আজ সেলিনাকে অস্বীকার করতে পারবো না কোন ভাবে। মোসলেউদ্দীন সাহেবের বাড়ীতে যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে আমাদের, তাতে কারো কোন হাত ছিল না। ঘটনা গুলো এমন ভাবে ঘটে গেছে যে তাকে আমরা আমাদের মত চালিত করতে পারিনি।
সেলিনা হয়তো হিন্দু নারীর সিঁথির সিঁদুরের মূল্য অতত বোঝেনা, কিন্তু আমিতো জানি, আপন পুরুষের হাতে একে দেওয়া ওই রক্তিম সিঁথি কত গরবিনী হতে পারে।
তাই মনে মনে ভাবছি, যদি সত্যি কথাটি বলি অবিশ্বাস হয়তো করবেনা, কিন্তু সবটুকু বিশ্বাস কি করতে পারবেন? কোন প্রশ্ন দেখা দেবেনা মনে? জানি মিনতি সেন হয়তো কিছুই ভাববেন না। কারণ কোন পুরুষের ভালবাসা জাগতিক ভাবে তিনি পাননি কোন দিন। কিন্তু এটাকি সত্যি? প্রতীমবাবুর ভালোবাসা কি তিনি হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেন না? যদি না করেন তাহলে এমন নির্লিপ্ত থাকেন কি করে।
পরে কোন এক সময় বুঝি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সেলিনা দরজায় একের পর এক করাঘাত করেই চলেছে। চোখ মুছতে মুছতে দরজা খুলে বললাম এত তাড়াতাড়ি চলে এলে? হ্যাঁ এলাম। কেন? না ভালো লাগছিল না। তাই এক সময় প্রতীমবাবুকে বললাম, কাকু আমি চলে যাব আমার একদম ভাল লাগছেনা। উনি বললেন, আমিও ভাবছিলাম, আকবরকে দিয়ে তোমাকে পাঠিয়ে দেব। প্রান্তিক একা আছে। ওকেও নিয়ে আসলে ভাল হতো। ও ভিতরে ঢুকলো। দেখলাম খুব হাসছে ও। আমি বললাম হাসছো যে, না এমনি, কাঁধের ব্যাগটা আমার বিছানায় ফেলে রেখে ও চলে গেলো নিজেব ঘরে। তারপর বাথকম থেকে যখন বেরোল একেবারে ফ্রেশ এবং নতুন পোষাকে সজ্জিত হয়ে, তখন অবাক হয়ে দেখলাম ওর সিঁথিতে যে সিঁদুরের রক্তিম দাগ ছিল তা আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেছে। ব্যাগটা যে ভাবে ছিল সেই ভাবেই পড়ে আছে। একবার ভেবেছিলাম হয়তো ইচ্ছে করে ফেলে গেছে, দেখা যাক না কি আছে ওর ভিতরে, কিন্তু তবু আজন্ম সংস্কার বাধা দিল। হাসতে হাসতে বেরিয়ে এল ও। একটা মানুষ কখনো রাগছে, কখনো অভিমান করছে, কখনো ভালবাসছে ভাবতেও অবাক লাগে। বললাম কি ব্যাপার কোন অলকাপুরীর সন্ধান পেলে নাকি? না তা পাইনি, তবে পাব মনে হয়। মুখে সেই মৃদু হাসি লেগে আছে যা মনকে ছুঁয়ে হৃদয়কে স্পর্শ করে। বলল, আমাকে কেমন লাগছে বলতো? ঠিক তোমার মত, বললাম আমি। ও রাগলোনা বলল, ভুল বললে। ভুল? হ্যাঁ ভুল, তুমি বলতে গিয়েও যা বলতে পারনি ঠিক তেমনি লাগছে আমাকে। তারপর বলল, জান সকালে যখন প্রতীমবাবুর সঙ্গে বেরিয়েছি, শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে যেতেই দেখি ফুলওয়ালী ফুল বিক্রী করছে রাস্তার পাশে বাজারে, প্রতীমবাবু বললেন আকবর গাড়ীটা থামাও তো। আকবর গাড়ী থামালেন। উনি বললেন, নাম সেলিনা। আমি নামলাম। ফুলওয়ালীকে বললেন, তোমার এই সমস্ত ফুল ও মালাগুলোর দাম কত? ফুলওয়ালী বললেন পঞ্চাশ টাকা। তিনি পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকা বের করে দিয়ে বললেন, সেলিনা সব থেকে ভাল মালা ও ফুলগুলো আলাদা করতে। আমি কিছু না ভেবে তাই করলাম। উনি বললেন ওগুলো তোমার ব্যাগে নাও। আমি অবাক হয়ে বললাম কেন? বা তোমার ভাল লেগেছে, তাই নিতে বলছি। কিন্তু এতফুল দিয়ে আমি কি করব। উনি বললেন, ফুল দিয়ে কি করব বলতে নেই সেলিনা, জীবনের পবিত্রতা খুঁজে নিতে হয় ফুলের পবিত্রতার মধ্যে। তারপর তাড়া লাগালেন চল। আমি বললাম ওগুলো। থাক, তারপর ফুলওয়ালীকে ওগুলো ফিরিয়ে দিয়ে বললেন এগুলো তোমাকে দিলাম। উঠে পড়লাম আমরা। রাস্তায় চলতে চলতে ভেবেছি সত্যিই তো উনি আমায় এত ফুল দিলেন কেন?
