বৃদ্ধের হৃদয় যেখানে এক অনাস্বাদিত আনন্দে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে সেই খানে আঘাত হেনে সেলিনা বলল, চাচা আজ আর তাকে খুঁজে পেয়ে কি করবেন? উত্তেজিত হয়ে বৃদ্ধ বললেন কি করব মানে,–তাকে আমি ফিরিয়ে দেব তার গুরুর কাছে। যে মেয়ে তারই সমবয়সী কাউকে তার গুরু হিসাবে মানে–তার দামটা কি আমি হেলায় ফিরিয়ে দিতে পারি মা! সেলিনা বলল আচ্ছা চাচা, যাকে আপনি হৃদয় দিয়ে ভালবেসে নিজের সন্তানের মত মানুষ করেছেন, তার এই অকাল মৃত্যু আপনাকে কি আঘাত দেয়নি? না মা দেয়নি। আমি শিক্ষক মানুষ। আজীবন মানুষ গড়তে চেয়েছি। পারিনি যে, তার তত জ্বলন্ত প্রমাণ ডালিম। আজীবন যে মনুষত্ত্বকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছি তার ঘরেই বেড়ে উঠেছে মনুষত্ত্বের কুলাংগার। তাকে যে মানবিকতায় গুণান্বিত করেছে যে আমাকে অন্তত শান্তিতে মৃত্যুর অধিকার দিয়েছে, তাকে কি খুঁজে পেতে চাইবে না। নিশ্চয়ই চাইবেন, কিন্তু আপনিতো ধর্মভীরু মুসলমান, একটি মুসলমান মেয়েকে পারবেন বিধর্মী হিন্দুর হাতে তুলে দিতে? যতটা সহজ ভাবে এ মেয়েকে বশকরা যাবে বলে ভেবেছিলেন মোসলেমউদ্দীন সাহেব, তা যে হবার নয়, সেলিনার প্রশ্নের বাঁকা গতি দেখে বুঝতে পারছেন উনি। কিন্তু আজীবন শিক্ষকতার সহজ সংযম তাকে স্থিতধি হতে সাহায্য করেছে, বললেন, ধর্ম সাধারণের আচরণের জন্য মা। আমি হয়তো আমারই মতো মনের কোন মেয়েকে কোন বিধর্মীর হাতে তুলে দিতে পারবো না, কিন্তু এ মেয়েটিতো তা নয়, তার মধ্যে মিশে আছে যে ভালবাসা আর মানবিকতার সহ-অবস্থান, কোন ধর্মের নিগড়ে তাকে বাঁধব কি করে? কথাটা আপনি কি ঠিক বলেছেন চাচা? ধর্মের সঙ্গে কি মানবিকতা ও ভালবাসার মিশ্রণ নেই? হয়তো আছে, কিন্তু মা, আমরা কি দেখতে পাই চারপাশে? আমরাই তো দেখি নিষ্পাপ ভালবাসাকে ধর্মের যুপকাষ্ঠে বলি হতে? তার জন্য কি ধর্ম দায়ী? পৃথিবীর কোন ধর্ম কি বলেছে দুটি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে ভালবাসা থাকতে নেই? ধর্মের আসল সত্যকে আমরা অস্বীকার করে কতকগুলো বস্তাপচা আচরণকে আমরা ধর্ম বলে মনে করি বলে এই অসুবিধা গুলো হয়। তা না হলে পৃথিবীর কোন ধর্মের অন্তরতম সত্যের মধ্যে পার্থক্য নেই। সেলিনা বলল, তা হলে যে বিভিন্ন ধর্ম গুরুরা বলেন, তাদের