়ে বিদায় নিতে চেয়েছিল। জীবনে এমন বিচিত্র রূপিনী কোন নারীকে দেখেছি বলে মনে পড়েনা। বললাম একদম ইচ্ছে করছে না। ওকে ফিরে যেতে বল। সে হয় না। তারপর বলল, বার বার ব্যর্থ হয়েছি আমি। আজ আমি জয়ী হতে চাই, ওঠো, বলে ও আমার হাত ধরে টেনে তুললল। আর সেই সময় ওকে কাছে টানতে গেলে বলল, স্নান করে এসো আগে। আমি ওর কথারই প্রতিধ্বনি করে বললাম ততক্ষণ যদি এই মনটা মরে যায়। মরবেনা। আমি আছি এখানে তুমি তাড়াতাড়ি এসো। আমি বাথরুম থেকে স্নান করে বেরোলাম। নতুন একটা পায়জামা ও পাঞ্জাবী আমার হাতে তুলে দিয়ে বলল। এটা পরে নাও। বললাম কোথায় পেলে। বলল ও কাল আকবরের সঙ্গে বাজারে গিয়ে নিজের হাতে কিনেছি। কারো জন্য আমার প্রথম কিছু কেনা। আমি নিলাম। তারপর ভিতরে গিয়ে ওটা পরে বেরোলাম। ও আমার কাছে এগিয়ে এসে বলল, কি দেব তোমায় বল। আমার ক্ষুদ্রতা তোমাকে দিতে পারি না, আমার নীচতা তোমাকে আঘাত করতে পারে। আমার অহংকার তোমাকে অহংকারী করতে পারে। তাই নিজেকে তুলে দিলাম তোমার হাতে। জানলাটা ভোলা ছিল সেই দিকে তাকিয়ে বলল, ঐ দেখ পূব আকাশ লাল হয়ে উঠেছে, এখনি সূৰ্য্য উঠবে, ঐ সূর্যকে সাক্ষী রেখে তোমাকে বরণ করে নিলাম আজ প্রভাত বেলায়। বলেই কালকের কেনা সেই অপূর্ব রজনী গন্ধার মালাটি আমার গলায় পরিয়ে দিয়ে বলল কিছু দেবে না? মনযে কত কিছু দিতে চাইছিল, তার হদিশ কি করে করব। বেনীতে ফুল গুঁজে দিয়ে আমার তৃষ্ণাব্যাকুল ওষ্ট দুটি নামিয়ে নিয়ে এলাম ওর অধর প্রান্তে। না কোন বাঁধা দিল না। যেন যুগ যুগান্ত ধরে যে তৃষ্ণার স্রোত বয়ে চলেছে দুই পাহাড়ী নদীতে, হঠাৎ তা জলস্ফীতিতে ভাসিয়ে নিয়ে চলল তটভূমি, আঘাত করতে উদ্যত যখন, তটভূমি প্রান্তর, হঠাৎ বন্যার আশঙ্কায় যখন প্রতিটি মুহূর্তের অধীর প্রতীক্ষা, দরজায় নকের পর নক করে ডেকে চলল আকবর। সাহেব ছটা বেজে গেছে, একটু তাড়াতাড়ি করুণ। সাহেবের ব্রেকফাষ্ট করতে দেরি হয়ে যাবে। ওকে ছেড়ে দিয়ে বললাম, আসছি আকবর তুমি গাড়ীতে যাও।
হাসছে ও। মৃদু হাসির তরঙ্গে যেন দুলে উঠছে মন। চাইছে নিবিড় করে সর্বস্ব উজাড় করে তাকে পেতে। ভগ্ন সারথী আমি পেলাম না আজো তাকে, জানিনা, সবটুকু পেতে আর কত কাল অপেক্ষা করতে হবে। ও তখনো একটা হাত ধরে আছে। বললাম, আকবর গাড়ীতে আছে চল। ও বলল, যাব তুমি তার আগে একটু সোজা হয়ে দাঁড়াও। বললাম কেন? দাঁড়াওনা। ওর কথা মত দাঁড়ালাম। ও হাটুভেঙে নীচু হয়ে আমাকে প্রণাম করল। উঠে বলল, আশীর্বাদ করলে না। করেছি? কি আশীর্বাদ করলে। ওটা গোপন বলতে নেই। তুমি না বলতে পারলেও তোমাকে প্রণাম করে কি চেয়েছি তোমার কাছে জানতে ইচ্ছে করছেনা? গভীর উৎসাহে বললাম, কি চেয়েছো? ও বলল আমার মাতৃত্বে তোমার রক্তের উত্তরাধিকার। তখনো, মিটি মিটি হাসছে সেলিনা। আমি বললাম, সে যোগ্যতা যদি আমার থাকে, তোমাকেই সেই অধিকার দিয়ে ধন্য হব আমি। তারপর একসঙ্গে বেরিয়ে এলাম আমরা।
