সেলিনা এলো। বৃদ্ধ বললেন, তোমার চাচীর সঙ্গে কথা হয়ে গেছে মা! হ্যাঁ। তোমার চাচীর সমস্যার সমাধান হয়েছে কি? তাতো বলতে পারবো না, আমি আমার মতো করে বলেছি, তিনি তার মতো করে বুঝেছেন। সমস্যা সমাধানের আমার হাতে নেই। বৃদ্ধ আর কথা বাড়ালেন না। বললেন, তোমরা বিশ্রাম নাও, আমি একটু ঘুরে আসি।
উনি চলে গেলে আমি সেলিনাকে জিজ্ঞাসা করলাম, সেলিনা তোমার আসল রূপ কোনটি। ও হাসতে লাগলো। হাসছো যে! দেখছি তোমার মনের হাঁস ফাস অবস্থা। মানে? মানে বুঝতে পারছনা? না পারছি না। তাহলে চাচীর সমস্যাও বুঝতে পারবেনা। বললাম, তুমি হেঁয়ালি রেখে খোলাসা করে বলত? বললেই বুঝতে পারবে? বলেই দেখনা। চাচী জিজ্ঞাসা করছেন, আমি যখন তোমার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছি তা হলে হিন্দু এয়োতির মতো আমার হাতে শাখা-নোয়া নেই কেন? নেই কেন সিঁথিতে সিন্দুর! ও হাসছে। আমি অবাক হয়ে বললাম, এই সব কথা বলেছেন উনি? কেন তোমার শুনতে ভাল লাগছেনা? আমিতো আরো ভাবলাম, তুমি আনন্দে গদগদ হয়ে এতক্ষণ না জানি কি না করবে আমাকে নিয়ে। বললাম তা না হয় ভেবে দেখা যাবে কি করব, কিন্তু উনি আর কি বললেন তা হলে শোনার ইচ্ছে আছে যোণ আনা অথচ মুখে সন্দেহের ফুলঝুরি। এরপরে সেলিনা বলে চলে উনি আরো বললেন, আমার শ্বশুর শাশুড়ী, আই মিন তোমার বাবা-মা আমাকে মেনে নিয়েছেন কি না। তোমাদের অন্দর মহলে আমাদের থাকতে দেওয়া হয় কি না, না বাইরের বাড়ীতে থাকতে হয়। আমি রোজ মোনাজাত বা নামাজ করি কি না। তোমাদের ঠাকুর ঘরে আমার প্রবেশাধিকার আছে কি না। যে থালা বাসনে তোমাদের সকলের খাওয়া হয়, আমাকেও তাতেই খেতে দেওয়া হয় কি না, না মাটির বাসন বা চিনা বাসনে খেতে হয়। তোমাদের রান্নাঘরে আমার ঢোকার অধিকার আছে কি না। আমার হাতের রান্না তোমরা খাও কি না। পূজোয় না ঈদের সময়ে আমাকে নতুন শাড়ী দাও? আর কিছু জানতে চাও?
আমি অবাক আর বিস্মিত হয়ে বললাম না অনেক বলেছে। আর বলতে হবে না। তারপর বললাম সেলিনা, আমি শুধু ভাবছি এসব কথা উনি ভাবলেন কি করে? সেলিনা গম্ভীর হয়ে বলল, আমাদের আচরণ যদি ভাবার মত হয়, তা হলে ওনার ভাবতে দোষ কি? আমাদের আচরণ ভাবার মত মানে? বা তুমি ভুলে যাও কেন কলকাতাটাই সারা বাংলাদেশ নয়। অসংখ্য গ্রাম বাংলার অজস্র লোকাঁচার নিয়েই এই বাংলাদেশ। তুমি কি ভাবতে পার, বাংলার গ্রাম কি সেই ভাবে প্রস্তুত হয়েছে যাতে কোন কুমারী মেয়ে কোন অনাত্মীয় পুরুষের সঙ্গে বাইরে কাটালে লিভ টুগেদারে বিশ্বাসী হয়ে তার বাহবা দেবে? তারপরতো দুই ভিন্ন ধর্মের মানুষ। তোমাকে স্বামী ছাড়া অন্য কিছুভাবা, এদের পক্ষে কল্পনারও অতীত। মুখে তার দুষ্টু হাসি, চোখে তার সীমাহীন কৌতুক। আমি বললাম, সে না হয় বুঝলাম কিন্তু তুমি কি বললে? তার আগে বলত এ প্রশ্নের মুখোমুখি হলে তুমি কি বলতে? বললাম যা সত্য তাই বলতাম। মানে তুমি বলতে, সেলিনা আমার স্ত্রী নয়, ওর সঙ্গে আমার বিয়েই হয়নি, এই সবতো। এটাইতো সত্য। সব সত্যি কি সত্যিকারের সত্যি? যে সত্য মানুষকে আঘাত দেয় যে সত্য হৃদয়ের ভালবাসাকে ভুল বুঝতে সাহায্য করে, যে সত্য মানুষকে মানুষের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় সে সত্যি তোমার সত্যি হতে পারে, আমার সত্যি নয়? তা হলে তোমার সত্যি কি? তোমাকে বলব কেন?
