চলে এলাম ঘরে। আসার আগে প্রতীমবাবু বললেন। এঘর আরো একদিনের জন্য বুক করা আছে। ইচ্ছে করলে তোমরা আরো একদিন থেকে যেতে পারে। আপনি? না আমাকে কাল চলে যেতে হবে। তা হলে আমরাও চলে যাবো। বেশ তা হলে সকালে ব্রেকফাষ্ট করে বেরোবো কিন্তু। আচ্ছা।
ঘরে ঢুকেই আমি সেলিনাকে বললাম, দিন দিন তোমার কি হয়েছে বল? কেন? কেন মানে? আমি তোমার পিছনে লাগি? লাগই তো? কিরকম ভাবে? তুমি প্রতি মুহূর্তে আমাকে জ্বালাতন কর না? আমি তোমাকে জ্বালাতন করি? করই তো! কি ভাবে? নিজের কাছেই জিজ্ঞাসা কর কি ভাবে জ্বালাও। আমাকে বলছ কেন? বেশ আমি তোমার সাথে কোন কথাই বলব না। বেশ বলবেনা। আমিও বলব না।
ভীষণ রাগ হতে লাগলো ওর পরে। এমনিতে বুঝতেই পারছি না যে সমস্যার সৃষ্টি করা হয়েছে তার মীমাংসা হবে কি করে, কি ভাবে ওকে পরিচয় দেব? তায় উল্টো পাল্টা বলেই চলেছে।
আলোটা নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম, কিছুক্ষণ পরে ঘুমিয়ে পড়লাম। হঠাৎ কানে এলো, ঘরের আসবাব পত্র একবার টেনে এদিকে নিচ্ছেতো আরেকবার ওদিকে আর সেই শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। তখনো তাই করেই যাচ্ছে। আমি ভেজানো দরজা খুলে.ওর ঘরে গেলাম। বললাম এসব কি হচ্ছে সেলিনা। আমার ইচ্ছে তোমার কি? তোমার ইচ্ছে বলে কি, তুমি অন্যের বিঘ্ন ঘটাতে পার? আমিতো তোমাকে বিরক্ত করছিনা। না তা করছনা, তবে যা করছ তাতে আমি ঘুমাতে পারছি না। ঘুমাতে পারছনা তো জেগে থাকো, কে তোমাকে ঘুমাতে বলেছে। বা তুমি ঘুমাবে না বলেকি আমিও ঘুমাতে পারবো না। আমি তো না বলিনি। বললাম দেখ সেলিনা বড় ছেলেমানুষি হয়ে যাচ্ছে। এই হোটেলে আরো অনেকে আছেন। তারা কে কি ভাবছেন বলতো। তারা ভাবলে আমার উপরে ভাববে, তোমার উপরে তো ভাববেন না সুতরাং তোমার চিন্তা কিসের? আমি একটু জোরে বললাম তুমি এসব করতে পারো না? সিভিক সেন্স বলে একটা জিনিষ আছে। সেটা সকলেই তোমার কাছে আশা করতে পারে। কেউ আশা করল বলেই আমাকে তা দিতে হবে, এমন কোন মাথার দিব্যি আছে নাকি? না তোমার সঙ্গে আর পারা যাবে না। কে তোমাকে পারতে বলেছে? যাও ঘুমিয়ে পড়। আমার ঘুমের জন্য তোমাকে ভাবতে হবে না। তুমি এ ভাবে কথা বলছ কেন? তুমিই বা আমাকে এত রাতে বিরক্ত করছ কেন? আমি নিজেকে যথা সম্ভব সংযত রেখে বললাম সেলিনা, আমি যদি তোমায় বিরক্ত করে থাকি তার জন্য আমি ক্ষমা প্রার্থী, কিন্তু এবার ঘুমাও লক্ষ্মীটি। আমার যখন ঘুম আসবে আমি ঘুমাবো, তোমাকে বলতে হবে না। আমি জোর করে বললাম, না এত অবাধ্য তুমি হতে পারো না কেন? কেন আবার কি? তুমি যা ইচ্ছে তাই করতে পার নাকি? আমি যা ইচ্ছা করিনা কেন তাতে তোমার কি যায় আসে। আসে সেলিনা আসে, কারণ আমি তোমার স্বামী। ও এই কথায় চুপ করে গেল। আমি ওকে ধরে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলাম। ও কোন বাধা দিল না। কিন্তু ভিতরে ভিতরে যে ফুঁসছে বুঝতে পারছি। আমি নীরবে ওর কপালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম। এক সময় ও