কি বুঝলো সেলিনা সেই জানে, আর জোর করল না। কিন্তু কথাও বলল না আমার সাথে। প্রায় ৮টা নাগাদ আমরা পৌঁছিয়ে গেলাম মেদিনীপুর হোটেলের ৪ নং ঘরে। নক করতেই বেরিয়ে এলেন প্রতীম চৌধুরী। সেলিনার দিকে একবার তাকিয়ে তাকালেন আমার দিকে, আর সেই অবকাশে পালিয়ে গেল সেলিনা। প্রতীমবাবু জিজ্ঞাসা করলেন উদ্ধার করতে পারলে কিছু? হা পেরেছি। রুকসানা নামের মেয়েটিই রেহানা। ও গিয়েছিল ওখানে। বেশ বেশ আর বলতে হবে না। বাকীটা আমি বুঝে নেবো। বরং এই বেলা হাতে মুখে জল দিয়ে ফ্রেস হয়ে এস।
আধ ঘন্টার মধ্যে এলাম তার ঘরে। সেলিনা বাথরুমে গিয়ে ভাল করে চোখেমুখে সাবান দিয়েছে। তারপর ভাজহীন নতুন শাড়ী পরেছে সিঁথি না করে চুলটাকে উল্টে করে আঁচড়ে বেঁধেছে বেনী। চাপা পড়ে গেছে সিঁথির সিঁদুর। তবে তা সে মোছেনি। খুব ভালো করে না তাকালে বোঝা যায় না সিঁথিতে সিঁদুর আছে কি না। আমিও নতুন করে পরেছি পাজামা পাঞ্জাবি। এলাম প্রতীমবাবুর ঘরে।
ডিনার দিয়েছে। খেতে খেতে প্রতীমবাবু জেনে নিলেন মোসলেউদ্দীন সাহেবের ওখানকার সব ঘটনা। তারপর একথা সে কথার পরে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন এবারতো তুমি এম এ ফাঁইনাল দেবে তাই না? হ্যাঁ। তোমার পরীক্ষা কবে? বললাম, আর মাস দুয়েক আছে। খুব ভাল কথা, তা তুমিতো আমাদের ওখানে পরীক্ষায় বসবার জন্য দরখাস্ত করে ছিলে, বসবে নাকি পরীক্ষায়। ভাবছি। ভাবছ মানে? মানে পিসি ও মাকে একবার জিজ্ঞাসা করতে হবে। উনি আর কথা না বাড়িয়ে বললেন তাই কর। একটা কথা প্রান্তিক, যদি শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দাও আর চাকরিটা হয়, করবে তো? কেন বলুন তো। না ভট্টাচাজ সাহেব বলেছিলেন, কোন একটা কোম্পানী থেকে তুমি নিয়োগ পত্র পেয়ে গেছে তাই আর কি? আমি জানতামনা, কোন নিয়োগ পত্র এসেছে কি না। সেই বহুদিন আগে মিনতি সেন একবার ওনাকে আমার চাকরির কথা বলেছিলেন হয়তো সেটাই হবে। ভট্টাচাজ সাহেব কথা রেখেছেন, আমি বললাম, একটা কিছুতো করতেই হবে। তবে এখনি আমার পক্ষ্যে জয়েন করা কোথাও সম্ভব নয় সামনে পরীক্ষা। প্রতীমবাবু বললেন ভটাচাজ সাহেব নিশ্চয়ই তা জানেন, তাইতো তোমাকে পরীক্ষা শেষে জয়েন করতে বলা হয়েছে।
সেলিনা চুপ চাপ আমাদের কথা শুনছিল, স্বভাব কি ভাবে নিজেকে এর মধ্যে জড়ায়নি একবারও। আমি প্রতীম বাবুকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি বলেন? উনি বললেন কি ভাবে জিজ্ঞাসা করছ? একজন সত্যি কারের বন্ধুর উপদেশ চাইছে না কর্ম জীবনের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য কোনটা ভাল জানতে চাইছে? দুটোই। তাহলে তুমি ভট্টাচাজ সাহেবের অফারটা গ্রহণ কর কোন দ্বিধা না রেখে। একটু হতাশ হলাম, ভেবেছিলাম, তিনি হয়তো বলবেন, তার