তুমিই বল, আমি এর উত্তরে কি বলতে পারি? তারপর ভাল করে চুল বেঁধে দিলেন আমার। হাতে দিলেন ওই শাড়ী ও ব্লাউজ। বললেন এটা পরেই ওর কাছে যাও মা। তোমরা একালের মেয়েরা যে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ককে কোন খাদে নামিয়ে এনেছো ভাবলেও অবাক লাগে। আমরা রোজ বিকালে সারদিনের ক্লান্তি দূর করতে গোসল করতাম। নিজেকে যথাসম্ভব পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে স্বামীর কাছে নিজেদের গ্রহণীয়া হয়ে ওঠার চেষ্টা করতাম। আমি লজ্জায় মুখ নীচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে রইলাম। উনি বললেন, এতে লজ্জার কি আছে। মহাভারততো শুধু হিন্দুর কাব্য নয় ভারতীয় উপমহাদেশের সব মানুষের কাব্য। সব মানুষের কথা লেখা ওতে। ওখানে দ্রৌপদী আছে একজন। পাঁচজনের মনোরঞ্জন করেও তার মনে জেগে থাকে একজনের কথা, সে অর্জুন, তাকেইতো সে চেয়েছিল জীবন ভরে। কিন্তু অর্জুন কখনো তার একার হয়নি। সুভদ্রা ছিল অর্জুনে আরেক শ্র। একদিন দ্রৌপদীকে বলেছিল দিদি পাঁচজন স্বামীর মনোরঞ্জন করেও তুমি যেমন অক্লান্ত তেমনি এত স্ত্রী থাকতেও অর্জুন শুধু তোমাকে চায় কেন? কি আছে তোমার মধ্যে যা দিয়ে তুমি বশ কর স্বামীদের। দ্রৌপদী হেসে ছিলেন উত্তর এড়িয়ে যেতে। কিন্তু নাছোড়বান্দা সুভদ্রা তা শুনবেন কেন? বললেন এড়িয়ে গেলে চলবেনা দিদি, আমাকে বলতেই হবে। নিরুপায় দ্রৌপদী বলেছিলেন আমি নিত্য নতুন রূপে হাজির হই ওদের কাছে যাতে কোন ভাবে তারা মনে করতে না পারে আমি পুরান।
লাজ লজ্জা বিসর্জন দিয়ে আমি বলেছিলাম তুমি পড়েছে মহাভারত? না তবে জানলে কি করে? তোমার চাচার কাছে শুনেছিলাম। কথাটা বলেই যেন কুমারীর সলতায় হাসলেন একটু। তারপর নিজেই বললেন, আমি তোমার চাচার দ্বিতীয় স্ত্রী। বয়সের পার্থক্য আমাদের মধ্যে অনেক। তবু তিনি আমায় শিখিয়েছিলেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কে শুধু মাত্র নিরস কর্তব্য পালনে শেষ হয় না মোনোয়ারা, শুধু ভালবাসায়ও তা পূর্ণতা পায় না যদি একে অপরকে দেখে ভালো না লাগে তবে তা ব্যর্থ। তাই বলছি মা শুধু ভালবাসা দিয়ে জীবন সব সময় বাধা যায় না যদি একে অপরকে ভাল না লাগে। তাইতো গ্রাম বাংলার সব স্ত্রীরা স্বামীর সেই মুগ্ধ দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য নিজেকে সাজাতো সযতনে। হিন্দু স্ত্রীকে সধবার এয়োতি ও সিঁথিতে সিঁদুর ছাড়া ভাল লাগতে পারে না। এ তাদের জন্ম গত সংস্কার, আর এই লাল রং এতে যৌবনের রং মা। মিথ্যে করেই বলেছিলাম, ওতো বলেনি কখনো। এনিয়ে ভাবে বলেও তো মনে হয় না। ভাবে মা ভাবে, তুমি কিছু মনে করতে পার তাই হয়তো মুখ ফুটে বলৈ না। আমি মনে করব কেন? তুমিতো সেই সংস্কারের মধ্যে বড় হওনি তাই। যদি তুমি ভেবে বসো, ভালবাসাটাকে বাদ দিয়ে সংস্কারটিই বড় করে দেখছ বলে।