ধর্মই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম? বৃদ্ধ বললেন যদি সেই সব ধর্ম গুদের মধ্যে ভালবাসা থাকে তা হলে কোন অসুবিধা নেই, কারণ আমি যা বিশ্বাস করি তাকে যদি সর্বশ্রেষ্ঠ বলে বিশ্বাস করতে না পারি তাহলে আমার বিশ্বাসটাই যে পলকা হয়ে যায়। তাই বলছি মা, সব ধর্ম ভীরু মানুষের কাছে নিজের ধর্মই শ্রেষ্ঠ। সেলিনা বলল, এই যে ইস্লাম বলে, ইস্লাম ধর্মই শ্রেষ্ঠ ধর্ম। মোসলেমউদ্দীন বললেন, এটা ঈশ্বর বলে না মা, ইলামকে যারা বিশ্বাস করেন এটা তাদের কথা। আর ঈশ্বরতো সব ধর্মের কাছেই ঈশ্বর, তিনি কেন বলবেন কোন ধর্ম শ্রেষ্ঠ, কোন ধর্ম শ্রেষ্ঠ নয়।
মোনোয়ারা বেগম এই সময় প্লেটে সাজিয়ে আলাদা আলাদা করে মিষ্টি নিয়ে এলেন আমাদের সকলের জন্য। মোসলেমউদ্দীন বললেন, কখন খেয়েছো কি জানি, এবার কিছু মুখে দিয়ে নাও। সেলিনা বলল, কিন্তু আমার যে অনেক কথা জানার আছে। খেতে খেতেই তো জানা যেতে পারে। আমরা সকলে মিষ্টির প্লেট তুলে নিলাম। সেলিনা জানতে চাইলো, আচ্ছা চাচা ইসলামের সব কিছুকেই কি আপনি চিরন্তন সত্য বলে বিশ্বাস করেন? চুপ করে রইলেন বৃদ্ধ কিছুক্ষণ, তারপর বললেন, তুমিতো নীচু ক্লাশে অংকের যোগ বিয়োগ করেছে, তাই না? সেখানেই শিখেছে যে ২ আর ২ যোগ করলে ৪ হয়, এটাকে কি তুমি অস্বীকার করতে পার? কি করে অস্বীকার করব? একে অস্বীকার করলে যে গোটা অংক শাস্ত্রকেই অস্বীকার করতে হয়। সেটাতো যুক্তির কথা নয় মা, তোমার যদি যুক্তির পরে সীমা হীন জ্ঞান থাকতো তাহলে হয়তো অস্বীকার করতে। আসলে তুমি যখন থেকে ০ থেকে ৯ পৰ্য্যন্ত সংখ্যা শিখেছো, সংখ্যা গুলোকে সংখ্যা হিসাবে মেনে নিয়েছে। যদি তুমিতা না মানতে, তাহলে সবাই যে ভাবে অংক মেলায় তুমি সেভাবে মিলাতে পারতেনা। এও সেই বিশ্বাস তাই না? তার ভালমন্দ যাইই থাকুক বিশ্বাস যদি তোমার অটুট না থাকতত প্রচলিত অংক শাস্ত্রে তুমি নিয়মিত ভুলই করে চলতে। আমি ইসলামকে বিশ্বাস করি। কোন সংখ্যার ভালমন্দের বিচার করার যেমন আমার কোন অধিকার নেই, তেমনি আমার ধর্মীয় বিশ্বাসের ও ভালমন্দের বিচার করার কোন অধিকার থাকতে পারে না।
সেলিনা বলল, আপনি যুক্তির পর যুক্তি সাজিয়ে আমার মুল প্রশ্নটাকে এড়িয়ে যাচ্ছেন চাচা, আমি জানতে চাইছি ইসলামের সবই কি চিরন্তন সত্য? যুগের প্রয়োজনে তার কি কোন পরিবর্তনই সম্ভব নয়?
