মনোয়ারা বেগম সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালেন আমাদের দিকে, বললেন, এ দুজনের কারো সঙ্গে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই আর চিনিও না। তাছাড়া এদের সম্পর্কে জানবার জন্য তোমরা আমাদের কাছে এসেছে কেন? সেলিনা বলল, কারণ ডালিমের একমাত্র পরিচিত এবং জীবিত আত্মীয় বলতে আমরা শুধু আপনাদেরই খোঁজ পেয়েছি, তাই ভাবলাম আপনারাই হয়তো দিতে পারেন কিছু তথ্য, কিছু প্রাথমিক জ্ঞান! বৃদ্ধ মোসলেমউদ্দীন বোধ হয় এতক্ষণে আমাদের আসল কারণটাও অনুধাবন করতে পেরেছেন, বললেন যা শেষ হয়ে গেছে, তা নিয়ে কেন টানাটানি করছ তোমরা। সেলিনা বলল, কারণ আমাদের বিশ্বাস রেহানা একদিন আপনার কাছেই এসেছিলেন এবং সেই নামেই একদিন ডালিমের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন, সঙ্গে ছিলেন আপনি, বলুন সত্যি কি না। বৃদ্ধ চুপ করে রইলেন। সেলিনা হেসে ফেলে বললে, কি হলো চাচা, মনে পড়ছে, কথা না বলে শুধু মাথা নাড়ালেন মোসলেমউদ্দীন। আবারও হেসে ফেলল সেলিনা। বলল, এতক্ষণ তাহলে আমাকে চিনতে চাইছিলেন না কেন চাচা? না তা ঠিক নয় বেটি, তারপর ধীরে ধীরে বললেন, সেদিন সন্ধ্যার অন্ধকারে একটি মেয়ে এসে দাঁড়ালো আমাদের বাড়ীতে। বর্ষায় ভিজে একা কার। শীতে ঠক ঠক করে কাঁপছে। আমি বাইরে এসে বললাম কে বেটি তুমি? কি যেন এক উৎকণ্ঠায় হাঁফাচ্ছে ও। বড্ড মায়া হল, মনে হল সারাদিন মেয়েটির কিছু খাওয়া হয়নি। বললাম কি নাম বেটি, বলল রুকসানা, আমি তাকে ঘরে আসতে বলে মোনাকে বললাম, ওকে একটা শুকনো কিছু দাওতো। মোনা ওকে ঘরে নিয়ে গেলেন এবং শুকনো কিছু পরতে দিয়ে আমাকে এসে বললেন, কেন এই উটকো ঝামেলা বাঁধালে বলতো। আমি ওকে শান্ত হতে বলে বললাম, উটকো ঝামেলাতো জীবনে কতই লেগে থাকে, আবার তা মিটেও যায় যেমন, আসেও নতুন করে। কিন্তু একটা অসহায় মেয়ে তোমার দরজায় এসেছে, আগে ওকে সুস্থ হতে দাও, তারপর না হয় ভাবা যাবে, ঝামেলাটা উটকো কি না।
মেয়েটি ভিজে শাড়ী জামা ছেড়ে এলো আমার কাছে। আদাব জানিয়ে বলল, আমায় আপনি চিনবেন না চাচা, আমিও আপনাকে চিনি না। মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে আপনার সংবাদ নিয়ে তবেই আসছি। বললাম সেন্ট্রাল জেল থেকে? মানে তুমি এক পলাতক কয়েদী? ও শিউরে উঠে, বলল, না চাচা, আমি কয়েদী নই। আমি একজনার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম, যিনি ঐ সেন্ট্রাল জেলেই আছেন। দেখা পেলে? না পাইনি, মানে অনুমতি পাইনি। কেন? অনুমতি দেয়নি কেন? ও আর কোন উত্তর না দিয়ে বলল, তাইতো অপনার কাছে এলাম। ওখানেই জানলাম, ওর আপনি আত্মীয়, এবং একমাত্র আপনিই ওকে দেখতে যান। আমি? কি নাম তার? আমি যার সঙ্গে দেখা করতে চাই তব নাম ডালিম। ডালিম? তুমি ওকে চেন নাকি? বলল, শুধু চিনি না চাচা ভালভাবেই জানি তাকে। আর তার আজকের এই অবস্থার জন্য আমিই দায়ী। তুমিই দায়ী? বুঝতে পারছি না বেটি? বলব সেকথা সেজন্যই তো এসেছি। তার আগে আমার সম্পর্কে আপনার এবং চাচীর যে সন্দেহ দেখা দিয়েছে, তা যদি থাকে, তা হলেতো কোন কথাই বলতে পারবনা।
