গিয়েছিলাম নিয়ে, আমিও সঙ্গে ছিলাম, ও বলেছিল, ডালিম এ পথ তোমার নয়, কেন এমন করছ? ফিরে এস। মানুষের ভালবাসার মাঝে খুঁজে নাও তোমার পথ। তুমি প্রেসিডেন্সির কৃতি ছাত্র, সেই পরিচয় নিয়ে মাথা উঁচু করে না দাঁড়িয়ে কেন এই ঘৃণ্য চক্রান্তের পথে এগিয়ে চলেছে। আরো অনেক কথা বলেছিল মেয়েটি। তার পর বলেছিল, কথা দাও ডালিম, এ পথ তুমি ছেড়ে দেবে, বিনিময়ে তুমি যা চাইবে আমি তোমাকে তাই দেব। ও বলেছিল পারবে না, দেওয়ার মনটাতো তোমার মরে গেছে। উত্তরে মেয়েটি বলেছিল একটা মানুষ যতদিন বেঁচে থাকে, ততদিন তার মন মরে না ডালিম, হয়তো ছাই চাপা হয়ে পড়ে থাকে, তারপর আবার কারো স্পর্শে সেই ছাই সরে গিয়ে আসল মনের সন্ধান পাওয়া যায়। তুমি পার না ফিবে আসতে? আবার নতুন করে জীবনকে সাজাতে ইচ্ছে করে না? করে বৈকি, কিন্তু কে আমাকে সেই নতুন পথের ঠিকানায় পৌঁছে দেবে? মেয়েটি বলল, আমি দেব ডালিম! ডালিম বলেছিল, কিন্তু যার মঙ্গলের জন্য আজ তুমি এসেছো, আমার নিষ্ঠুরতা থেকে যাকে তুমি বাঁচাতে এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার কি হবে? তার জন্য তোমাকে ভাবতে হবে না ডালিম, তুমি শুধু কথা দাও। এই পথ তুমি ছেড়ে দেবে! মেয়েটির চোখ ছল ছল করছিল। ডালিম বলেছিল, একটু ভাবতে সময় দাও। আমাকে তুমি বিশ্বাস করতে পারছ না? ভীষণ ইচ্ছে করছে তোমাকে বিশ্বাস করতে, কিন্তু তুমি তো আমার অতীত বা বর্তমান কোনটাই জান না। মেয়েটি বলল জানি! জান? তারপর ও বুলেছিল, জান তুমি আমারই জন্য তোমার মত আরেকটি মেযে আজ সমাজচ্যুতা। মেয়েটি বলল জানি। সবকিছু জেনেও তুমি চাইছো তুমি আমাকে পথ দেখাবে? দেখাবো ডালিম, কারণ আমার যিনি গুক, তিনি শিখিয়েছেন ভালবাসা মানুষের অন্তরের সম্পদ, ঐশ্বর্য দিয়ে হয়তো জগৎ কেনা যেতে পারে, কিন্তু হৃদয় কিনতে হলে চাই ভালবাসা। ডালিম বলেছিল, তুমি প্রান্তিকের কথা বলছো? মেয়েটি চুপ করেছিল। এদিকে জেল প্রহরী তাড়া দিচ্ছে সময় উত্তীর্ণ বলে। মেয়েটি আবারও বলল, তা হলে কি আমাকে খালি হাতে ফিরে যেতে হবে ডালিম? ডালিম বলল, এত বড় কঠিন সিদ্ধান্ত এত অল্প সময়ে নিই কি করে? তাছাড়া আমিতো একটা জীবন নষ্ট করিনি, অনেক জীবন নষ্ট করেছি, জীবনের সেই কাঠিন্য নিয়ে তোমার কথা কি ভাবে রাখবো একটু ভাবতে দাও। মেয়েটি বলল, তা হলে বল আবার কবে আসবো আমি। উত্তরে ডালিম বলেছিল, তুমি যে এসেছে এটাই আমায নতুন কিছু ভাবতে বলছে। ঠিক আছে তোমার কথা রাখতে পারবো কি না জানিনা তবু আগামী সপ্তাহে এসো। ছল ছল চোখে মেয়েটি বলল ডালিম ভাল থেকো। অনেক আশা নিয়ে তোমার কাছে এসেছিলাম, আমাকে ফিরিয়ে দিও না।