কোম্পানীর ভবিষ্যত উজ্জ্বল। হতাশ যে হয়েছি তার প্রকাশ আমার চোখে মুখেও বিকশিত হয়েছিল, এই প্রথম তাকিয়ে দেখি সেলিনা মিটি মিটি হাসছে। বললাম তুমি হাসছো যে। সেলিনা যেন সেই পুরোনো সেলিনা। বলল বা চাইলে এক, হল আর এক, হাসবো না? তোমার হতাশা দেখে না আমার ভীষণ করুণা হচ্ছে তোমার ওপর। তারপর প্রতীমবাবুর দিকে তাকিয়ে বললে, আচ্ছা কাকু ওর চাকরিটা আমাকে দেওয়া যায় না? এমন সরাসরি তার উপস্থিতিতে কাউকে আঘাত দেওয়া যায় এ বোধ হয় তিনি ভাবেন নি কোন দিন। আর তা ছাড়া একজনের চাকরি তাকে দেওয়া যায় কিনা, এর ভিতর দাবী না অধিকার কোনটা আছে বুঝতে পারেন না প্রতীমবাবু। তার থেকে আরো অবাক হয়ে যান, প্রান্তিক যেখানে বহুবার এসেও যাকে কোন সন্মোধন পর্যন্ত করতে পারেনি, এ মেয়ে সেখানে অনায়াসে কাকু বলে তাকে আপনার করে নিতে পারল। প্রতীমবাবু বললেন, তুমি চাকবি করবে? বাঃ সবার বাঁচার অধিকার আছে আমার নেই? হেসে ফেললেন প্রতীমবাবু। না তোমার সঙ্গে পারবো না। তা তুমি চাকরি করতে চাইছো কেন? ওরা চাকরি করছে কেন? ওরা মানে কারা? ওরা মানে অশ্রুদি, প্রান্তিক ভাই? তোমার কথা ঠিক হল না সেলিনা। অশ্রু করছে, কিন্তু প্রান্তিকতো এখনো করেনি। ওই একই হল আজকে না করলেও কালকে তো করবে। তা হলে তুমি কি বল ওরা চাকরি করবে না? কে খাওয়াবে ওদের? কেন মিনতি পিসি? আবার সেই ভুলে যাওয়া অতীত স্মৃতি। প্রতীমবাবু বুঝতে পারেন। এ মেয়ের মনে ভালবাসার জটিলতা ছাড়া আর কোন জটিলতা নেই। যদি থাকতো তাহলে অন্তত ওনামটা উচ্চারণ করতো না। কথা বাড়ালে গতি কোন দিকে যাবে বুঝতে না পেরে চুপ করলেন প্রতীমবাবু। তারপর বললেন তোমার একটা চাকরির দরকার তাইতো। সামান্য হেসে বললেন, আজকে যদি দিই কাল জয়েন করতে পারবে? অবাক হয়ে গেল সেলিনা, বলেন কি ইনি, কি যে উত্তর দেবে বুঝতে না পেরে মনের অবস্থা সঙ্গিন। এবার জোরে হেসে বললেন প্রতীমবাবু, কি হল মা? তোমারও কি প্রান্তিকের মতন অবস্থা, কাউকে না কাউকে জিজ্ঞাসা করতে হবে, তাইতো। কিন্তু না, বুঝেছি মা! একটু আগে বলেছিলে না অদির চাকরির দরকার হল কেন? মানুষের জীবনে এমন এমন মুহূর্ত আসে, তখন তার কাছে ওটা ভীষণ জরুরী। অশ্রুর কাছেও তাই ছিল। সে রকম যদি প্রয়োজন মনে করি, তোমাকে কিছু বলতে হবে না, আমি নিজেই তোমাকে ডেকে নেবো। তারপর হেসে বললেন, পথে আসতে আসতে কি প্রান্তিকের সঙ্গে ঝগড়া করেছে নাকি? করেছি তো। কেন? সব সময় আমার পিছনে লাগে তাই, প্রতীমবাবু শুধু হাসলেন। সেলিনা বলল, আপনি শুধু হাসলেন কাকু, ওকে কিছু বললেন না। হা হা বলব, তারপর সত্যিই আমাকে বললেন, দেখ প্রান্তিক নিশ্চয়ই ওকে তুমি একদমই বোঝার চেষ্টা করো না। এটা তোমার ঠিক নয়। অযথা ওর পিছনে লেগে না। আমি মুখে কিছুটা লজ্জা এনে, বললাম তাই হবে।