কতদিন, কত ভাবেই তো দেখেছি ওকে। কখনো চঞ্চলা হরিণী। কখনো অভিমানিনী, কখনো বা নিষ্ঠুর নিয়তি হিসাবে। আর এই রূপেতো প্রথম দেখেছিলাম তাকে মোনোয়ারা বেগমের ঘরে। নব বধুকে সাজিয়ে যেন বাসর ঘরে পাঠিয়েছেন তিনি। ওরই অনুরোধে ওর সিঁথি আমি অলক্তরাগে রাঙিয়ে দিয়েছিলাম। আজ সেজেছে ও নিজে। যেন নিজের অধিকারে সচেতন এক গরবিনী। যে মালায় বরণ করেছিল আমাকে। এখনো তা ওর গলায় শোভা পাচ্ছে। কি অপূর্ব যে লাগছে ওকে। কিছুতেই চোখ ফেরাতে পারছি না। বলল, কি দেখছো অমন করে। বললাম নারীর রূপ থেকে রূপান্তরে উত্তরণ। বন্ধু থেকে প্রেয়সী সেখান থেকে তোমার এই বধূরূপ এর যে ব্যপ্তি ও ব্যঞ্জনা কেমন করে বোঝাবো সেই অপরুপাকে। এরপর বললাম সেলিনা, বল তো কেমন করে জীবনে ঘটাও এই রূপান্তর। ও বলল জানি না। তার পর আমার হাতটা ওর নিজের হাতে তুলে নিয়ে বলল, আমাকে তোমার ভাল লাগছে? কেমন করে জানাবো তোমায় কেমন লাগছে তোমাকে? জানতো কবিগুরু বলেছিলেন–বিয়ের বাসরের আড়ম্বর বিলীন হয়ে যায় একসময়, কিন্তু ৰাজে যে সানাইয়ের সুর তার রেশটুকু থাকে আজীবন। এই যে অপরূপা তুমি, সানাই না বাজলেও যে সুর বাজছে আমার মনে তাই চির অমলিন হয়ে থাকবে আমার শেষ যাত্রার দিন পর্যন্ত। কি? আজ আর কোন কিন্তু নয় সেলিনা। আজ আর কোন বিরূপ মন্তব্যে আমার মুখ দৃষ্টি আর ভালো লাগার রেশটুকু নষ্ট করে দিওনা। তুমি যখন আঘাত দাও, হৃদয়ের কোথায় গিয়ে তা বাজে যদি হৃদয় চিরে তা দেখাতে পারতাম। এমন করে বলো না। আমি জানি, শুধু যে জ্বালায় নিজে জুলছি তারই আগুনটুকু পাও তুমি। জ্বালাতে পাও না। তুমি দেখতে পাওনা তাই। যদি দেখতে পেতে এমন করে জ্বালাতে পারতেন। জানিগো জানি, বলল সেলিনা। তবু ভয় হয়। যে স্বপ্নে তোমায় আমি ভাসিয়ে নিয়ে চলেছি, স্বপ্নের মরিচিৎকার মত তা মিলিয়ে যাবে নাতো? বললাম কেন এত ভয় পাও। কাকে ভয় পাও তুমি। নিজেকেই ভয় পাই সব থেকে বেশী। যন্ত্রণার কীটগুলো আমাকে যখন মুহুর্মুহুঃ দংশন করে, আমি পাগল হয়ে যাই। ভাবি, যদি তোমার আত্মীয় স্বজন আমায় গ্রহণ না করে। নাইবা করলো সেলিনা। আমি তো করেছি? সবই বুঝলাম, কিন্তু এইভাবে দাঁড়াবো কি করে তোমার পিসি মানে আমার মায়ের কাছে। মিনতি পিসির কাছে। বললাম মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে সেলিনা। তুমি তো কোন অন্যায় করোনি। দুটি হৃদয় ভালবেসে কাছে এসেছে, দুটি যৌবন একসাথে ভেসে যেতে চেয়েছে এতে তো লজ্জার কিছু নেই। কিন্তু এই সমাজ। আমি বললাম, সমাজতো মানুষ সৃষ্টি করেনি। মানুষই তার প্রয়োজনে বানিয়েছে সমাজ। আবার প্রয়োজনে তাকে ভেঙে নতুন সমাজ গড়বে। সেই সমাজের কারিগর হিসাবে আমরা শুধু আমাদের নাম লিপিবদ্ধ করে যাবো। সব থেকে বড় কথা সেলিনা, এমন করে কোনদিন বুঝতে পারিনি, রেহানাকে নয়, অশ্রুকণাকেও নয় আমি শুধু তোমাকেই চেয়েছিলাম। ও আমার দিকে অপলক তাকিয়ে বলল, পেয়েছো কি আমায়? আর কোন ভুল হবে না সেলিনা। হাজার চেষ্টায় আজ আর তুমি পালাতে পারবে না। তারপর বললাম, যে বাঁধনে বেধেছি তোমায় সে তো তোমার কণ্ঠে শোভা পাচ্ছে এখনো, যে সিঁদুর মুছে ফেলতে চেয়েছিলে দৃপ্ততায় তাতেই রাঙিয়েছে সিঁথি। সে তো তোমার অধিকার। তাইতো চলার পথে ভুলের ঠিকানা হারিয়ে গেছে কখন নিজেও জানো না। সত্যি কি তাই? হ্যাঁ সত্যি।
