দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পরে আবাব বিশ্রাম নিতে এলাম সেই ঘরে, যেখানে কালকের রাত কাটিয়েছি প্রহর গুনে। সেলিনা আসেনি, আমি একাই এসেছি, শুয়ে শুয়ে ভাবছি জীবনের এই কয়েকটা দিন। সেইতো দিন সাত আট আগে অশ্রুকণাকে এগিয়ে দিতে এসেছিলাম। আর আজ সেই মেদিনীপুরেরই আর একটা গ্রামে যে মেদিনীপুর কেড়ে নিয়েছে আমার প্রথম যৌবনের স্বপ্ন-ভালবাসা, আমার প্রেম, আমার অনুভূতি ও উপলব্ধি, সেইই আবার দুহাত ভরে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছে জীবনের সব অপূর্ণতা। তবু অমি নিতে পারছি না কেন? কোথায় আমার অসুবিধা? এখানে এসে আবিষ্কার করেছি রেহানাকে নতুন ভাবে। যে রেহানা একদিন ডালিমকে ভালবাসা দিতে চেয়েছিল সেই রেহানা মাঝের দিনগুলোকে ভুলে নতুন করে ডালিমকে বাঁচার স্বপ্ন দেখাতে এসেছিল। যাকে জীবনে কোন দিন অন্যভাবে ভাবিনি। তাকে আজ নতুন করে ভাবছি কেন? কেন মনে হচ্ছে রেহানা আসেনি কোনদিন আমার কাছে পরিপূর্ণ রেহানা হয়ে। একি আমার পাপ? ওকে তো জীবনের সবটুকু দিয়ে ভালবেসে ছিলাম, তবে কেন সে ফাঁকি দিয়ে গেল। যদি ডালিমের জন্য তার মনে কোন দুর্বলতা থাকেও তবুও আমি তো তাকে অস্বীকার করতাম না। তাহলে সে নিজেকে প্রকাশ করতে পারলো না কেন আমার কাছে। ডালিমকে বলেছে আমি তার গুরু। এটাইকি সত্য? গুরু শিষ্যের সম্পর্কের আবরণ উন্মোচন করে সেকি আমার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে চেয়েছে? একবার হে ঈশ্বর তুমি শুধু একবার ওর সঙ্গে আমার দেখা করিয়ে দাও।
মোসলেউদ্দীন সাহেব বললেন, রেহানা ফিরে এলে আমি তাকে কি ভাবে গ্রহণ করব। মিনতি সেন চেয়েছিলেন আমার জীবনে রেহানাই যেন আসে, তার অবর্তমানে অশ্রুকণাকে এগিয়ে দিতে চেয়েছেন আমার কাছে। সেলিনার জন্য অনুভূতি থাকা সত্ত্বেও সেলিনার জন্য ভাবেননি, আবার নীলাঞ্জনা পিসি রেহানার ভালোবাসকে মর্যাদা দিয়েও চেয়েছেন সেলিনাই যেন আসে আমার জীবনে। একসময় আফরোজ বেগম ও তাই চেয়েছিলেন। যদিও মৃত্যু শয্যায় তিনি অন্য রকম বলেছিলেন, তপতী ও অশ্রুকণার অনুভূতিতে রেহানা নয়, সেলিনাই আসতে চেয়েছে তার সবটুকু দাবী নিয়ে। যদিও এসব তারা মনে করেছে যদি রেহানা ফিরে না আসে। তপতীর মনে একদিন যাইই থাকুকনা কেন, আজ সে নতুন ভাবে বাঁচবার পথের সন্ধান পেয়েছে। তার জন্য বেশী ভাবনা হয় না। কিন্তু অশ্রুকণা? সেইতো এসেছিল জীবনে প্রথম প্রেমের ডালি নিয়ে। তারপর সাড়া না পেয়ে আস্তে আস্তে রেহানার জন্য সরে গিয়েছিল সে। কিন্তু তার অবর্তমানে আবার যে সে আসতে চেয়েছিল–জীবনের চরম জটিল মুহূর্তে। কিন্তু তাই বলে সে এমন কিছু করতে চায়না, যাতে সেলিনা আঘাত পেতে পারে। আমার কাছ থেকে বিন্দু মাত্র সাড়া পেলে কি হতে জানিনা। কিন্তু পারলাম না ধরা দিতে। কিন্তু এটাই কি সত্যি? কেন ওর জন্য মনটা হু হু করে কেঁদে ওঠে মাঝে মাঝে। কেন এক নিঃসঙ্গ জীবন বেছে নিতে চায় সে, কিসের প্রতীক্ষায়?