বিশ্বাস কর প্রান্তিক ভাই, গ্রামের এই অল্প শিক্ষিত মহিলার মধ্যে এমন সুরুচি সম্পন্ন আভিজাত্যে আর উদার মনা বাস্তববাদী এক নারী বাস করতে পারেন ভাবিনি কখনো। সত্যি মনে হয়েছিল, যদি তোমার ঘরে সত্যি কখনো আসি, এমন ভাবনা কি তোমার অমূলক হবে? উনি আরো বলেছিলেন, সব কিছুকে বাদ দিয়ে যে ভালবাসা তা স্থায়ী হতে পারে না মা, ভালবাসতে গেলে তার দোষগুন নিয়েই তাকে ভালবাসতে হয়। তাদের আজন্ম আচরিত সংস্কারকেও ভালবাসতে হয়। দুপুরের দিকে শুনেছিলাম তুমি তোমার চাচার সঙ্গে আলোচনা করছ। বিধর্মী দুটি মানুষ ভালবেসে বিয়ে করলে একজনকে ধর্ম ত্যাগ করতে হবে কেন? তারপর বললেন সত্যি কারের ধর্ম অন্তরের জিনিষ মা। কিন্তু যে ধর্মকে আমরা চোখে দেখি, সে আমাদের আচার সর্বস্ব ধর্ম একটু আগে যে সংস্কারের কথা বললাম, তার জন্যইতো একজনকে ত্যগ স্বীকার করতে হবে। উভয়ে উভয়ের ধর্ম এক সঙ্গে ঘর করতে গিয়ে পালন করতে চাইলে, আচার সর্বস্ব ধর্মের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হতে পারে তাই হয়তো একজনকে এগিয়ে আসতে হবে। আমি বলে ছিলাম, বলল সেলিনা, কিন্তু চাচী সচরাচর দেখা যায় এই ধর্ম বর্জন গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রায় সকলকেই মুসলমান হতে হয়, এটা কেন? কারণ হয়তো একটা আছে আমি অত বলতে পারবনা মা, তবে মুসলিম ধর্ম বিশ্বাসের দিক দিয়ে বেশ কিছু স্বাতন্ত্রের দাবী করে বলেই হয়তো এই রকম হয়। আবার অন্য কিছুও হতে পারে আমি জানিনা। আমি যদি ওর ধর্মীয় আচরণ পালন না করে আমি যে আজন্ম সংস্কারে লালিত পালিত হয়েছি ওকে তাই পালন করতে বলি। সে তুমি পারবেনা মা। কেন? যদি পারতে তা হলে এতদিনই তা পারতে। তার থেকে তোমার পক্ষে সহজ ওর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। উত্তরে বললাম তাতে যদি অস্বস্থি হয়? তার উত্তরে চাচী বললেন, হলেই বা, একজনকে না একজনকে তো মানিয়ে নিতেই হবে। এক্ষেত্রে না হয় তুমিই মানিয়ে নিলে, তাছাড়া আমার মনে হয় জন্ম তোমার ইসলামের ঘরে হলেও ইসলামের আচার আচরণ তুমি কিছুই জান না। জীবনে হয়তো কোনদিন নমাজও করোনি। আমি মৃদু হেসে বললাম একথা তোমার সত্যি চাচী। আরো বললাম যাকে তোমরা ককসানা বলে জানতে সেই রেহানা, আমার দিদি যখন ওকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালবেসেছিলেন, তখন কিন্তু ডালিম ভাইয়ের বিষ নজরে পড়ে গিয়েছিলেন। একদিন ও ডালিম ভাইকে সত্যিই ভালবেসে ছিল। কিন্তু ডালিম ভাইয়ের মধ্যে যে ধর্মান্ধতা ছিল, ওর মধ্যে তা ছিল না, তাইতো পাগলের মত ওর প্রতি প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল ডালিম ভাই, আর সেই ধর্মন্ধাতার যুপকাষ্ঠে আমাদের জীবনটাকে ধ্বংস করে দিয়েছেন উনি।
