রাত প্রায় ১০টা বেজে গেছে। ঘুম আসছেনা, অথচ দুপুরে যে স্বপ্ন দেখেছিলাম শুধু নয়, দেখিয়েছিলাম, তা কেমন মিইয়ে গেছে। যে আবেগ নিয়ে ওকে নিজের মত সাজাবার যে বায়না ধরেছিল আমার কাছে, এবং কথাও দিয়েছিলাম; উভয় পক্ষের প্রস্তুতির অভাবে তা হাওয়াই ফানুসের মত কোথায় মিলিয়ে গেল। এইই হয়। সেলিমা বলেছিল, তখন হয়তো ইচ্ছেটাই যাবে মরে। বলেছিলাম, যাক না, আমার অনুরাগে সাজাবো তোমায়। কিন্তু কেন পারছি না। কেন বলতে পারছি না, এস সেলিনা, ফুল সম্ভারে সাজাবো তোমায়। কিন্তু কোন কথাই বলার জোর যেন হারিয়ে ফেলেছি। এক সমূয় বাথরুমে যেতে গিয়ে উঁকি মারলাম ওর ঘরে। বললাম ঘুমাওনি। ঘুম যে আসছেনা। তাহলে এস আমার ঘরে। কেন? আমারও যে ঘুম আসছেনা। ও বলল, এতে ঘুমের কোন দোষ নেই, ঘুম আর আসবেনা। শুধু আজ নয, কতরাত যে ঘুম আসবেনা কে জানে? আমি বাথরুম থেকে বেরিয়ে ওর বিছানায় গিয়ে বসলাম, জানতে চাইলাম একথা বলছ কেন? আমি শুধু বলছি ্না ভাবছি। কেন অমূলক এসব নিয়ে ভাবছ? তুমি ভাবছ না? কই নাতো। মিথ্যে কথা। তারপর বলল কে জানে কবে তুমি সত্যি কথা বলতে পারবে। তারপর একটু থেমে বলল, জান, আমার কেবলি মনে হয় এই ১০টা দিন তোমার আমার জীবনের সব থেকে অভিশপ্ত মুহূর্ত। আমি অবাক হয়ে বললাম এসব কি বলছ তুমি। ও বলল, সত্যি বলছি। এতদিন তোমাকে মনে মনে চাইলেও, আমার বিভিন্ন আচরণে তা প্রকাশ পেলেও এমন ভাবেতো কখনো বাইরে আসেনি। এমন ভাবেতো উজাড় করে নিজেকে তোমার হাতে সঁপে দিইনি, যা ছিল কেবল গোপন, মধুর স্মৃতিতে যা ছিল আলোকিত, তাই এল বাস্তবের রুক্ষতায়, হারালো তার পেলবতা। আজ যেমন এগিয়ে যাওয়ারও পথ নেই, পিছিয়ে আসার পথও বন্ধ। আপন শিকলে বন্দিনী আমি। আমি বললাম। এসব কি আবোল তাবোল ভাবছে সেলিনা। জীবনের এই মুহূর্তটুকুকে তুমি অভিশপ্ত বলছ? যা আমরা চেয়েছিলাম এই মুক্তিতে তো তারই প্রকাশ ঘটল। তবু বলবে তুমি অভিশপ্ত? ও বলল, আমরা নয়, বল, আমি যা চেয়েছিলাম। অভিমানে আমি বললাম তুমি চেয়েছিলে আর আমি চাইনি? না চাওনি। তোমার দরজা বন্ধই ছিল, আজও বন্ধ আছে। মাঝে মাঝে শুধু একটু ফাঁক করে উঁকি মেরে দেখেছে নীল আকাশে কোন মেঘের ঘনঘটা আছে কিনা। আমি ওর আরো কাছে এগিয়ে একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বললাম, তোমাকে কি করে বোঝাবো সেলিনা, আমার মন কেমন করে চেয়েছে তোমাকে। ও বলল জানি মাঝে মাঝে মনেও হয়েছে। তোমার একটা মন তীব্র ভাবে আমাকে চেয়েছে, তাইতো তার চুম্বক আকর্ষণে বার বার তোমার কাছে এসেছি? কিন্তু এবার বলত সত্যি কি তুমি চেয়েছে কখনো? গ্রহণ করতে পেরেছো আমাকে তোমার হৃদয়ের মধ্যে? পারনি। আর পারবেও না। এটা কোন আদর্শের অজুহাত নয়। যে যৌবন নিঃসঙ্গ মুহূর্ত খোঁজে মিলতে, মেলাতে পেরেও যদি তা ব্যর্থ হয়ে যায়, কি কৈফিয়ত দেবে? আমি বললাম, সেকি শুধু আমার দোষ? না দোষ তোমার নয়, দোষ আমার। দোষ আমার অবাস্তব আকাঙ্খর, তাইতো তোমার নিজের হাতে সিঁথি রাঙিয়ে