থামলেন বৃদ্ধ মোসলেমউদ্দীন। তার চোখ দুটিও বুঝি ছল ছল করে উঠেছে। সেলিনা বলল, মেয়েটি কি আপনার সঙ্গেই ফিরেছিলেন চাচা? হ্যাঁ জেলখানা থেকে এক সুঙ্গেই বেরিয়েছিলাম, বললাম চল মা আমার সাথে। ও যদি কোন দিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে তবে তোমার জন্যই আসবে। ও বলল, আজ থাক চাচা, যদি আপনার সঙ্গে যাওয়ার মত হয়, সাতদিন পরেই যাব, ও নীচু হয়ে আমার পা স্পর্শ করলো, বললাম কোথায় যাবে? বলল, আপাতত বর্ধমান, ও চলে গেল তারপর।
সূঁচ পড়লেও শব্দ হবে, এমনি নিঃশব্দতা বিরাজ করছে। ধীরে ধীরে বৃদ্ধ বললেন সাতদিন পরে স্থানীয় থানা সংবাদ দিল, ডালিম আত্মহত্যা করেছে। হয়তো তার পাপের প্রায়শ্চিত্য করে গেছে এই ভাবে। কিন্তু বিশ্বাস কর, ওর মৃত্যু আমাকে আঘাত দেয়নি, মৃত্যুতেই যেন ওর সব দোষ স্বলন হয়ে গেছে। এক গভীর নিঃশব্দতা নেমে আসে আমাদের মধ্যে। কিছুক্ষন পরে মোসলেমউদ্দীন বলেন এর থেকে বেশী আর কিছু জানিনা আমি। সেলিনা বলল ও আর আসেনি কোনদিন। জানিনা মা। যেদিন ওর মৃত্যু সংবাদ পেলাম, সেদিনই তো মেয়েটির আসার কথা ছিল, হয়তো এসেও ছিল। ও মেয়ে কোন মিথ্যে আশ্বাস দিয়েছে বলে মনে হয় না। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন বৃদ্ধ মোসলেমউদ্দীন। কিন্তু মা, এসব কথা জেনে তোমাদের কি লাভ? লাভ কিছু নেই চাচা। শুধু যাকে আপনারা রুকসানা বলে জানেন, ও যে রুকসানা নয় একথাটা আপনার জানা দরকার আর ওকেই খুঁজে বেড়াচ্ছি আমরা। অবাক হয়ে বৃদ্ধ বললেন রুকসানা নয়? তবে কে ওই মেয়েটি? ওইই রেহানা, আমার দিদি। হায় আল্লাহ আমি ওকে চিনতে পারলাম না। কি করে চিনবেন চাচা। ওকে তো আপনি কখনো দেখেননি। আর যে ছেলেটিকে ও পরবর্তী কালে ভালবেসে ছিল–হ্যাঁ, বৃদ্ধ বললেন, কি যেন নাম বলেছিল ডালিম। সেলিনা উত্তরে বলল প্রান্তিক, যাকে ও তার গুরু বলে পরিচয় দিয়েছিল, সেই প্রান্তিক অপনার সামনে। বৃদ্ধ ছল ছল চোখে তাকালেন আমার দিকে। বললেন তুমি প্রান্তিক? হ্যাঁ বলে বৃদ্ধের পা ছুঁয়ে প্রণাম করলাম। বৃদ্ধ কপালে করাঘাত করে বলতে লাগলেন, হায় আল্লাহ একি করলাম আমি। কেন তাকে আটকে রাখলাম না, কেন তাকে যেতে দিলাম। আল্লাহ্ কোনদিন আমায় ক্ষমা করবেন না, তারপর সেলিনার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি কে মা? আমি সেলিনা। তারপর সেলিনা জানতে চাইল, আপনাকে তো বলে গেছে ও বর্ধমান যাবে। ডালিমের কেউ কি আছে ওখানে? না মা, ডালিমের কোন বন্ধু বান্ধব থাকতে পারে কিন্তু কোন আত্মীয় স্বজন নেই। কিন্তু দুঃখ পেওনা মা, আমি চেষ্টা করবো এবং খুঁজে একদিন তাকে পাবই। পেতেই হবে আমাকে। খোদা–রহমানে রহিম, একদিন তার সাক্ষাৎ আমাকে মিলিয়ে দেবেনই। আকবর এসে ডাকল, চাচা, আপনার মেহমানদের জন্য মিষ্টি, মাছ ও মাংস এনেছি। বৃদ্ধ বললেন, যা তোর চাচীকে দিয়ে আয়।