বলল, তুমি ঘুমোবে না? হ্যাঁ তুমি আগে ঘুমাও তারপর আমি ঘুমোবো। ও বলল, কাল কিন্তু আমি তোমার সঙ্গে যাবে না। যাবে না মানে কোথায় থাকবে? ভাবছি অশ্ৰুদির ওখানে চলে যাবো। কেন? হঠাৎ অশ্রুশার ওখানে কেন? আমার এখন তোমার সঙ্গে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছেনা। আমি বললাম বেশ তাই যেও কিন্তু এখন ঘুমাও। ও বলল, আমি ঘুমালে তুমি চলে যাবে নাতো! না যাবোনা। থাকবো তোমার কাছে।
কাল রাতেই সিদ্ধান্ত হয়েছে সকাল বেলায় চলে যেতে হবে। তাই সেই ভাবেই প্রস্তুত হচ্ছি। প্রতীমবাবু নক কবলেন। দরজা খুলে বেরিয়ে এসে বললাম হয়ে গেছে। উনি বললেন সেলিনা কোথায়? বাথরুমে। আচ্ছা ও বেরোলে ওকে নিয়ে এসো। উনি চলে গেলেন। সেলিনাকে বললাম প্রতীমবাবু তাড়া দিয়ে গেছেন। বেশী দেরি করোনা। একটু তাড়াতাড়ি করো। তুমি যাও আমি আসছি।
আমি প্রতীমবাবুব ঘরে আসার মিনিট দশেক পরে ও এলো। কাল রাতে যে ও ওই রকম ব্যবহার করেছে তার কোন চিহ্নই যেন নেই। প্রতীমবাবু বললেন। হঠাৎ কাজ পড়ে গেল, তাই আজও আমাব যাওয়া হবে না। তোমরাও বরং আজকের দিনটা থেকে যাও। মেদিনীপুর শহরটাকে তো দেখোনি। ভাল করে দেখে নাও। আমি আর কিছু বললাম না।
পড়াশুনার সত্যি ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু একটা জিনিষ পরিস্কার নিশ্চয়ই কোন উদ্দেশ্য আছে। এরপর উনি সেলিনাকে বললেন, তোমার যদি আমার সঙ্গে যেতে খারাপ না লাগে তাহলে চলনা আমার সঙ্গে ঘুরে আসবে। ও বলল কোথায়? কাছেই বেশ চলুন।
ভেবেছিলাম একবার জিজ্ঞাসা করি, আমি কি করব। কিন্তু কিছুই বলতে পারলামনা। ব্রেকফাষ্ট করে ওনারা বেরিয়ে পড়লেন। আকবর গেল ওদের সঙ্গে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কখন ফিরবেন? লাঞ্চের অর্ডার দিয়ে গেছি এসে খাব। সেলিনা আমার দিকে রক্তিম দৃষ্টিতে তাকিয়ে গাড়ীতে উঠলো।
নির্জন মুহূর্ত গুলোতে আমি একা। নিঃসঙ্গ মুহূর্ত আমার জীবনে খুব কম এসেছে। আর মানুষ যখন নির্জন মুহূর্ত একা কাটায়, তখন হয় অতীত তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, না হয় ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে ঘুমাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ঘুন এলো না। সকালের কাগজ এখানে একটু দেরিতে আসে। সেই কাগজও পড়া শেষ হয়ে গেছে, আজ দশ দিন নীলাঞ্জনা পিসিকে ছেড়ে এসেছি। এতদিন কেন, মাত্র কয়েকটা দিনও তাকে ছেড়ে থাকিনি কলকাতায় আসার পরে। ভীষণ ভাবে মনে পড়ছে নীলাঞ্জনা পিসিকে। মিনতি সেনকেও মনে পড়ছে। তবু নীলাঞ্জনা পিসির জন্য এক ধরনের অভাব অনুভূত হচ্ছে বারবার। একজনকে গভীর ভাবে ভালবেসেও কি পেলেন জীবনে। মিনতি সেনও পাননি কিছু। নীলাঞ্জনা পিসির জীবন একদিন সত্যি পূর্ণ ছিল, পরে একদিন সবশূণ্য। সেই শূন্যতা তিনি আমাকে আর সেলিনাকে নিয়ে পূর্ণ করতে চেয়েছিলেন। সেলিনা তার জীবনকে যে অর্থে ভরে দিয়েছে আমি তা পারিনি, তবু যে তিনি আমার জন্য ভাবেন, একথা আমি অস্বীকার করব কি করে?
