আমারও মনে হয়
পাহাড়ের উচ্চতা স্পর্শ করতে পারে না যে কুটিল হাত
আমার প্রেম পৌঁছিয়ে যায়
পতনের অপেক্ষা না রেখে,
আমি বললাম, তাই যদি বিশ্বাস কর, কেন আঘাত দাও।
আঘাত যদিবা দিই,
বাজে কি সে আঘাত অন্তরে তোমার?
প্রতিধ্বনিত বীণা তন্ত্রীতে
যেসুর ব্যাকুল হয়ে বাজতে চায়
কোন সে অযুহাতে
ফিরিয়ে দাও তাকে।
কেন মায়াবী রাতের
নিঃশব্দ অন্ধকার, তোমার বলিস্ট পেষনে
আলোকিত হয় না?
কেন নির্বাক মুখে
যে ভাষা মুখর হতে চায় বার বার
কোন সে কুয়াশায় ঢেকে রেখে
তার থেকে মুক্তি পেতে চাও তুমি?
যে কথা উচ্চারিত বহুবার
যে সুরের স্পর্শে প্রলম্বিত ইথার বাতাস
হৃদয় যেখানে কান্নায় উন্মুখ
ভীরু হৃদয় দুয়ারে আঘাত হেনে–
অন্ধ চোখের বোবাগলিতে
কান পেতে শুনেছ
কি উত্তাল সাগর তাব যে গর্জনে ঢেকে দেয়–
মুখর ঊর্মি, সে তরঙ্গ মালায়
ভুল করে কোন দিন যদি আস তুমি
ভীতি হীন মুহূর্তগুলো
যে স্বাক্ষর রেখে যায় আদিম স্পষ্টতায়
অরণ্যের নির্জনতা
সেও কি ভয়ংকর তার থেকে?
কে তোমাকে বেসেছিল ভাল,
জানেনা সেলিনা,
সে কেবলি জানে
প্রথম স্পষ্টতায় যে স্বাক্ষর রেখেছিল একদিন
তোমার হৃদয়ে আজো ভাস্বর – তা,
শুধু তুমি অন্ধ বলে
বার বার হাতড়িয়েছ পথ
খুঁজে পেতে চেয়েছে সে ভুলের ঠিকানা।
জান তুমি ভাল করে
সব কিছু জমা আছে
হৃদয়ের মাঝে,
তবু কেন খোঁজ বার বার।
হে অন্ধ পথিক,
যে পথ চেননা তুমি
জাননা পথের শেষ
তবুও পৌঁছাতে চাও
পথ প্রান্তে যে আছে অপেক্ষা করে।
হায় ভালবাসা, ভীরুমন–
সেলিনারে বুঝলেনা কোনদিন।
শুধু কথার যাদুতে
চেয়েছে যা পেতে
নিজের অন্তর চিরে, দেখেছো কি?
কি চেয়েছো তুমি?
তবু যদি মনে হয়,
আমি ছাড়া সবই অন্ধকার
সকলি শূণ্য, শূণ্য চারিদিক
রিক্ত হস্ত ক্লান্ত বেদনায়
এতদিন যা চেয়েছ সবই ভুল
সত্য শুধু সেলিনার প্রেম।
ধর বন্ধু হাত, তুলে নেও হৃদয়ে তোমার
নামুক তৃষ্ণাতুর ওষ্টদুটি
প্রতিদান হীন।
এইতো এসেছি আমি,
চেয়েছি তোমার কাছে জীবনের দাম,
যে আজ হারিয়ে গেছে
হারতেই জন্ম যার
কেমনে করবে জয়ী, তারে তুমি,
হে অন্ধ পথিক।
১৫. থামল সেলিনা
থামল সেলিনা। কি সহজ সাবলীলতায় নিজেকে মেলে ধরল ও। সুরও ছন্দে এক অনবদ্য কবিতা যেন? না এমন করে কেউ আজো হৃদয়ে দোলা দেয় নি। গর্ব ও আবেগে সত্যি তাকে বুকের কাছে টেনে নিতে চাইলো মন। কিন্তু নির্জন অন্ধকার যা দিতে পারেনি, তাই দেবে এই প্রখর আলোক ধারা? হায় ভালবাসা তোমাকে বুঝিনি কোন দিন। আজো তাই অন্ধকারে চির রহস্যে ঢাকা থাক তুমি। যদি প্রেমের প্রদীপ কোন দিন জ্বলে আমার হৃদয় মন্দিরে, সেইদিন খুঁজে নেবো। আজ তুমি থাক, গোপনতার আবরণে নিজেকে আচ্ছাদিত করে।