আর সেলিনা? সব নারীর স্বপ্নে বেঁচে থাকে কারো বধু হওয়ার আকাঙ্খ। তারই কি পূর্ণতা পেল এখানে? প্রথম দিন থেকেই বুঝিনি তাকে। কি সহজ আর স্বাভাবিক, প্রথম যেদিন স্কুল থেকে ফিরতে গিয়ে আমাকে ডেকেছিল। তারপর হাঁটতে হাঁটতে সেই ক্যান্টিন, তার উচ্ছলতা। নিজেকে প্রকাশ করার স্বাভাবিকতা, আজ অস্বীকার করতে চাইনা যে তা আমাকে আকর্ষণ করেছিল তীব্র ভাবে। ভাললাগার সম্মোহনী মোহে তাকে বুঝি ভালবেসে ফেলেছিলাম। তার মনে কি ছিল জানি না। কিন্তু আমি যখন তার দিকে এগিয়ে যেতে চেয়েছি, তখনি সে আমাকে এগিয়ে দিয়েছে রেহানার দিকে। আর এমনি করে কবে যেন নিজের অজান্তেই নিজেকে একবার করে দিয়েছি রেহানার সঙ্গে। তবু কি অস্বীকার করতে পারবো এই মন বারবার চেয়েছে সেলিনাকে, আর আমার সেই দুর্বল অনুভূতির কথা বুঝি সবার থেকে ভাল বোঝে সেলিনা। তাই নির্জন হাসপাতলের কেবিনে তার তীব্র অভিমান, আর অসম্ভব অধিকার বোধ, তার চোখের জল, তার মনের দ্বন্দ্ব সব কিছুই আমাকে প্রতি মুহূর্তে ভাবিয়েছে। কিন্তু কখনো মনে করিনি, সেলিনা ভিতরে ভিতরে এত দুর্বল হয়ে গেছে। কি আছে ওর মধ্যে, যে চৌম্বক শক্তি, আমার দিকে ধাবিত হয়ে আঘাতে আঘাতে খান খান করে দিতে চায় আমার অস্তিত্ব।
এসব ভাবতে ভাবতে কখন বুঝি আধো ঘুম নেমে এসেছিল চোখে। আবছা দেখতে পাচ্ছি, রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ করে সেলিনা এসেছে আমার ঘরে। তারপর ড্রেসিং আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সারা দিনের ক্লান্তিকর পোষাক গুলিকে ছেড়ে রাতের পোষাকে নিজেকে সাজাচ্ছে। এক বেনী চুল বাধা আমার পছন্দ। তাই এলো খোপ খুলে, বাঁধছে এক বেনী চুল। সামনের ফুলদানী থেকে তুলে নিয়েছে গোলাপ। তারপর খুঁজেছে বেনীর গোড়ায়। ঠোঁটে আলতো লিপষ্টিক বোলাতে বোলাতে হঠাৎ বলে উঠলো দুষ্টু কোথাকার। শুধু ভিতরের জামাটা পরে ব্লাউজের বোতাম আটকাতে আটকাতে, কি মনে করে, না আটকিয়েই, রাতের লাল রঙের হালকা শাড়িটা তুলে নিলো কোমরে, আঁচল ভাজ দিয়ে রাখল তা কাঁধের উপর। তারপর আস্তে আস্তে এগিয়ে এলো আমার দিকে।
হঠাৎ ভেজানো দরজা খোলার শব্দে চোখ মেলে তাকালাম, ও দরজাটা নিঃশব্দে ভেজিয়ে দিয়ে বলল এতক্ষণ জেগে জেগে কার কথা ভাবছিলে? বলতো কার কথা? হাসতে হাসতে সেলিনা বলল ইদানীং তো দেখছি শয়নে স্বপনে তুমি একজনের কথা ভাবো, নিশ্চয়ই তার কথা ভাবছো? বলতো কে? যে তোমার চিরকালের শত্রু নিশ্চয়ই তাকে। ও সব হেঁয়ালি করে চটপট বলে ফেলতে নামটা। আমি বলব কেন? তুমিই বলনা। বেশ তাহলে কাছে এসো। আমি শুনতে পাচ্ছি এখান থেকেই। দুর ছাই, এতদূর থেকে বলা যায় নাকি। কাছে এগিয়ে এসোনা? ও আস্তে আস্তে এগিয়ে এলো আমার কাছে। আমি ওর একটা হাত নাগালের মধ্যে পেতেই জোরে টেনে নিয়ে এলাম একেবারে আমার বুকের পরে, তারপর তার কানের কাছে মুখটা নিয়ে বললাম, যে মেয়ের প্রতীক্ষায় আর একটা নিকষ কালো অন্ধকার রাতের প্রহর গুনছি, তার কথা ভাবছিলাম। ও বলল যাঃ। আমি বললাম আজ যাব না সেলিনা, চাচীকে বলে দাও। ও জোর করে উঠে পড়ল আমার বুক থেকে। বলল, আকবর চলে গেছে গাড়ীতে। আমারও গোছানো শেষ। এখন বলছ যাবে না, তা হবে না, আত্মমর্যাদাকে বিলিয়ে দিয়ে থাকতে পারবো না। আমি তোমাকে বলতে এসেছিলাম তাড়াতাড়ি উঠে প্রস্তুত হওয়ার জন্য। চাচা অপেক্ষা করছে তোমার জন্য। আমি হতাশ হয়ে বললাম, সত্যি আরেকটা রাত থেকে গেলে খুব অসুবিধা হবে? তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গছে! না এক রাতের শাস্তিতে মন ভরেনি! আরো শাস্তি দিতে চাও। আমি তোমাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য বলছি? তা ছাড়া আবার কি? কি ভাবে আমার রাত কেটেছে জানো? আমি গম্ভীর হয়ে বললাম, না জানতে চাইনা। তুমি প্রস্তুত? হ্যাঁ প্রস্তুত। তাহলে চল আমিও প্রস্তুত।
