একটু থেমে বলল বুঝতে পারছি প্রান্তিক ভাই, ডালিমের কথা বলা আমার উচিৎ হয়নি। কিন্তু উনি বললেন, থাক ওর কথা মা, আল্লহ কাকেও ক্ষমা করেন না, ওকেও করেননি। রোজ কিয়ামত বলে সত্যি যদি কিছু থাকে তবে তার পাপ পূণ্যের বিচার হবে সে দিন। বিকালে ওঁর সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে চলে গেলাম পাশের গ্রামে। উনি এক বাড়ীতে ঢুকে গেলেন আমাকে নিয়ে। ওঁরা আমাকে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন এ কে? চাচী নিৰ্ধিকার ভাবে বললেন, আমার এক মেয়ে? ওরা অবাক হয়ে বললেন তোমার মেয়ে? না সে ভাবে আমার মেয়ে নয় আমার এক আত্মীয়া। কলকাতায় থাকে, বেড়াতে এসেছে ওর বরকে নিয়ে। তাকেও নিয়ে এলেনা কেন? ওরা এই বেলা চলে যাবে বলেছিল, আমি জোর করে ধরে বেখেছি
একদিন। এরপরে যখন আসবে নিয়ে আসব। তা কোহিনুর কোথায়? ভদ্রমহিলা বললেন, কদিন থেকে পাগলামিটা আবার বেড়েছে। ঘরে শিকল দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে? আল্লাহর যে কি অবিচার, যার জন্য ওর আজ এই অবস্থা সেই যখন নেই, একেও তো নিয়ে যেতে পারে শেষ বিচারের অপেক্ষায়। আমি আঁতকে উঠে বললাম শিকল দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে? চাচী বললেন হা মা, মাঝে মাঝে ওকে শিকল দিতে হয়। কে উনি? ডালিমের স্ত্রী। মানে? মানে আর কিছু নয় মেয়ে। তোমাদের মত ফুটফুটে আর সুন্দর ছটফটে ছিল মেয়েটি। লেখা পড়ায়ও ভাল ছিল। তোমার চাচা ওকে পছন্দ করে ডালিমের সঙ্গে বিয়ে দিলেন। ডালিমেরও পছন্দ ছিল। ও যদি কলকাতায় না যেতো হয়তো ওকে নিয়েই ঘর সংসার করতো। কিন্তু ওখানে গিয়ে কি যে হল! থাক সে কথা, একদিন ডালিমের কয়েকজন বন্ধু ওর প্রতি অত্যাচার করে। অবশ্যি সেই সময় ডালিম ছিল না। তাই বলে,অন্যায় থেকে তো মুক্তি পেতে পারে না। না মা আর বেশী কিছু জানতে চেওনা। তোমার দিদি বোধ হয় এসব জানতোনা, তাই তাকে ভাল হতে বলেছিল। হয়তো একদিন ভালও বেসেছিল বলে, কিন্তু যাকে শুধু ঘৃণাই করা যায়, তাকে কি করে ভালবাসবে? চল ওকে দেখাবো তোমাকে। বললাম না চাচী থাক। থাকবে কেন? যদি তোমার দিদির খোঁজ কোনদিন পাওয়া যায় তারতো ব্যাপারটা জানতে হবে। জানার কি খুব প্রয়োজন চাচী? অবশ্য প্রয়োজন, এতটা জঘন্য প্রকৃতির ছেলের জন্য একটা ফুলের মত জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। মা হয়ে তা মেনে নিতে পারবো না। বুঝতে পারছি প্রান্তিক ভাই কি গভীর বেদনায় উচ্চারিত এই কথাগুলো। আমাকে তাড়া লাগিয়ে বললেন, চল দেখব ওকে। .
চাবিখুলে ভিতরে ঢুকলাম আমরা। শান্ত মেয়েটি আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু হাতে পায়ে শিকল। কি করুণ সে তাকানো আর দেখতেও সত্যিই ভাল। চাচী বললেন কেমন আছ বৌমা। ও চুপ করে রইল। আপন মনে কি যেন বলতে লাগল। আমি বললাম ওর হৃত পায়ের শিকল খুলে দাওনা চাচী। বললেন না থাক, এবার চল। আমরা যখন চলে আসব, চাচীর শাড়ীর আঁচল ধরে টান দিল মেয়েটি। চাচী বললেন, কিছু বলবে বৌমা। চোখের ইশারায় কি যেন বলল, কলকাতা থেকে এসেছে, হ্যাঁ, সঙ্গে ওর বর আছে। হ্যাঁ নিয়ে আসব একদিন। তুমি তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে ওঠ।
১৬. ফিরে আসার সময়
ফিরে আসার সময় জিজ্ঞাসা করলাম, তোমরা ওকে বৌমা বল কেন? বা তবে কি বলব, ডালিমের সাথেতো ওর একদিন বিয়ে হয়েছিল। আমি আর কোন কথা বলি না। ফিরে এলাম বাড়ীতে।
এবার বল প্রান্তিক ভাই, আমি কি করব? চাচী যা দিয়েছেন ইচ্ছে করলে তুমি তা এক এক করে খুলে নিতে পার আমার অঙ্গ থেকে। বললাম ভালবাসার দান খুলতে নেই সেলিনা। মিথ্যে জেনেও? উনিতো মিথ্যে জানেন না। সেলিনা বলল কিন্তু তুমি?
