আমরা চলে এলাম। ঘরে এসে জামা প্যান্ট ছেড়ে বাথরুমে গিয়ে ভাল ভাবে স্নান করলাম। তারপর পাজামা পাঞ্জাবি পরে নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। আর সারদিনের ক্লান্তি শেষে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চোখে ঘুম নেমে এল।
খানিক পরে এল সেলিনা, বসল আমার মাথার কাছে। তারপর আমার সঙ্গে কোন কথা না বলে নীরবে আমার মাথার চুলের মধ্যে তার আঙুল চালিয়ে বিলুনী কাটতে লাগল। এক সময় বলল, শরীর খুব খারাপ লাগছে প্রান্তিক ভাই? আমি চোখ মেলে দেখি ও আমার শিয়রের কাছে বসে আছে। বললাম, কতক্ষণ এসেছো? অনেকক্ষণ। ডাকলেনা কেন? তোমার ঘুমন্ত মুখটা দেখতে ভীষণ লোভ হচ্ছিল তাই। আমি আর কোন কথা না বলৈ উঠে বসলাম। বললাম এবার তুমি শুয়ে পড়ো, আমি তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। না। কেন না? ও দিকে না গিয়ে বলল, তোমার কি মনে হয় না রুকসানাই রেহানা। ঠিক বুঝতে পারছি না, হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। মানে? আমার কি মনে হচ্ছে জান? কি? তুমি আসনিতো সেলিনা? ও অবাক হয়ে গেল, বলল তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? না মাথা আমার খারাপ হয়নি, আগে হয়তো এত বুঝতে পারতাম না। কিন্তু এখন বুঝি। রেহানা এটা পারবেনা। রেহানা পারবে না, আর আমি পারবো, একথা ভাবলে কেন? রেহানা আমাকে ছেড়ে যেতে পারলেও তুমি পারবেনা এই বিশ্বাস আছে বলে বিশ্বাস তোমার যেমনই থাকুক প্রান্তিক ভাই রেহানার কাছ থেকে তোমাকে আমি কোনদিনই কেড়ে নিতে পারবো না। আর তা ছাড়া তুমি যা ভাবছ, সে তোমার কল্পনা, বাস্তব নয়। একটা কথা জেনে রাখ, তোমার জন্য আমি যুদ্ধ করতে পারি, নিজের জীবনও হয়তো দিতে পারি, কিন্তু তোমার জন্য করুণা ভিক্ষা করতে পারি না কারো কাছে, তাতে আমার আত্ম মর্যাদায় আঘাত লাগে। তাহলে কাল আমরা যাচ্ছি ঠিকতো। অবশ্য যাবো। যাবে? কেন, তুমি আমাকে অবিশ্বাস করছ? একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বললাম, অবিশ্বাস নয় সেলিনা, অশ্রুকণার ওখানে ওই কয়টা দিন আমার জীবনে যে কি পরিবর্তন এনে দিয়েছে তোমাকে বোঝাতে পারবো না। যেমন? আগে বুঝতে পারতাম না আমি কি চাই? এখন কি বোঝ? ভীষণ ভাবে বুঝি? কি চাও তুমি? তোমাকে ছাড়া আমার এক মুহূর্তও চলবে না এ সত্য আমি, ওখানেই আবিস্কার করেছি। না, প্রান্তিক ভাই, কোন সত্যই তুমি আবিস্কার করতে পারনি। অবশ্য তার জন্য তোমাকে দোষ দেওয়া যায় না। আমিও যদি তোমার মতো জটিলতার মুখোমুখি হতাম, আমার অবস্থাও তোমার মত হতো। তুমি আমায় বিশ্বাস করতে পারছে না? কি যে বল প্রান্তিক ভাই! আজ যদি তুমি বল সেলিনা, তোমার সঙ্গে যা করেছি সব অভিনয়! আমার বিশ্বাস করতে কোন কষ্ট হবে না। কেন জান? আমি বললাম কেন? আমার নিজেরও মাঝে মাঝে মনে হয় এই যে মান অভিমান ঈর্ষা ও হিংসা, তোমাকে পাওয়ার জন্য যে আকুলতা সেও কি অভিনয় নয়? যদি অভিনয় না হয় তা হলে কেন বলতে পারিনা প্রান্তিক ভাই, যে দিন প্রথম তোমায় দেখেছিলাম সেদিনই তোমায় ভালবেসেছিলাম। সেলিনা? না প্রান্তিক ভাই ওই ভাবে আমাকে দুর্বল করে দিও না। কারণ আমি জানি, রেহানা সামনে এসে দাঁড়ালে তুমি হারিয়ে যাবে। কেমন করে সেই বাস্তবকে মেনে নেবো? তুমি হয়তো কোন দিন, বলনি, কিন্তু বুঝতে পারি, তোমরা সবাই আমার সম্পর্কে একটা কথা ভাবো, তা হলো আমার বাঁধন থেকে তুমি মুক্তি পাবে না। কি ভাবো না? আমি অবাক হয়ে যাই ওর কথায়? নিজেকে সংযত করে বলি, কে কি ভাবে জানি না