ও আর দাঁড়ালো না। চাচীর ঘরে গিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে বেরিয়ে এলো। সাজাতে গিয়ে চাচী ওর সিঁথিতে সিন্দুর পরিয়ে দিতে গেলে সেলিনা বাধা দিয়ে বলে, থাক না চাচী, রেখে দাও ওটা তোমার কাছে। আবার যেদিন আসবো, নিজের মতো সাজিয়ে দিও। সেকি কথা মা, এটাতো হিন্দু স্ত্রীর অলংকার, হাতে এযযাতিব চিহ্ন লোহা আব সিঁথিতে সিন্দুর এ হলে হিন্দু স্ত্রীকে মানায় না। বাধ্য হয়ে পরতে হয়। পরতে হয় চাচীর দেওয়া লাল শাড়ী।
বেরিয়ে এসে প্রণাম করে মোসলেউদ্দীন সাহেবকে, বলে কই চাচা আশীর্বাদ করলেন। বৃদ্ধ বললেন আল্লাহ তোমাকে দীর্ঘজীবী করুক বেটি, আর স্বামীর গরবে গরবিনি হও। তারপর তার পকেট থেকে একটা সোনার চেন বের করে বল্লেন, গরীব চাচার এই সামান্য উপহারকে কোন অজুহাতে ফিরিয়ে দিও না মা। সেলিনা হাটু গেড়ে নীচু হয়ে বসে বলে পরিয়ে দিন চাচা। এ যে আমার মঙ্গল সুত্র, আমার বাবার আশীর্বাদ। একে কি অস্বীকার করতে পারি? বৃদ্ধ চোখের জলে পরিয়ে দিলেন সেই সোনার চেনটি সেলিনার গলায়। দাম হয়তো বেশী নয় কিন্তু এর মানবিক মূল্যতো পয়সা দিয়ে কেনা যায়না। আমি প্রনাম করতে গেলে আমাকেও দেন উপহার ধুতি ও পাঞ্জাবি। বললেন তুমি ঐ জামা প্যান্ট হৈছে এটা যদি পর বাবা, মনে করব আমার সব অভাব পূর্ণ হয়ে গেছে। সেলিনা যেমন ওদের আঘাত দিতে পারলো না, আমিও বুঝি পারলাম না, ভিতরে গিয়ে জামা প্যান্ট খুলে পরে নিলাম ধুতি আর পাঞ্জাবি।
বেরিয়ে যখন আসছি, আমাদের সঙ্গে অনেক দূর এলেন। সেই যেখানে গাড়ী রাখা হয়েছে। আমরা গাড়ীতে উঠলে বৃদ্ধ বললেন, কোন অধিকার বলে তোমাদের আসতে বলব জানিনা বাবা, তবু যদি কখনো আমাদের কথা মনে পড়ে, আসতে ভুল করো না।
গাড়ী ছেড়ে দিল। যতক্ষণ দেখা যায়, দেখলাম সজল চোখে তাকিয়ে আছেন বৃদ্ধ মোসলেউদ্দীন এবং মনোয়ারা বেগম।
জীবন কি ভাবে এগিয়ে যাবে, কেউ বোধ হয় তা আগাম বলতে পারে না। কোথায় যে তার বাঁধন আছে কে বলতে পারে। জনপদ ছেড়ে গাড়ী হু হু করে এগিয়ে চলেছে। দুই পাশে সবুজ মাঠের বুক চিরে মসৃণ রাস্তা দিয়ে। সেলিনা চুপ করে আছে। আনন্দে বুঝি ভরে গেছে বুক, তাই বাহুল্য কথা বলে সে আনন্দকে ব্যর্থ করে দিতে চায় না ও। এক সময় নিজের অজান্তে তার একখানা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে আমিও চুপ করে রইলাম।
