সত্যি কি তাই? সত্যি কি তাকাইনি বিকেল থেকে ওর দিকে? তাকি হয়? যে ভাবে সেলিনা এগিয়ে আসছে তাতে রেহানা ভেসে যাবে। এতদিনে মনে এ বিশ্বাস দৃঢ় হতে আরম্ভ, করেছে, কিন্তু সেই মন নিয়ে, আমি কি সম্পূর্ণ ভাবে সেলিনার হতে পারবো। তবুও ব্যাথাতুর দৃষ্টি নিয়ে তাকালাম ওর দিকে। উজ্জ্বল হ্যারিকেনের আলোয় দেখতে পাচ্ছি, খাটের একটি দিকে হাত রেখে, আমার দিকে পিছন হয়ে দাঁড়িয়ে আছেও? আর আমার অবাক হওয়ার শেষ সীমায় এসে আমি আশ্চর্য হয়ে দেখলাম টকটকে লাল রঙের শাড়ী পরেছে সেলিনা, ব্লাউজটাও লাল, সুন্দর খোঁপায় গোজা লাল গোলাপ। তার হাতে এ গয়নাতো ছিল না আগে, তা হলে, কিসের গয়না ওটা।
কোনদিন দেখিনি সেলিনাকে এমনি লাল শাড়ীতে। শুনেছি যৌবন তার উদ্দামতা পায় লাল রঙে। দেখিনি কখনো। সেই উদ্দামতার ভাষা কি, তাও জানিনা। তবু সেলিনাকে এই অপরূপ রূপে দেখার আকাঙ্খা নিয়ে ডাকলাম, সেলিনা। ওকোন সাড়া না দিয়ে তেমনি দাঁড়িয়ে রইল। আমি ওর উন্মুক্ত পিঠে হাত রেখে আবারও ডাকলাম সেলিনা। তবু নিথর নিস্পন্দ যেন। বুঝতে পারছি চরম অভিমানে ও আমাকে প্রত্যাখ্যান করতে চাইছে। সেলিনা কেন বুঝতে চাইছেনা, ও যা চায় আমিও তো তাই চাই, কিন্তু তার আগে চাই রেহানার একটা খোঁজ। হয়তো সেলিনার ধারণা, রেহানা থাকলে সে আসতে পারবেনা আমার কাছে। আমিও হয়তো যেতে পারবো না তার কাছে, তাই কি রেহানাকে খুঁজে পেতে চায় না ও। কিন্তু এত স্বার্থপর তো সেলিনাকে ভাবতে চায় না মন। সেই সেলিনা যে আমাকে একটু একটু করে রেহানার দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। সেই সেলিনা, যে হাসি ঠাট্টা আর চটুলতার বেডি দিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে চেয়েছে আমার দুর্বলতা থেকে। যে প্রতি মুহূর্তে রেহানাকে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে নিজেকে করেছে রিক্ত। সে কেমন করে হবে এমন স্বার্থপর। আমি আকুল হয়ে আবারও ডাকলাম, সেলিনা একবার তাকাও আমার দিকে। তবু নিশ্চল পাষাণ যেন, এবার আমি আর পারলমনা। জোর করে মুখটা ফিরিয়ে নিলাম আমার দিকে? চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় গড়িয়ে পড়ছে জল, সে দিকে তাকাবার আগে চোখ চলে গেল ওর সিঁথির দিকে, আর নিজের আশ্চর্যতাকে হার মানিয়ে আমাকে যেন চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে তার রক্তিম সিঁথি। সুন্দর করে কে রাঙিয়ে দিয়েছে ওর সিঁথিকে সিন্দুর দিয়ে। কপালে দিয়েছে রক্তিম টিপ। অপূর্ব লাগছে ওকে। আর এই অপূর্ব সৌন্দর্যের বেলাভুমিতে ফোঁটা ফোঁটা চোখের জল যেন, লাল সূর্যের স্পর্শোন্মুখ ভোরের শিশির বিন্দু।
কোন রকম দ্বিধার অপেক্ষায় না থেকে ওকে সজোরে বুকের পরে টেনে নিয়ে বললাম, সেলিনা তুমি কি বুঝতে পারনা আমাকে? কি চাই অমি? কোন রকম প্রতিবাদ না করে বলল, আমি পারছি না গো, আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি। আমিও তাই, আমার বুক থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, তাই যদি হয় তাহলে এই নাও, বলে নিজের ব্লাউজের মধ্য থেকে সিন্দুরের ছোট্ট কৌটটা বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল। তোমার অধিকার স্বীকৃতি দাও। কণ্ঠ আমার কেঁপে উঠলো। বললাম সেলিনা! ও নীচু হয়ে আমার পায়ের কাছে বসে বলল, আমি হেরে গেছি, একেবারেই হেরে গেছি। আকুল প্রার্থনায় আমার তৃষ্ণাতুর নয়নের দিকে তাকিয়ে বলল, জয়ী হতে চাওনা তুমি? এখনো ভীরু মন, কিসের প্রতীক্ষায় তাকিয়ে আছো?
