সেলিনা বলল, কিন্তু ততইশ যদি আমার ইচ্ছেটা মরে যায়, যদি মন আর মজতে না চায়?
ক্ষতি কি তাতে, মম অনুরাগে রাঙাবো তোমায়
অভিমান যদি করো, অস্তবেলার গোধুলি পরশ দিয়ে
শিশির সোহাগে ভেজাবো তোমায় গভীর অন্ধকারে।
মিথ্যে রাগের ভেলায় ভেসে যদি যাও দূরে সরে
কি হবে উপায় তাই যদি ভাবো মনে, ভেবোনা বন্ধু
হৃদয় তোমারে নীববে লইবে টেনে, কেমনে পালাবে? আঁখিতে তোমার
নীরবে মাগিছে যাহা, সাধ্য কি আমার ফিরাবো তোমায়
হৃদয় আমার যেখানে শুকিয়ে গেছে, সেইখানে তুমি এসেছো গো বাব বার
শুধু আজ নয় বহুদিন বহুকাল, বহু বরষের সঞ্চিত সাধনায়
তোমার পরশ লাগি উন্মুখ মম মন।
আমি কি ফিরাতে পারি।
সেলিনা বলল, এমন করে বল না, এমন করে তুমি আমায় কাঙাল করে দিও না। তুমিতো বলেছিলে ভিখারিনীকে করুণা করা যায় ভালবাস যায় না। তারপর কাতর ভাবে বলল আমি তোমাকে ভালবাসতে চাই, আমি তোমাকে পেতে চাই। সুদূর বেদী হতে আমি তোমার আর্শীবাদ চাইনা। আমি তোমার শিষ্যা হতে চাইনা। তোমাকে চাই আমার মতন করে।
বললাম, আমাকে তুমি যেমন করে পেতে চাও তেমনি ভাবেই পাবে। পাবে আমাকে তোমার অহংকারের মধ্যে, পাবে তোমার ঘৃণার মধ্যে, তোমার ভালবাসার মধ্যে, তোমার হিংসার মধ্যে। তোমার ঈর্ষার মধ্যে তোমার রাগ ও অনুরাগের বিচরণ ভূমিতে। তোমার বক্ত মাংসের অভিমানে আমাকে তুমি তোমার মত করে বুকে তুলে নাও।
সেলিনা যেন বিজয়িনী আজ। বলল, তাই নিলাম। আমার স্বপ্ন কল্পনা তোমাকে দিয়ে আমি ধন্য হলাম আজ। তারপর ফুলও ফুলের মালা সকলি আমাকে দিয়ে বলল, এগুলো থাক তোমার কাছে, তোমার পরশে গরবিনী হোক ওরা। মালার অলংকারে সাজবার সাধ আমার আর নেই।
ফিরে গেল নিজের ঘরে। পিছু ডাকতে পারলম না। আকবর যে যায়নি বুঝতে পারিনি। ফিরে এলো এক সময়। বলল, সাহেব তখন বলে দিয়েছেন, যদি কোথাও যেতে চান, আমি যেন আপনাদের নিয়ে যাই। বিকালে কোথাও বেরোবেন?
সেলিনা বেরিয়ে এসে বলল, আকবর ভাই, তোমার সাহেব কখন আসবেন? উনিতো আসবেন না আজ। সেকি কই আমাকে তো বলেননি। তাহলে হয়তো ভুলে গেছেন, উনি কাল বিকেলে আসবেন। যেখানে গেছেন, সেখানে অনেক কাজ পড়ে গেছে একদিনে হবে না, তাইতো আমাকে বললেন আপনাকে হোটেলে পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্য। উনি আসবেন কি করে। উনিতো কাল আসবেন। আমিই নিয়ে আসব। তা হলে আকবর ভাই তুমি আজ আমাদের সঙ্গে থাকছে তো। আমিতো আছি আপনাদের সঙ্গে। কোথায় থাক? এই হোটেলের নীচ তলায়। এখানে তো সাহেবকে সবাই চেনেন। সাহেব আসতে চাইলে, ৪/৫/৬ এই তিনটি ঘরই তিনি বুকড করেন? কেন? যদি কেউ এসে পড়েন থাকবে কোথায়? তবে সাহেব যখন আসেন তখন কেউ না কেউ সঙ্গে আসেন। আমি আগে আপনাদের দেখিনি এই প্রথম দেখলাম। সাহেবের কোন আত্মীয় স্বজন আছে কিনা জানিনা। সেলিনা বলল আচ্ছা তুমি যাও আকবর ভাই, যদি বেরোই তোমাকে সংবাদ দেব। আচ্ছা বলে আকবর বেরিয়ে যায়।
আমি বলি, সেলিনা, অনেকদিন বাড়ী থেকে এসেছি। বাড়ীর জন্য কোন ভাবনা হচ্ছে না? হচ্ছে বৈকি, সব থেকে ভাবনা হচ্ছে মায়ের জন্য। আর ভীষণ করে তার কথা মনে পড়ছে, কি জানি কেমন আছেন উনি। কারণে অকারণে আমাকে চোখের সামনে দেখতে না পারলে মন খারাপ হয়ে যায়, তিনি আজ প্রায় ১০ দিন হয়ে গেল, আমাকে দেখতে পাননা। খুব কষ্ট হয় প্রান্তিক ভাই ওনার কথা ভাবলে? তাহলে চল, কাল আমরা চলেই যাই, বললাম আমি। আমারও তাই ইচ্ছে কিন্তু যদি প্রতীমকাকু কিছু মনে করেন। তা করতে পারেন। তাহলে?