আমি বললাম রাত বুঝি শেষ হয়ে আসছে এবার ঘুমাও। তুমি ঘুমাবেনা? হ্যাঁ ঘুমাবো, আগে তুমি ঘুমোও। তবে তুমিও এস। ও আমাকে হাত ধরে নিয়ে এল বিছানায়, তারপর মনোয়ারা বেগমের সাজানো বিছানায় আমাকে শুইয়ে দিয়ে বলল, সত্যি কি ঘুম পাচ্ছে? কি বললে সুখী হবে তুমি? যদি আমাকে তুমি তোমার ঘুম পাড়ানোর গানের অধিকার দাও। তবে তাই দিলাম।
তাই বলে সেলিনার গানের প্রয়োজন হয়নি মাথায় হাত ছোঁয়াতেই ঘুমিয়ে গেলাম। পাশে ও ছিল কিনা জানিনা। কে যেন দরজায় মৃদু আঘাত করছে। চোখ মেলে দেখি সেলিনা নির্বিঘ্নে ঘুমাচ্ছে নীচের খালি মেঝেয়। আমি ওকে আস্তে কানে কানে ডাকলাম। চাচী মনে হয় ডাকছেন। ও ধড়মড় করে উঠে পড়ল। তারপর নিজের পোষাকের দিকে তাকিয়ে নিজের হাতে ইচ্ছে করে শাড়ীর বিভিন্ন অংশ কুঁচকে দিল। এগিয়ে এসে আমার জামাটা এলো মেলো করে ভাজ ফেলে দিল। সিঁথির সিঁদুর দিল লেপটে। তারপর বিছানার চাদর দলমচা করে আবার তাকে স্বাবাবিক করে রাখল। খোঁপাটা খুলে গেছে কখন যেন। এমনি ভাবে ইচ্ছে করে খুলে দিয়ে এলোমেলো করে হাই তুলে দরজার কাছে গিয়ে বলল কে? আমি চাচী, দরজা খোল মা? সেলিনা দরজা খুলেতেই এক পলক তাকিয়ে মাথায় ঘোমটা তুলে দিয়ে বলল নাস্তা হয়েছে। তোমার চাচা ও আকবর বসে আছে, সেলিনা বলল, ওনাদের খেয়ে নিতে বল চাচী। আমার একটু দেরি হবে। স্নান না করে কিছু খেতে পারবনা।
দরজাটা বন্ধ করে কাছে এসে দাঁড়ালো ও। তখনো বুকের খাঁজের এক পাশ রয়েছে শাড়ীর ভাঁজে, কোমরে আধ খোলা শাড়ী গোজা। চুল নিজের হাতে করা এলোমেলো। পলকহীন তাকিয়ে আছি ওর দিকে। হঠাৎ নিজের দিকে তাকিয়ে শাড়ীর আঁচলটা পরিপাটি করে তুলে দিল কাঁধের উপরে। লজ্জায় আনত হয়ে বলল কি দেখছো অমন করে? তোমাকে, কি বিচিত্র তোমার রূপ। আমি অবাক হয়ে ভাবছি আমার ভালবাসা কি তোমাতেই পাবে তার ঠিকানা? দুষ্টুমি করছ না ঠাট্টা। দুটোতেই ভীষণ লোভ হচ্ছে সেলিনা। ও বলল, যে পথ অন্ধকারে খুঁজে নিতে হয় আলোতে কি তার ঠিকানা মেলে? তা হলে উপায়? আবার প্রতীক্ষা হোক শুরু কবে পাবে এমন এক নিকষ কালো অন্ধকার রাত সেই অপেক্ষায়। যদি তর না সয়। হাসতে হাসতে বলল, জীবনের প্রথম যুদ্ধে যে জয়ী হতে পারে না, তাকে তো জয়ের অপেক্ষা করতেই হবে। বেরিয়ে গেল ও। মনে হলো। ওগো নারী কি বিচিত্র রূপিনি তুমি।