সবুজ প্রান্তরে নামে অন্ধকার। সেলিনা তার মাথাটা নামিয়ে নিয়ে আসে আমার কাঁধের ওপরে। বললাম শরীর খারাপ লাগছে? বলল না। তা হলে কি ভাবছো? বলতে পারব না। আমিও বলতে পারবনা সেলিনা আমি কি ভাবছি! আমি জানি তুমি কি ভাবছো? কি? ভারি বোঝা নামাবে কি করে তাইতো। দেখ সেলিনা জীবনের অভিজ্ঞতা খুব বেশী নয়। কিন্তু আমার ছোট্ট জীবনে যা পেয়েছি, তার কোন তুলনা হয় না। শুধু আমাকে ছাড়া, আস্তে বলল সেলিনা। তারপর কাঁধ থেকে মাথাটা তুলে নিয়ে বলল পকেটে রুমাল আছে? হ্যাঁ আছে। তাহলে দাওনা সিঁথির সিঁদুরটা মুছে! আমি কণ্ঠে যত আবেগ আনা সম্ভব, তাই এনে বললাম সেলিনা! ও বলল, জানি তুমি কি বলবে, তবু এ হয় না। এই সাজে আমি কারো সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারবনা। কি বলব প্রতীমবাবুকে? কি বলব মা ও মিনতি পিসিকে।
বললাম, কাউকে কিছু বলতে হবে না সেলিনা, যাদের যা বোঝার তা তারা নিজেরাই বুঝবেন। আমি নিজ হাতে তোমাকে সিঁদুর পরিয়েছি। কি করে তা মুছে দেব? তুমিতো ইচ্ছে করে পরাওনি। সিচুয়েশান তোমাকে বাধ্য করেছিল। যতই বাধ্য করুক আমার ইচ্ছে না থাকলে পরাতে পারতাম? আমি জানিনা, তুমি মুছে দাও। পিরবো না সেলিনা, কিছুতেই পিরবো না। ও বেশ জোরে বলল আমিও পারবনা, কিছুতেই পারবনা এই সাজে প্রতীমবাবুর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে। তা হলে কি করবে? তুমি যদি না মুছে দাও আমি নিজেই মুছে দেবো। তার মানে তোমার অহংকারের সাথে আমাকে মানিয়ে নিতে পারছনা তাইতো। না গো তা নয়। আমার অহংকার তো তুমি এমন করে তোমাকে পাবো ভাবিনি কোনদিন। ভাবনা যখন বাস্তব, তখনো তুমি তাকে অস্বীকার করবে? যদি পারতাম তোমাকে বুক চিরে দেখাতাম কি আছে এখানে, তবু আমায় অনুমতি দাও, এটাকে মুছে ফেলার। যদি না দিই। আমাকে কাঁদাবে তুমি? ঝর ঝর করে শব্দহীন কেঁদে ফেলল সেলিনা। আমি ওর চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললাম, জানিনা কেন মুছে দিতে চাইছে, যে রূপ তোমার আসল রূপ তাকে মুছে দিয়ে কি চাইবে আমার কাছে? জানিনা কি চাইবো? বল না। কথা দাও নারীর সর্বোত্তম অধিকার থেকে তুমি আমায় বঞ্চিত করবে না। আমি বললাম, নারীর সেই সববাত্তম অধিকার কি? ও লাজুক দৃষ্টি হেনে বলল, তার মাতৃত্ব। আমি বললাম সেলিনা কল্পনাকে তুমি কোথায় নিয়ে চলেছে। নারীত্বের শেষ ঠিকানায়। তারপর একটু খানি চুপ করে থেকে বলল এবার তুমি মুছে দাও লক্ষ্মীটি।
বুঝতে পারছি কেন বারবার ও সিঁথির সিঁদুর মুছে ফেলতে চাইছে। ওতো জানে না হিন্দু নারীর কাছে এই সিঁদুরের মূল্য কত অমূল্য। বললাম, খেয়ালে পরেছো তুমি তাই তুমি ভাবতে পারছ এ বুঝি মুছে দেওয়া যায় সহজে। কিন্তু আজন্ম সংস্কারে লালিত কোন হিন্দু নারীর পক্ষে এযে কত বড় পাপ, তা তুমি ভাবতেও পারবেনা। পাপ? পাপ নয়? জান হিন্দু নারী এক ফোঁটা সিঁথির সিঁদুরকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্য করতে পার না এমন কিছু নেই। হিন্দু স্বামী যতবড় নিষ্ঠুরই হোক না কেন তার স্ত্রীর সিঁথির সিঁদুর কোন ভাবেই মুছে দিতে পারে না।
