সেলিনা বলল, কিন্তু চাচা দেখা গেছে, একটি বির্ধমী মেয়ে ইস্লামের কাউকে ভালবেসে তার ঘর করতে এলো, ইসলাম নির্দেশ দেয়, মেয়েটিকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে হবে, এবং সাধারণত তাই হয় সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া। বিধর্মী মেয়েদেরও দেখা যায় তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের আজন্ম লালিত ধর্ম ত্যাগ করে চলে আসে যার ঘর করতে সেখানেও সে যে সুখী হয় সব সময় তা কিন্তু নয়। ভালবাসার আবেগ যখন মিইয়ে আসে, তখন আসে দুর্বিসহ ক্লান্তিময় জীবন, কিন্তু ফিরে যাওয়ার পথও অনেক সময় বন্ধ হয়ে যায়, আবার কোন ইসলামের মেয়ে বিধর্মীকে ভালবাসলে, সমাজ তাকে প্রতি পদে পদে বাধা দেয়, যদিওবা কোন ভাবে রাজী হয় সেখানে চাপ দেওয়া হয় ছেলেটি যেন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। কেন ইস্লামের কোন মেয়ে যাকে সে ভালবাসে তার ধর্ম গ্রহণ করে তার ঘরে যাবে না। দোষটা কোথায়? তাছাড়া এমনওতো হতে পারতো। কেউ কারো ধর্ম ত্যাগ করলো না, উভয়ে তার নিজ নিজ ধর্ম অনুসরণ করে একই ছাদের নীচে বাস করল!
বৃদ্ধ বললেন, জানিনা মা, ভিতরের কোন আগুন থেকে তুমি এসব কথা বলছ? হয়তো ডালিমের অবিচার আর অত্যাচারের সঙ্গে ধর্মান্ধতার কথা বলতে চাইছো। তার ভুলের শাস্তি সে পেয়েছে। সমাজ তার নিজের গতিতেই চলে মা। যুগের প্রয়োজনে সে নিজেই বিবর্তিত হয়। তাই বলে সমাজ সংস্কারকদের কৃতিত্বকে আমি ছোট করে দেখছিনা। একটা কথা মা, ধর, তুমি একটি জিনিষ বিশ্বাস কর, তুমি কি চাইবেনা, তোমার বিশ্বাস যেন সার্বজনীন হয়, অর্থাৎ তুমি যা বিশ্বাস কর অনন্যও যেন তা বিশ্বাস করে। এই বার দেখা গেল বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলো একটা গোষ্ঠী, আর গোষ্ঠী অধিপতিগন কখনই চাইবেনা, তার গোষ্ঠী ভেঙে যাক। একবার যদি এইভাঙনকে স্বীকার করে নেওয়া হয়, হলে দেখা যাবে ঐ গোষ্ঠীই একদিন নির্মূল হয়ে গেছে। তাই প্রাণপনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা। তাই বলে কি কেউ বেরিয়ে যাচ্ছেনা? যাচ্ছে। আবার নতুন গোষ্ঠীও তৈরি হচ্ছে। পৃথিবীর সর্বত্র এই নিয়ম চলছে মা, তুমি আমি তার কি করতে পারবো? সেলিনা বলল, আপনি হয়তো পারবেন না চাচা, কিন্তু আমি পারবো না তা আপনি ভাবছেন কেন? একটু গভীর হলেন মোসলেমউদ্দীন। বললেন, হ্যাঁ মা তা ঠিক। তোমরা আধুনিক মনস্ক মানুষ। নিজের ধর্মে বিশ্বাস না থাকলে ছেড়ে যেতে পারই মা। আজকের যুগ ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের যুগ। আজ সমষ্টিগত জীবনের থেকে ব্যক্তি জীবনের মূল্য অনেক বেশী। সেলিনা বলল, আমি কিন্তু আপনাকে আঘাত দিতে চাইনি চাচা, আমার এই অনিচ্ছাকৃত অপরাধ ক্ষমা করবেন, আসলে আমি বলতে চেয়েছি বিধর্মী কাউকে ভালবাসলে আমার ধর্ম ত্যাগ করতে হবে, এমন কি কোন কথা আছে? আমরা কি পাবিনা উভয়ে উভয়ের ধর্ম মেনে এক সাথে জীবন অতিবাহিত করতে। শুনেছি সম্রাট আকবরের বাজ অন্তপুরে অনেক হিন্দু মহিষী তাদের স্ব স্ব ধর্ম পালন করতেন। তাতে কোন অসুবিধা হয়েছে বলে মনে হয় না। মোসলেমউদ্দীন সাহেব বললেন, আকবর ছিলেন ইতিহাসের নিয়ন্ত্রা। তিনি আল্লাহর প্রতিনিধি, যেমন হিন্দুদের বিশ্বাস রাজা ঈশ্বরের প্রতিনিধি। কিন্তু আকবর যা করতে চেয়েছিলেন তাতে স্থায়ী হয় নি। আসলে যে কোন বিশ্বাস, জনমনে স্থায়ী হতে হবে। একই জায়গায় আযান ও শঙ্খধ্বনি, নমাজ ও প্রার্থনা ইত্যাদির কিছু গুনগত পার্থক্য আছে। যে উদার মানসিকতায় তা গ্রহণ করা যায় আগে দেখতে হবে আমাদের সেই উদারতা আছে কিনা। তারপর বললেন, এবার তোমার মূলপ্রশ্ন নিয়ে বলা যেতে পাবে, যে দুটি হৃদয় ভালবেসে কাছাকাছি এসেছে তাদের মেনে নেওয়াটাই কিন্তু সব নয়, তাকে নিয়ে তার যে ছোট্ট সংসার, এবং তার শাখা প্রশাখা সবার মধ্যে থাকতে হবে সেই একই উদার মানসিকতা তবেই শুধু সম্ভব, না হলে নয়। সেলিনা বলল আপনি কি মনে করেন না, একদিন সারা পৃথিবীর মানুষ এক হয়ে এই উদার মানসিকতার পথে তাদের যাত্রা শুরু করবে। বৃদ্ধ মোসলেমউদ্দীন তার উজ্জ্বল দুটি চোখ মেলে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকন সেলিনার দিকে, কোন উত্তর জোগায় না।
মোনায়ারা বেগম তাড়া দিলেন, কি তখন থেকে কথা বলেই চলেছো, ওরা তোমার মেহমান, কি খাবে না খাবে একটু দেখবে না? হাসলেন মোসলেউদ্দীন, বললেন তুমিতো আছো। হ্যাঁ আমি আছি। কিন্তু তার আগে একবার এদিকে এসো। মোসলেউদ্দীন মোনায়ারা বেগমের পিছুপিছু গেলে, আমি সেলিনাকে বললাম, কেন বৃদ্ধ মানুষের সেন্টিমেন্টে আঘাত দিচ্ছ সেলিনা! কে বলল আঘাত দিচ্ছি? আসলে আমি জেনে নিতে চাইছি মুসলিম সমাজ এখন কোন পথে চলছে। তাতে তোমার লাভ? লাভ লোকসানের ব্যাপার নয়, এসব আমি আমার স্বার্থের জন্য করেছি। তোমার যদি মনে হয়, এসব শুনতে তোমার ভাল লাগছেনা, তাহলে তুমি আকবরের সঙ্গে গ্রামটা ঘুরে দেখে এস। হয়তো অশ্ৰুদির ওখানকার মতো সাজানো প্রাকৃতিক পরিবেশ নেই, কিন্তু স্রষ্টার আপন খেয়ালে সৃষ্ট যে প্রকৃতি, তা তোমাকে আনন্দ দিতে পারে। তুমি আমাকে তাড়াতে চাইছো? আমার লাভ? সব কিছু কি লাভ লোকসান দিয়ে বিচার করা যায়?