বৃদ্ধ বললেন, অবিশ্বাসী মানুষকে আল্লাহর পদপ্রান্তে নিয়ে যাওয়াই ইস্লামের আদর্শ। বাদ বাকী আচরণ দিয়ে ধর্মের বিচার করা হয় তুমি কিসের পরিবর্তনের কথা জানতে চাইছে মা? সেলিনা বলল, আমি সেই আচার আচরণের কথাই বলছি। এর কি পরিবর্তন সম্ভব নয়? ইসলাম কি বলেছে এ আচরণ অপরিবর্তনীয়? মোসলেউদ্দীন বললেন মানবজীবনে আচরণের কয়েকটা দিক আছে। কিছু কিছু আচরণ আছে পৃথিবীর সব ধর্মের কাছে তা সমান সত্য। সেলিনা বলল ইলাম ধর্ম সম্পর্কে যে অভিযোগগুলি প্রায়ই করা হয় তা হলো ইলাম অসহিষ্ণু, ইলাম এক সঙ্গে এক পুরুষের চারটি বিয়েকে স্বীকৃতি দেয়। স্বামী রাগের বসে তিন তালাক উচ্চারণ করলে, স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীর বিচ্ছেদ হয়ে যায়। কোন বিধর্মীকে ভালবাসলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সে যদি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তা হলে খুব একটা বাদ সাধা হয় না, অন্যথায় প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হয়। বিশেষত ভারীয় ইস্লামের ক্ষেত্রে দেখা গেছে এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যা বিশ্বাস করে তার উল্টোটাকে ইস্লাম সত্য বলে গ্রহণ করে। ইলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ সাধারণত অসাম্প্রদায়িক হয় না ইত্যাদি, এ সম্পর্কে আপনার অভিমত কি চাচা? বড় কঠিন প্রশ্ন মা, বুঝতে পারছি তুমি আমায় এ সমস্ত প্রশ্ন কেন করছ? আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধি মতো আমি তোমাকে ব্যাখা করার চেষ্টা করছি। তুমি বলেছে ইস্পাম অসহিষ্ণু কি না কিন্তু মা সহিষ্ণুতাই হচ্ছে ধর্মের মূলমন্ত্র। পৃথিবীর কোন ধর্মই অসহিষ্ণু হতে পারে না, ইসলামও নয়, কিন্তু যে দিকে তুমি অঙ্গুলি সংকেত করতে চেয়েছে, সেটা এক অর্থে সব ধর্মের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আসলে অসহিষ্ণুতা ধর্ম ব্যবসায়ীর আচরণ, ধর্মের আচরণ নয়। বাংলার মাটিতে যে প্রেমের ধর্ম বৈষ্ণব ধর্ম, তার পূর্বসূরী হিসাবে আমরা যাকে ঐতিহাসিক সত্য বলে মেনে নিয়েছি তারা কিন্তু ইসলামের সূফী সাধক। লালনের মধ্যে যার পূর্ণতা। একাধিক বিয়ের অধিকার নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছে তার জন্য আমার মনে হয় ইতিহাসের প্রেক্ষাপট খানিকটা দায়ী। ইস্লাম কোন জীবনের অমৰ্য্যাদা যেমন পছন্দ করে না। তেমনি যে মেলামেশায় আইনের স্বীকৃতি নেই তাও পছন্দ করে না। এই উভয় সংকট থেকে বাঁচতে হয়তো বা যাযাবর আরবীয়দের মধ্যে নারীর আধিক্য থাকায় এমন একটা প্রথা চালু হয়েছিল। ওটা কোন ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাপার নয়, ওটা একটা আচরণ। আধুনিক পৃথিবীর ইতিহাসে নারী ও পুরুষের সংখ্যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রায় সমান, অনেক ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা পুরুষের থেকে অস্বাভাবিক কম, সেখানে এমন একটা আচরণ মানতে গেলে সামাজিক বন্ধনটাই যে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাবে। তাই হয়তো তুমি দেখবে, পৃথিবীর অনেক মুসলিম দেশেও এর আধুনিক পরিবর্তনকে স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে। একটু থেমে আবার আরম্ভ করলেন এর পরে এনেছে ইস্লামের তিন তালাকের প্রসঙ্গ, এক সঙ্গে উচ্চারিত তিন তালাককে যে ভাবে শরিয়তী স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে সেটা মনে হয় ঠিক নয়। কারণ ইস্লাম নীতিশাস্ত্র তিনি তালাক উচ্চারণের জন্য সুনির্দিষ্ট দিনের ব্যবধানের কথা বলেছেন। আর তাই এখানেও সেই ধর্ম ব্যবসায়ীদের কারসাজি। যদি কোরানের মূল সত্যকে মেনে নেওয়া যায়, তা হলে এই নিয়ে যে ভুল বোঝাবুঝি চলেছে তার অবসান হতে পারে। বিধর্মীকে ভালবাসার যে কথা বলেছো, সেটাও ধর্মীয় বিধান নয় লোকাঁচার। আসলে মানুষের মনে বদ্ধমূল হয়ে আছে গোষ্ঠীতন্ত্র, আর এসবই তার প্রকাশ মাত্র। মানুষ বিশ্বাস করে, নিজের আচার আচরণের সঙ্গে ভালবাসার মানুষটির আচার আচরণের বিশ্বাসগত মিল থাকলে জীবন যাত্রা সহজ হতে পারে। জীবনে যেমন ভালবাসা আছে তেমনি আছে সামাজিক অবস্থান, দুটোকে মেলাতে চাইলে কিছু আপোষতো করতেই হবে।