তাহলে আর কিছু করার নেই। কালও থাকতে হবে। এই বদ্ধ ঘরে ভাল লাগে বল। অশ্রুকলার সংবাদ নেওয়ার জন্য মিনতি সেন অপেক্ষা করছেন। তিনিও নিশ্চয়ই ভাবছেন অনেক কিছু। আর জানতো প্রিয়জনের মন সব সময় খারাপটাই ভাবে। তারপর বললাম, চলনা এখান থেকে আমরা আমাদের গ্রাম থেকে ঘুরে আসি। আমাকে নিয়ে? কেন অসুবিধা আছে? কি পরিচয় দেবে? কেন তোমার যা পরিচয়। তুমিতো নতুন যাচ্ছ না। একটু হাসলো সেলিনা। নতুন যাচ্ছি না বলেই তো তোমার অস্বস্তি বাড়বে। কোন পরিচয়ই আমার দিতে পারবেনা। শুধু তোমার অসহায় রূপটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমায় দেখতে হবে। বুঝলাম না তোমার কথা। ও বলল, আচ্ছা, গ্রামে গিয়ে তোমার মনটা কোথায় ছিল বলতো? মানে? কেউ কি তোমায় কিছু বলেনি? কে কি বলবে। গ্রামের লোকেরা, তোমার বন্ধু বান্ধব, তোমার আত্মীয়স্বজন। আমি বললাম একটু ভালো করে বলতো সেলিনা। সত্যি আমি বুঝতে পারছি না। ও আমার কোন কথার কোন উত্তর না দিয়ে বলল, আমাদের যাওয়ার আগে, তোমাদের গ্রামে শুধু নয় তোমাদের বাড়ীতেও গিয়েছিল রেহানা, তাই না। আমার বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠলো। একথাতো ওর জানার কথা নয়? বললাম, রেহানা যদি আমাদের ওখানে গিয়ে থাকবে, তাহলে এখানে খুঁজতে এলাম কেন? সেলিনা বলল, এটা আমার উত্তর নয়। আসল প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল মাত্র। গিয়েছিল কি না তুমি হ্যাঁ, বা না বল। বললাম আমি জানি না ও বলল মিথ্যে কথা বলছ। বুঝতে পারছি সত্যি কথা এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। বললাম, জানি না আজ এতদিন পরে একথা জিজ্ঞাসা করছ কেন? তারপর বললাম হ্যাঁ একটা মেয়ে গিয়েছিল আমাদের গ্রামে শুধু নয়, আমাদের বাড়ীতেও। কিন্তু সে রেহানা কিনা আমার বাবা জানেন না। তিনি ভেবেছিলেন মাষ্টারমশায়ের কোন আত্মীয়া হবে। ওকে ভীষণ ভালো লেগেছিল আমার বাবার, তাই পরের দিন আবার মাষ্টারমশাইদের বাড়ীতে গিয়েছিলেন। কিন্তু তখন ও চলে গেছে। নিজের পরিচয় গোপন করেই যে গিয়েছিল। শুধু শেষবেলায় মাষ্টার মশাই জানতে চেয়েছিলেন, তুমি কেমা? কি তোমার আসল পরিচয়? বলেছিল আমি রেহানা কিন্তু তারপর সে যে ট্রেনের কোন কামরায় গিয়ে উঠলো মাষ্টারমশাই আর তাকে খুঁজে পাননি। তাই তিনি বাবাকে বলেছিলেন, আমি নিজেই তার ঠিকানা জানি