সেলিনা, আমি শুধু জানি তোমার বাঁধনেই চাই আমার পূর্ণ মুক্তি। তারপর ওকে বুকের ওপরে টেনে নিয়ে অপলক ওর চোখে চোখ রেখে বলি, আমায় কি তুমি বুঝতে পারনা সেলিনা? পারি। অ হলে এত দ্বিধা কেন? নিজের মুখটা আস্তে নামিয়ে আমার তৃষ্ণাতুর ঠোঁট দুটি রাখতে চাই নিরাপদ আশ্রয়ে। ও আঙুল দিয়ে বাধা সৃষ্টি করে বলে, আজ না। তোমার ভিতরের এ দুর্বলতা আমায় যে কি কষ্ট দিচ্ছে, সে তোমাকে বোঝাতে পারবো না, তবু আজ নয়। আমি ওকে ছেড়ে দিই। বাইরের দরজায় কে যেন নক করে। ও আমার বিছানা থেকে উঠে গিয়ে নিজের বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। মাঝের দরজাটা খোলাই থাকে। দরজাটা খুলেই দেখি প্রতীমবাবু, বললাম আপনি! হ্যাঁ আমি, ভাবলাম ঘুমিয়ে পড়লে কি না। ডিলার দিয়েছে বেশ কিছুক্ষন। সেলিনাকে নিয়ে চলে এসো, দেরি করো না।
প্রতীমবাবুর কথা মতো গাড়ী আসে। ড্রাইভারের নাম আকবর আলী। আমি ও সেলিনা গাড়ীতে গিয়ে বসি। ওকে বলি, আকবর ভাই, তুমি মোসলেমউদ্দীন সাহেবের বাড়ী চেনো? চিনি। কত পথ হবে? তা প্রায় দু আড়াই ঘন্টা লাগবে। তাহলে চল।
চারিদিকে সুবজ শুধু ধান আর ধান। আমি আর সেলিনা। যেন স্বপ্নের ডানায় ভর দিয়ে চলেছি। বার বার মন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। অথচ কি আশ্চর্য, আমরা চলেছি, রেহানাকে খুঁজতে, সেই রেহানা, যাকে বাদ দিয়ে আমি কোন দিনই ভাবতে পারিনি কিছু। সেলিনার কথা যদি সত্যি হয়, যদি রেহানাকে খুঁজে পাই, ওর সামনে আমি কি ভাবে দাঁড়াবো, কি বলবো ওকে আমি!
সেলিনা বলল কি ভাবছো? ভাবছি আমার অতীত ও বর্তমান। না তুমি তা ভাবছে। তাহলে কি ভাবছি? ভাবছে, রেহানা যদি সামনে এসে দাঁড়ায় কি ভাবে বিদায় দেবে আমাকে, বল সত্যি কি না। ভয় নেই প্রান্তিক ভাই, রেহানাকে খুঁজে পেলে আমি কোন দিন কোন দাবী নিয়ে তোমার কাছে আসবে না। প্রতীমবাবুকে বলব, অদির মতো আমাকেও একটু আশ্রয় দিন। তাতে তুমি মুক্তি পাবে? মুক্তি তো আমি চাই না। তবে? তোমার বুকে আগুন জ্বালাতে চাই প্রান্তিক ভাই আর সেই আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাড়খাড় হয়ে যেতে চাই। তুমি ভাবছো কি করে রেহানাকে খুঁজে পেলে আমার বুকে তুমি আগুন জ্বালাতে পারবে? তুমিতো জ্বলছে, নতুন করে জ্বালাবার দরকার হবে না। আচ্ছা সেলিনা রেহানাকে তুমি হিংসা কর? রেহানাকে নয়, আমি হিংসা করি তোমাকে! সত্যি আমি বুঝতে পারি না, তোমাদের কাউকে। বুঝতে পারনা কেন? না বোঝার মতো তো আমার কোন আচরণ নয়, রেহানা বা অশ্ৰুদির মতো, দুঃখকে গোপন করতে পারি না আমি। রেহানা তার মনের মণি কোঠায় কি ভাবে তোমাকে জায়গা দিয়েছে বলতে পারব না, কিন্তু আমি কেমন ভাবে তোমাকে পেতে চাই তাতো অস্পষ্ট নয়। আমি রক্ত মাংসের মানুষ, আমার ব্যাথা আছে বেদনা আছে–আর তাকে প্রশমিত করার জন্য আমি কোন অবয়বহীন আদর্শের পিছনে ছুটি না। তাইতো তোমার কাছে আসি আমি বারবার বিচিত্র রূপে। কিন্তু তুমি? যখনি মনে হয়, আর কোন ভয় নেই, আমার বাধন কাটাবারও কোন উপায় নেই, তখনি আবার ভয় হয়, এই বুঝি তুমি হারিয়ে গেলে। এই বুঝি তুমি অশ্ৰুদির হয়ে গেলে, অথবা রেহানার। কেন এমন হয় বলত। বললাম তুমি কি বৈষ্ণব কবির সেই লাইনটা জান? কোনটা। যেখানে কবি বলেছেন দুহ ক্রোরে দুহ কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া অথচ তাদের প্রেম ভাষায় অবর্ণনীয়। তারা নিজেরাও জানে, তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ কেউ ঘটাতে পারবে না, তবু ভয় নাই যায়। সেলিনা বলল–