দিলেও তুমি কিন্তু আমার হলে না। নিজেকে সবটুকু তুলে দেওয়া সত্ত্বেও নিতে পারলে না। নারীর সর্বোত্তম মাতৃত্বের অধিকার চেয়েও পেলাম না এরপরও বলবে আমি তো তোমার সেলিনা। যে নাবী সর্বস্ব উজাড় করে তোমাকে দিতে চাইলে তার কৌমার্য্য, কি সহজ অবহেলায় সরিয়ে রাখলে, তুমি তা, তবু বলবে, জীবন অভিশপ্ত নয়? জানি তুমি হয়তো বলবে, এস সেলিনা, সব চাওয়া পাওয়ার আসান হোক আজ। যদি মুহূর্তের দুর্বলতায় তোমার সাগরে অবগাহন করি সারা জীবন ভরে যে কষ্ট তুমি বয়ে বেড়াবে কেমন করে সইবো তা। না আমি তা পারবো না, তার থেকে আমার একটা অনুরোধ রাখবে? আমি বললাম, কোন অনুরোধই তোমার-রাখব না সেলিনা। যদি না, বলা কথাগুলো তুমি ফিরিয়ে না নাও। ও বলল অবুঝ হয়ো না। ত্যাগ শুধু রেহানাই করতে পারে না সেলিনাও পারে। আমাকে তোমার হাতে তুলে দিয়ে অদির প্রেম তোমার হৃদয় জুড়ে থাকবে তা আমি হতে দেবো না। রেহানা যদি আসে ভালো না হলে অশ্ৰুদিকে তোমার জন্য রেখে দিয়ে আমি চলে যাবো। চলে যাবে? হ্যাঁ চলে যাবো। কোথায়? প্রতীমকাকুকে বলেছি, তিনি নিশ্চয়ই কোন ব্যবস্থা করে দেবেন। আমি আর পারালাম না। পুরুষের সংযমের সমস্ত বাধ প্রবল বন্যায় ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়ে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইলো। ওকে বুঝতে না দিয়ে ওর সমস্ত দেহটা আমার বুকের পরে তুলে নিয়ে পেষনে পেষনে নিষ্পেষিত করতে চাইলাম ওকে। আর কণ্ঠদিয়ে শুধু নিঃসারিত হলো, কেন আমাকে বোঝনা, কেন এভাবে আঘাত দাও। কেন বোঝনা সকলকে ছাড়তে পারলেও তোমাকে ছাড়তে পারার কোন উপায় নেই। এত নিষ্ঠুর কেন তুমি? ও বলল, ছাড় আমাকে এ ভাবে নিজেকে ছোট করোনা। মন যা চায় না, জোর করে তা নিতে যেওনা। কোন ভাবেই তুমি ছোট হয়ে যাও, এ আমি চাই না। এইটুকু অহংকারকে অন্তত তুমি বাঁচিয়ে রাখতে দাও। ওকে ছেড়ে দিয়ে চোখের জলে বললাম বুঝতে পারিনি সেলিনা। তুমিও আমার কেউ নও। তাই তোক তুমি সুখী হও।
পা চলছেনা। তবু কোন ভাবে ওর কাছ থেকে যেন পালিয়ে এলাম নিজের ঘরে। সারা রাত নিদ্রাহীন কাটিয়ে দিলাম। শুধু ঈশ্বরের কাছে প্রার্থণা করতে লাগলাম। কাল যেন ওর সঙ্গে যেতে না হয়। সকাল রাতের ঘুম আমাকে আচ্ছন্ন করে দিল। কাল যে কবর বলে গিয়েছিল সকাল ৬টার মধ্যে প্রস্তুত থাকতে। ভুলে গেলাম তা। সেলিনার হাতের স্পর্শে চোখ মেলে তাকালাম। হাসছে ও, সকালে স্নান করেছে। পরেছে মনোয়ারা বেগমের দেওয়া লাল শাড়ী। হাতে গলিয়েছে এয়োতির চিহ্ন নোয়া, যা এসেই খুলে রেখেছিল। পরিপাটি করে সিঁদুর দিয়েছে সিঁথিতে। চোখে দিয়েছে কাজল। লাল টিপ পরেছে দুই ভুর মাঝে। নিজের হাতে রচিত বেনীতে কালকের কেনা যুইয়ের মালা জড়িয়ে নিয়েছে, হাতে শুভ্র গোলাপ। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি তো তাকিয়েই আছি। এটা যেন বিভ্রান্ত স্মৃতিতে ভুলেছে তার পথ। মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল।