মোসলেউদ্দীন সাহের ফিরে এনে, বললেন, বেটি, তোমাকে একবার তোমার চাচী ডাকছে, একবার যেতে পারবে? সেলিনা বলল আচ্ছা যাচ্ছি চাচা, সেলিনা চলে যাওয়ার আগে বলল, চাচা ভীষণ ভালো লাগছে আপনার সাথে কথা বলতে। আমি আসছি। আপনি ততক্ষণ ওর সঙ্গে কথা বলুন। ও চলে গেল। বৃদ্ধ বললেন, কিভাবে যে তোমার সঙ্গে কথা বলব বুঝতে পারছি না আমি বৃদ্ধ মানুষ, সেকালের ধ্যান ধারনাকে তো জীবন থেকে মুছে ফেলতে পারিনি, আমার সঙ্গে কথা বলতে কি তোমার ভাল লাগবে? বললাম এভাবে বলছেন কেন? এতক্ষণ কথা বলিনি কারণ আপনারা গভীর তত্ত্ব নিযে কথা বলছিলেন আমি মুগ্ধ শ্রোতার মত শুনছিলাম। উনি হাসলেন, ভদ্রলোকের সমস্ত চুল ও দাড়ি পেকে গেছে আর দাঁতগুলো মুক্তোর মত সাদা। সবকিছুতেই যেন শুভ্রতার ছোঁয়া। তারপর বললেন, তোমরা যে আসবে আমার বাড়ীতে বুঝতে পারিনি বাবা। মানুষ বুড়ো হয়ে গেলে একটু বেশী কথা বলে আমিও হয়তো একটু বেশি কথা বলব, বিরক্ত হবে না তো? ছিঃ কাকাবাবু এসব আপনি কি বলছেন? আমি তো আপনার ছেলের মতন। তাই যখন বললে বাবা, তাহলে তোমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করলে কিছু মনে করবে না তো। করুন। বৃদ্ধ বললেন কি ভাবে যে আরম্ভ করি। না, মানে, আমি রেহানার কথা জানতে চাইছি। ও তোমাকে গুরু বলে মানে, কিন্তু কেন? বড্ড কঠিন প্রশ্ন কাকাবাবু। আমি কারো গুরু নই, হতেও চাইনা। কেন? যে সমস্ত গুন থাকলে কাউকে গুরু বলা যায়, তার কোন যোগ্যতাই আমার নেই। তাহলে ও তোমাকে গুরু বলে মানছে কেন? দেখুন কাকাবাবু কেউ কি ভাবে কাকে দেখবে তাতো আমি বলতে পারবো না। রেহানাকে আমি ভালবাসি, এর বেশী কিছু নয়। তুমি তো শুধু রেহানাকে ভালবাসনা, আরো তো অনেককে ভালোবাসো। সেতো সব মানুষই ভালবাসে। তবু রেহানার ভালবাসা নিশ্চয়ই তোমার কাছে আলাদা মর্যাদা পায়। হয়তো পায়। আজ যদি মেয়েটিকে খুঁজে পাওয়া যায় তুমি গ্রহণ করবে তো। বললাম তার সঙ্গে আমার গ্রহণ বা বর্জনের সম্পর্ক নয় কাকাবাবু। আমি শুধু জানি জীবন আমার সে কানায় কানায় ভরে দিয়েছে। বেশ তাই যদি হয় আজ যদি সে তোমার কাছে কোন প্রতিদান চায়? সত্যিকারের ভালবাসা কোন দান বা প্রতিদানের জন্য অপেক্ষা করে না কাকবাবু, আমি শুধু তাকে খুঁজে পেতে চাই। তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলতে চাই জীবনের দাম তুমি এভাবে মেটালে কেন? তুমি কি ডালিমকে তার জন্য দায়ী করছ? সত্যি কথা বলতে কি কাকাবাবু ডালিমকে আমি চিনিনা, আজো পর্যন্ত তাকে আমি দেখিওনি। তবু তো সে তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো। বললাম জানিনা কাকাবাবু কেন আপনি একথা বলছেন? ডালিম তার কাছে কি চেয়েছিল তা আমি জানিনা। কেন একদিন ডালিমকে ভালবেসেও তাকে সরে আসতে হয়েছিল তাও আমার অজানা। তুমি জিজ্ঞাসা করনি? প্রয়োজন মনে করিনি। ডালিমের কথা শুনেছিলাম ওর বোন সেলিনার কাছে, আসলে ভালবাসাতো কারো জীবনে বলে কয়ে আসেনা, আমাদের জীবনেও আসেনি সেভাবে। ভালবাসার যে জাগতিক পরিণতি সেই ভাবে আমরা নিজেদের কথা কারো কাছে স্পষ্ট করে বলিনি। শুধু মনে হতো, ও আছে আমার জীবনের সঙ্গে মিলেমিশে, আর আমার উপলব্ধিতে মনে হয়েছে ও-ও হয়তো এমনিই ভাবতো। বৃদ্ধ বললেন, কিন্তু বাবা ও ডালিমের সঙ্গে দেখা করতে এসে যে সব কথা বলেছিল এবং ডালিম যদি সত্যি সত্যি তার আহ্বান সাড়া দিতে কি করতে তুমি? জীবনে যে ঘটনা ঘটেইনি, তা ঘটলে কি করতাম, কি করে বলব। তবু। এর কোন উত্তরতো দিতে পারবনা কাকাবাবু। আমি শুধু বুঝি তার বেদনা তার কষ্ট তার অন্তরের শূন্যতা। সেই শূন্যতা ও কষ্টকে ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য আমার যা করণীয় তা করতে কখন পিছপা হতাম না। জীবনে আঘাত ও বেদনার মধ্যে যে ভালবাসা তার মধ্যেই নিজেকে খুঁজে পেতে চেয়েছি।–এর চেয়ে বেশী কিছু চাইনি।