বললাম মিছিমিছি চিন্তা করছ? একটু ঠাট্টা করবার জন্য বললাম, আসলে তোমাকে নিয়ে বেরিয়েছেন এই বয়সে তো আর তোমাকে চকেলেট খাওয়াতে পারেনা। আর মূল্যবান কিছু দিতে গেলে সেতো অনেক খরচা। অথচ ফুল, সেতো সবার ক্ষেত্রে গ্রহণ করা ও যেমন সহজ দান করাও সহজ। খরচাও বেশী হল না অথচ পবিত্র করে এমন এক মূল্য তাকে দেওয়া হল এক রাতেই যা বাসী হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু কি আশ্চর্য সেলিনা এত বড় কঠিন কথাতেও রাগলনা। তেমনি হাসতে লাগলো। তারপর বলল নাগো মশাই না। আসলে ফুল যে আমার ভাল লাগে, ফুলের গয়নায় যে নিজেকে সাজাতে চাই যে ভাবে হোক তিনি তা জানতে পেরেছেন। তাইতো তিনি ফুলওয়ালীর সর্বোৎকৃষ্ট মালা ও ফুল আমাকে দিয়েছেন। তারপর আমার কাছে এসে বলল। দাওনা গো এই মালা ও ফুলে তোমার ইচ্ছে মতো আমায় সাজিয়ে, বলেই সে এগিয়ে এসে তার ব্যাগ খুলে সেই সব ফুল ও মালা বের করল। আমি বললাম সেলিনা। বল? আমি কি তোমায় সাজাতে পারব? যদি ঠিকমত না পারি?
ঠিক মতো তো তোমায় সাজাতে বলিনি, শুধু বলেছি তোমার মনের মতো সাজিয়ে দাও। তবুও ইতস্তত করছি দেখে বলল, কি গো, সাজাবেনা? সত্যি তুমি সাজবে আমার হাতে? ও আকুল ভাবে বলল, দাওনা সাজিয়ে। বললাম, এখন থাক সেলিনা। কারণ ফুলের সাজে সাজতে গেলে সব সময় সাজা যায় না। তারজন্য বিশেষ সময় আছে? তার মানে তোমার রাগ এখনো মেটেনি। আমি ঘাট মানছি, আমার অন্যায় হয়ে গেছে। তোমার অবাধ্য হবে না বলেও অবাধ্য হয়েছি। বললাম ছি কাল রাতের কথা আমার মনেই নেই। তবে আমাকে সাজাতে তোমার আপত্তি কোথায়?
সাজাব বন্ধু সাজাবো। সাজাবো তোমায় মনের মতন করে।
আসুক সন্ধ্যা আসুক আধার নেমে
শিশির সোহগে ভিজুক রুক্ষ মাটি।
পেলবতা পাক তপ্ত আকাশ রুদ্রের হুংকার
সাঁঝের আধারে মুছে যাক তটভূমি।
মাটির প্রদীপ জ্বেলে নিয়ে যদি তখন সাজতে চাও
সাজাবো তোমায় বন্ধু আমার মনের মতন করে।