দেখ বেটি, বললেন সেলিনাকে, আজ পর্যন্ত ডালিমের খোঁজে কেউ আসেনি। এখান থেকে ৩/৪ টি গ্রাম পরে ডালিমের বাড়ী। ও যখন অনেক ছোট, তখন ওর বাবা মা মারা যায়। আমি ওর দুর সম্পর্কের চাচা হই। ছোট্ট তিন বছরের শিশু ডালিমকে আমি নিয়ে আসি। আমার প্রথম বিবি সন্তান হীন অবস্থায় মারা গেলে, মোনাকে বিয়ে করি। কিন্তু আল্লাহ যেখানে সহায় নন সামান্য মানুষ হয়ে আমরা সেখানে কি করতে পাবি। তাই নিঃসন্তান আমাদের বুকে ওকে মায়ের আদরে গ্রহণ করলেন ওর চাচী। ওকে লেখা পড়া আমি আমার সাধ্যমত করার চেষ্টা করেছি। বরাবর স্কুলে ও ভাল ছেলে ছিল। কোন দিন দ্বিতীয় হয়নি। এখানকার পড়া শেষ হলে, ও প্রেসিডেন্সিতে পড়তে যায়। ওখানে গিয়ে প্রথম প্রথম তার বিরুদ্ধে কিছুই শুনিনি। পরে শুনলাম, ও একটা বদসঙ্গে ভীড়ে গেছে। তাকে ২/১ বার সাবধান করানোব চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু শোনেনি। পরে ওর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করি। তোমার চাচীকেও বলে দিই ওর সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখতে পারবেনা। কিন্তু যিনি ওকে সন্তান স্নেহে মানুষ করেছেন সেই মাতৃ মন কেমন করে মেনে নেবে এই কঠিন শাস্তি। মেয়েটি বলল, আপনি যা ভাবছেন তাতো সত্য নাও হতে পারে? জানিনা তুমি একথা কেন বলছ বেটি। তারপরে বলে চলেন এইখানে ও একটি মেয়েকে ভালবাসতো, আমাদেরও পছন্দ মেয়েটিকে। কিন্তু ওর অত্যাচারের শিকার হয়ে ও এখন সমাজেব বোঝ। শুধু তাই নয় কলকাতাতেও ও একটি মেয়েকে ভালবাসতো জেনেছিলাম মেয়েটিও ওকে ভালবাসতো, কিন্তু তাকেও অস্বীকার করে ওর কামনার আগুন জ্বলে উঠলো, ধাবিত হলো মেয়েটির বোনের দিকে। বাবা নই, তবু পিতৃত্বের অধিকারে তাকে মেনে নিতে পারলাম না। পারলাম না ক্ষমা করতে। ব্যথাভরা কণ্ঠে বলে চলেন, একদিন ও ওর দলবল নিয়ে ঢোকে সেই মেয়েটির বাড়ীতে। কামনার আগুনে ভস্মীভূত করতে চায় ওদের কৌমার্য। কোন বাবা তা মেনে নিতে পারে না। আমিও পারিনি। কোন উকিল পর্যন্ত। দিইনি ওর হয়ে। মনে মনে চেয়েছিলাম শাস্তি হোক ওর। কিন্তু এত বছরের সাজা হবে ভাবিনি। পরে যখন জানতে পারলাম, জেলখানায় বসেও সে বাইরের দলের সঙ্গে যোগসাজস রেখে প্রতিশোধ নিতে চাইছে। ভেবেছিলাম নিজের হাতে ওকে চরম শাস্তি দেব। মেয়েটি ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, না চাচা এ শাস্তি আপনি দেবেন না। আমি অবাক হয়ে তাকালাম ওর দিকে। বললাম তুমি কে মা? আমি ওর এক বন্ধু। কিন্তু চাচা, যাদের জন্য ওর এই শাস্তি হয়েছে চেনেন তাদের কাউকে? না মা চিনিনা, তবে শুনেছি ওদের একজনের নাম রেহানা। আর একজন সেলিনা। আপনি ওদের কোন খোঁজ নেননি? না নিইনি, কারণ, আমিতো ওকে জানি, এই গ্রামেই তোতার সাক্ষী রয়েছে। কিন্তু মা, তুমি তার সঙ্গে দেখা করবে কেন? কারণ যাদের কথা আপনি বললেন তারাও আমার বন্ধু। তাই সকলের মঙ্গলের জন্য যদি ও ওর পথ থেকে ফিরে আসে তা হলে কয়েকটা অমূল্য জীবন বেঁচে যেতে পারে। বুঝলাম মা। বেশ, নিয়ে যাবো তোমাকে একদিন।
