আপনাকে কি ঠিকানা দেবো সীতাংশুবাবু। তবে ও মেয়ে চলে গেলেও আবার সে আসবে, আসলেই আপনার কাছে নিয়ে যাবে। এব থেকে বেশী আমি কিছু জানিনা সেলিনা। সে কেন গিয়েছিল, কেন হারিয়ে গেল, কোন উত্তরই আমার জানা নেই।
মুগ্ধ শ্রোতার মত শুনল সেলিনা তারপর বলল, অথচ একথা তুমি আমায় বলনি। না বলিনি, শুধু তোমাকে কেন, কাউকে বলিনি, কেন বলিনি জানিনা। কিন্তু তুমি জানলে কি করে? সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে তুমি কি করে আমায এড়িয়ে গেছ। বলতে চাইলাম ঠিক এড়িয়ে যাওয়া নয় সেলিনা। আসলে যার সত্যটাই জানিনা। সেকথা বলে অকারণ সন্দেহের দোলায় দুলে কি লাভ? আমি ইচ্ছে করে তোমাকে লুকিয়েছি এটা ঠিক নয়। বরং কোন রকম আগ্রহ না দেখিয়ে নিজেকে বুঝিয়েছি, যদি ও আসে আবার, মাষ্টাবমশাই জানাবেন, তার আগে বেশী আগ্রহ দেখিয়ে যদি তার আসার আশাটা নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু তোমাকে নিয়ে গেলে কেন অস্বস্তি হবে সেটাতো বললে না? হবে বললাম, কিন্তু কেন হবে এটা তোমাকেই বুঝে নিতে হবে। সেই হেঁয়ালি। ও বলল হেঁয়ালি শুধু আমার নয়। তুমি বলেছো আমার যা পরিচয় তুমি তা দেবে? বলতে কি আমার পরিচয়? বাঃ তুমি, সেলিনা, এটাই কি যথেষ্ট নয় তোমাকে পরিচিত করার। না যথেষ্ট নয়। সেলিনা একটা নাম, সেলিনা কোন পরিচয় নয়। তার থেকে বড় কথা, মা, আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, আমার মেয়ে সেলিনা। গ্রামের মানুষের ঔৎসুক্য তাতে নষ্ট হবে কেন? তারা বলেছিলেন নাম বলছো সেলিনা রহমান অথচ তোমার মেয়ে, তাহলে কি তোমার নাম নীলাঞ্জনা রহমান? মা আঘাত পেয়েছিলেন। বললেন, তাতে যদি তোমাদের ওর পরিচয় বুঝতে সুবিধা হয়, তাহলে আমি নীলাঞ্জনা রহমান। তোমরা মান বা না মান, ও আমার মেয়ে, এটাই ওর এক মাত্র পরিচয়। অবশ্য তারপর আমাকে ডেকে বললেন, কালই চলে যেতে চাই। আমি বললাম, তাই চল মা। আমারও ভাল লাগছেনা। জিজ্ঞাসা করলাম, মিনতি সেন জানেন ব্যাপারটা। না জানার তো কথা নয়? কারণ তিনি তো তখন ওখানেই ছিলেন।
নিজের অজ্ঞতার জন্য নিজের উপরেই ধিক্কার হচ্ছিল। এমন একটা ঘটনা ঘটে গেছে অথচ আমি জানি না। বললাম খুবই দুঃখের সেলিনা। তোমার কোথায় আঘাত বুঝি আমি, কিন্তু আমার বাবা বা মা তোমাকে কিছু বলেছেন? তোমার বাবার সঙ্গে আমার তো দেখাই হয় নি। মায়ের সঙ্গে? হা হয়েছিল। তোমার সঙ্গে কোন খারাপ ব্যবহার করেছেন? ও একটু রেগে গিয়ে বলল তুমি কি জানতে চাইছে আমার কাছে বলত? আমি কি তোমার বাবা-মায়ের কথা বলেছি? না বলনি, তবে এত দিন পরে অতীতে কি ঘটেছিল তাই যখন বলতে পারছে তখনতো আমার জানতে হবে আমার কি করণীয়? তুমি কি আমার জন্য তোমার আপন জনের সঙ্গে ঝগড়া করবে? আমি উম্মা ভরে বললাম, কে আমার আপন জন তুমি না ওরা? ও বলল থাক ও সব কথা। অযথা নিজেদের সুন্দর মুহূর্তকে নষ্ট করে দিয়ে লাভ নেই। তাছাড়া শুধু স্বপ্ন আর কল্পনা দিয়ে তো জীবন হয় না। তীব্র বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সব স্বপ্ন আর কল্পনা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। তাই বলছি ওসব কথা ভেবে লাভ কি? বরং ভাবা যাক নিজেদের কথা। নিজেদের ভবিষ্যতের কথা। ভাবা যাক আমি কি ছিলাম আর কি হয়েছি। নিজেদের প্রশ্ন করে দেখা যাক, যা হয়েছি তাই কি চেয়েছিলাম।