সেলিনা বলল, আমার কথাতো বললাম, এবার বল কি চাও তুমি আমার কাছে? বললাম যা তুমি দিতে চাও, তাই দাও নিঃস্ব করে হিংসা অথবা ভালবাসা, ঈর্ষা অথবা রাগ। বলল, দিলাম তোমাকে আমি সর্বস্ব উজাড় করে, এবার পারবে কি মেলাতে, না মেলা অংক তোমার। শুধু অপলক তাকিয়ে বললাম পারব, সেলিনা পারব।
বাস্তব যখন মিথ্যে হয়ে স্বপ্নের জগতে ডানা মেলেছে, আকবর বললো, এসে গেছি সাহেব, আর গাড়ী যাবে না, এবার হাঁটতে হবে। হঠাৎ যেন সম্বিৎ ফিরে পেয়ে নেমে এলাম ভূমিতে। বললাম তাইতো, একটু চা খেলে হয় না? আকবর বলল, আপনারা বসুন, আমি নিয়ে আসছি।
মোসলেমউদ্দীন বাড়ীতেই ছিলেন। গ্রামের বাড়ী যে রকম হয় সে রকম বাড়ী। বয়স হয়েছে ভদ্রলোকের। আকবর বললেন মোসলে চাচা, একজন সাহেব এবং একজন মেম সাহেব আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন, নিয়ে আসব? উনি বললেন, নিয়ে আসবি? আচ্ছা আয়।
সেলিনা এগিয়ে গিয়ে বলল, আদাব চাচা, আমার নাম সেলিনা, ঘোলাটে চোখ তুলে তাকালেন বৃদ্ধ। কি যেন খুঁজছিলেন সেলিনার অবয়বে। বললেন, কি নাম যেন বললি বেটি। সেলিনা। মাথা নাড়ালেন বৃদ্ধ! না সেতো নয় অস্পষ্ট উচ্চারণে মনে মনে বললেন বৃদ্ধ। সেলিনা বললেন, আমাকে চিনতে পারছেন না চাচা? আরার বৃদ্ধ তার ঘোলাটে চোখ দুটো যতটা সম্ভব বিস্ফোরিত করে তাকালেন ওর দিকে, কিন্তু কিছু না বলে আবার চুপ করে গেলেন। আকবর বললেন, চাচা মেহমানদের কিছু খাওয়াতে হবে তো, ইয়া আল্লাহ তাইতো। তা আকবর দেখতো বাপ ওদের জন্য কি করা যায়? আকবর চলে গেলেন। সেলিনা আবার ও বলল একদম চিনতে পারছেন না চাচা, সেই যে বেশ কিছুদিন আগে একবার এসেছিলাম। মোসলেমউদ্দীন কি যেন ভাবলেন। হয়তো মনে করবার চেষ্টা করলেন, সত্যি একে আগে দেখেছেন কি না। সেলিনা বলল, কি চাচা মনে পড়ছে তো! বৃদ্ধ যেন কিছু একটা খুঁজে পেয়েছেন, এই ভাবে বললেন, কি জানি বেটি। বয়স হয়েছে, সবতো আজকাল আর মনে থাকে না। আমি বরং তোমার চাচীকে ডাকছি। মোনা বলে হাক ছাড়লেন বৃদ্ধ মোসলেমউদ্দীন। মোসলেমউদ্দীন যতটা বৃদ্ধ, মোনা অর্থাৎ মনোয়ারা তা নয়, তাকে এখনো যুবতী বলে অনুমান করা ভুল নয়। সেলিনা এগিয়ে এসে বলল, আদাব চাচী, আসলামো অলাইকুম, ওয়ালাইকুম আসলাম, বললেন মনোয়ারা বেগম। তারপর বললেন, তোমাদের তো চিনতে পারলাম না মা। আমাদের চেনার কথা নয় চাচী, তারপর আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ওর নাম প্রান্তিক। রেহানা নামের একটি মেয়েকে খুঁজতে বেরিয়েছে, আর আমি এসেছি ডালিমের জন্য।