মোনায়ারা বেগম এলেন, আর তাকে দেখেই নব বধুর সলজ্জতায় সেলিনা আঁচলটা তুলে দিল মাথায়? আমার অবাক হওয়ার পালা জেড গতিতে এগিয়ে চলেছে। উনি এসে বললেন, তোমাদের তো আগে চিনতামনা বাবা। আকবর বলছিল, তোমরা বিকালেই চলে যাবে। আমি বললাম, একটু তাড়া আছে কাকিমা। তাই যেতেই হবে। উনি আকুল ভাবে বললেন, দেখ বাবা আমার কোন মেয়ে নেই। নিজের গর্ভে তো কেউ এলোনা, যাকে নিজের সন্তানের মতো মানুষ করেছিলাম নিজের পাপের ফলে, সেও হারিয়ে গেছে। আমার এ ঘর যে শূন্য সেই শূন্য রয়েই গেল। অন্তত একটা রাত যদি থেকে যেতে বাবা। নিজেকে সান্ত্বনা দিতাম অন্তত একটা রাতের জন্য হলেও আমার মেয়ে জামাই আমার বাড়ীতে এসেছিল। আমি প্রতিবাদ করে বলতে চাইলাম কিন্তু কাকীমা। সেলিনা, আমি কি বলতে চাইছি অনুমান করতে পেরে বলল, এতে তোমার এত কি অসুবিধা হবে। একটা তো রাত। চাচী যখন এত করে বলছেন, ঠিক আছে চাচী, তুমি যাও, আমি ওকে বুঝিয়ে বলবো। তাই হোক মা, বলে উনি চলে গেলেন।
আমি সেলিনাকে বললাম, একি খেলা খেলতে চাইছো তুমি। তুমি এর পরিণতি জান? কি? কোনদিন আর মুখ দেখবে না এইতো। সব সময় ঠাট্টা ভালো লাগেনা সেলিনা। ও বলল,
আসলে ঠাট্টার মধ্যে আছে যে চরম সত্য
বুঝতে চাওনা তুমি তা।
তাই নীল আকাশ যখন
স্বপ্ন ডানায় ভর দিয়ে আসে তোমার কাছে
মনে হয় মিথ্যে ওড়নায় ঢাকা পড়ে গেছে
যৌবনের উদ্ধত অভিলাষ।
কিন্তু পেজামেঘের কোনায় কোনায়
যদি খুঁজে পেতে শিশির বিন্দু
মনে হতো, হয়তো তুমি খুঁজে পেয়েছে তোমার ঠিকানা।
আমি বললাম, সেলিনা, জীবন শুধু কাব্যের নয়। ভাল করে ভেবে দেখেছে চরম পরিণতিতে কি করবে তুমি।
ও বলল,
বিপদ যে তোমার দিক থেকে আসতে পারে ভাবিনি তা।
যদি আসেও প্রতিরোধ করার ক্ষমতা আছে আমার,
তুমি নিশ্চিত থেকো।
তোমার কৌমার্যের ক্ষত হোক চাইবনা কোন দিন
তবু যদি পতন আসে,
জীবনের সত্য বলে না হয় করলেই গ্রহণ।
তোমার মনে যে স্বপ্ন নেই
তাতো নয়।
না হয় বা অভিনয় হিসেবেই মেনে নিলে
হোকনা তা নিমর্ম নিষ্ঠুর।