আমি কৌটা থেকে সিন্দুর নিলাম আঙুলে। পরম মমতায় পরিয়ে দিলাম ওর রক্তিম সিঁথিতে। আর ও? ওর খোঁপা থেকে তুলে নিয়ে লাল গোলাপটি আমার পায়ের উপর রেখে দিয়ে বলল, আরতো কিছু নেই, আমার এই ক্ষুদ্র উপহারকে ফিরিয়ে দিও না। ফুলটা তুলে নিলাম পায়ের উপর থেকে, দুহাত দিয়ে তুলে নিলাম আবার ওকে বুকের মাঝে, বললাম তোমাকে ফিরিয়ে দিতে পারি এমন সাধ্য নেই আমার, শুধু ভয়, হ্যাঁ সেলিনা ভয়, রাতের অন্ধকার যে আবেগ রচনা করেছে সাগর, সূর্যের উজ্জ্বলতায় তা যদি বাষ্প হয়ে উড়ে যায়, কেমন করে মুছে দেব জীবনের এই মধুর মুহূর্তটুকু। ও বললো, মুছতেই চাইবে যদি–
কেন আবেগ দিয়ে ভরালে আমায়?
কেন শুভ্র সিঁথিতে দিলে
রক্তিম অঙ্গীকার?
সে কি তবে পরাজয়?
আমি বললাম, কার পরাজয়? আমার। তারপর বলল,
মুহূর্তর ব্যঞ্জনা যখন
বারবার বলে যায়, আমার সত্ত্বায় তুমি আছো,
রক্তের দোলায় লাগে সাগরের ঢেউ
গর্জন থেমে যায়।
সে শান্ত রূপের লাগি
আঁধার কি নয় মধুময়?
যে চোখের তৃষ্ণা লাগি
নীল আকাশ, আপন খেয়ালে আঁকে
নক্ষত্রের ছবি,
চাঁদও কি পিছিয়ে থাকে?
পক্ষ থেকে পক্ষান্তরে
নীরব সে অভিসারে
কানে কানে বলে যায়
আনন্দের যজ্ঞভূমে যে আগুন জ্বালাতে আজকে
আমি তার সাক্ষী হয়ে রব চিরদিন।
কেউ নেই মুছে দিতে বিবর্তন আমার
আমিতো আসব ফিরে বার বার
করাঘাতে হানবো আঘাত
রুদ্ধদ্বার দুয়ারে তোমার।
পারবে কি ফিরিয়ে দিতে
মুগ্ধ রাত জোছনারে
করতে বিমুখ?
সকাল থেকে আমার শুধু বিস্ময়ের পালা জীবনেব এত আবেগ এত ভালবাসা কোথায় লুকিয়ে রেখেছিল সেলিনা এতদিন? স্পষ্টতায় কোন আড়ষ্টতা নেই। খরস্রোতা পাহাড়ী নদী যেন ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে আমায়। এতদিন তীর দিয়ে হেঁটে ছিলাম, পাশাপাশি। এবার ভেসেছি তাব স্রোতে। শুধু মনে প্রশ্ন নীলাঞ্জনা পিসি, মিনতি সেন, যদি কিছু জানতে চান কি বলব ওদের। সেলিনা বলল, কি ভাবছো? তোমার কথা। আমার কথা? হ্যাঁ তোমার কথা। কেন? তুমি কি বুঝতে পারছে না কেন ভাবছি? সবটা না হলেও কিছু কিছু যে পারছি না তা নয়, কিন্তু এসব ভেবে কি হবে? একটা বাতের অভিনয় বইতো নয়। চাচীকে আঘাত দিতে পারলাম না, নিজের হাতে পরিয়ে দিলেন সিঁদুর, কি করে বাধা দিই বলত। হাতে দিলেন এয়োতির চিহ্ন নোয়া, হিন্দু স্ত্রীরা নাকি এসব স্বামীর মঙ্গলের জন্য পরেন, আমি ওকে বললাম আমিতো হিন্দু নই। উনি বললেন তাতে কি, তুমি যখন কোন হিন্দু ছেলেকে তোমার স্বামী হিসাবে গ্রহণ কবেছো, তখনতো তার ধর্মই তোমার ধর্ম। আমি অবশ্য বলতে চেয়েছিলাম ওতো কোন ধর্ম মানে না, ও বলে মানবতাই তার এক মাত্র ধর্ম। উনি বললেন ও যা বলে বলুক, কিন্তু মা হয়ে আমি তোমাকে এভাবে ওর ঘরে পাঠাতে পারবো না। বললাম কোথায় পাবে তুমি এসব। বললেন আকরবকে দিয়ে আনিয়েছি। আমি আঁতকে উঠে বললাম, এসব কি করেছো তুমি, ও শুনলে আমাকে ভীষণ বকবে। বললেন। বকুক, স্বামীর বকুনি স্ত্রীর অতো গায়ে লাগালে চলে মা?