কোথায় যেন আঘাত পেয়েছে সেলিনা। আমি কি নিজের অসতর্কে কোন আঘাত দিয়েছি? কি জানি, বললাম, হঠাৎ মনে হচ্ছে তুমি দার্শনিক হয়ে গেলে। ও বলল এক অর্থে দার্শনিক তো আমরা সবাই। যে কিছু ভাবনা ও চিন্তা করে, সে নিজের সম্পর্কে হোক বা অন্য কাউকে নিয়েই হোক সেই তো দার্শনিক।
কথা বলতে বলতে সময় গড়িয়ে চলেছে। হোটেল বয় দরজায় নক করে লাঞ্চ দিয়ে গেল। খেতে খেতে ওকে বললাম, আজতো প্রতীমবাবু আসবেন না। আকবরও থাকবে আমাদের সঙ্গে, চলনা দীঘা থেকে ঘুরে আসি। তটভূমি ব্যাপী ঝাউবন সামনে সীমাহীন সমুদ্র। ও বলল, সত্যি যাবে তুমি। যদি তুমি যাও।
আকববকে বললাম। ও বলল, বিকালে বেরিয়ে তো ফিরে আসা যাবে না। আজ ওখানে থেকে কাল যদি আসি। হয়তো অসুবিধা হবে না। কিন্তু সাহেব তো দীঘার ঠিকানা জানবেন না। যদি প্রয়োজন হয় কোথায় সংবাদ পাঠাবেন? বললাম তাও তো ঠিক। তাহলে থাক। আশাহতের বেদনা ফুটে উঠে সেলিনার চোখে মুখে। আকবর বলল, অন্য কোথাও গেলে বলবেন। আমি নিচেই আছি। সাহেব যদি এখানে থাকতেন, তাহলে কোন অসুবিধা ছিল না। ও চলে গেলে আমি বললাম সেলিনা, চলনা বিকালে মেদিনীপুর শহরটা ঘুরে দেখি। না আমার কিছু ভাল লাগছেনা। তাহলে কি করবে? কেন যে প্রতীমকাকু আমাদের এখানে আটকে রেখেছেন জানিনা। আজতো চলে যেতে পারতাম। হঠাৎ বললেন, আজ নয় কাল। এখন বলছেন কাল নয় পরশু। এর থেকে অশুদির ওখানে থাকলেও ভাল হতো। উনিতো বলতে পারতেন আমরা যেন চলে যাই। এমনতো দূর নয়।
সত্যিই তো এমন কিছু দূর নয়। কাল বললেন আজ ব্রেকফাষ্ট করেই চলে যাবেন। পরে বললেন হঠাৎ কাজ পড়ে গেছে আজ যাওয়া হবে না, এখন আবার বলছেন কালও যাওয়া হবে না। কি জানি কি কাজ।
যাওয়াত হলেই না, এমনকি বিকালে শহরটা ঘুরে দেখার আশাও ত্যাগ করতে হল সেলিনার অনিচ্ছার জন্য। শুয়ে শুয়ে কাটিয়ে দিলাম বিকাল থেকে সন্ধ্যা। তারপর এক সময় রাত হয়। ডিনারের ঠিক আগে আগে আকবর বলে, সাহেব লোক পাঠিয়েছেন, এখান থেকে মাইল ত্রিশেক দূরে উনি আছেন। বলে পাঠিয়েছেন আপনাদের যদি আপত্তি না থাকে তাহলে সকাল ৮ টায় ওখানে ওনার সঙ্গে ব্রেকফাস্টে যোগ দিতে। সেলিনা বলল আকবর ভাই জায়গাটা কোথায়? আকবর বলল, শহর থেকে বেরিয়ে নাক বরাবর উত্তরে যে রাস্তাটা চলে গেছে ওই রাস্তা ধরে এগোলে পড়বে। জায়গাটার নাম কি? কোন নাম নেই। আসলে ধু ধু প্রান্তর। সাহেবদের ম্যানেজমেন্ট ওখানে একটা ইউনিট খুলবেন তারই তদরকি হচ্ছে। অফিস, কর্মীদের বাসস্থানের জন্য মাটি কাটা এই সব চলছে আর কি? ভাল লাগবে চলুন না। দেখতে পাবেন কি উৎসাহ নিয়ে সকলে কাজ করছেন যেন কর্মযজ্ঞ। সে __ জানতে চাইল সকালে কটায় যেতে হবে। আকবর বলল ছটার মধ্যে প্রস্তুত থাকবেন, আমি এসে ডাকব।
