অশ্রুকণা ও সেলিনা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি টেলিগ্রামটা তাদের হাতে দিয়ে বললাম, সত্যবাবু ৫ তারিখ তো আজ তাইনা? আপনি জানেন কি উনি কেন আসছেন? তা তো বলতে পারবো না প্রান্তিক বাবু।
অশ্রুকণা টেলিগ্রামটা পড়ে সেলিনার হাতে দিয়ে বলল, তোমরা যাও প্রান্তিক। আমি এখন আর যাব না। জানতে চাইলাম, কেন টেলিগ্রাম করেছেন পড়ে কিছু মনে হল? না বুঝতে পারছি না, হয়তো এমনও হতে পারে ব্যক্তিগত কোন কাজেই হয়তো আসছেন।
সেলিনা বলল আমার মনে হয় অশ্রুদি, কোন বিশেষ সংবাদ আছে, এবং তা মেদিনীপুরেই। তারপর আমাকে বলল প্রান্তিক ভাই, রেহানার কোন ব্যাপার ওকে বলেছ। কি? না আমি কিছু বলিনি, তবে ব্যাপারটি উনি জানেন। তুমি বলনি অথচ জানেন? আমি বললেও কেউ না কেউ হয়তো বলেছে। তাই বল।
সত্যভূষণবাবু বললেন, তাহলে আর দেরি করা ঠিক হবে না, যতটা তাড়াতাড়ি যাওয়া যায় ততই ভাল। বললাম বেশ চলুন তা হলে। সেলিনা বলল, অশ্ৰুদি তোমার কি যেতে খুব অসুবিধা হবে? বলল অসুবিধাটা তোমাকে বোঝাবার নয়। তোমাদের সঙ্গে গিয়ে একা একা ফেরার যে দূর্বিসহ যন্ত্রণা, তার ভেতর পড়তে চাইনা, এরপর যখন আসবে, তোমাদের সূঙ্গে যাব। এবার আর অনুরোধ করোনা। সত্যভূষণবাবু বললেন, আমি বাইরে আছি, দেখি ওরা এল কিনা। উনি বেরিয়ে গেলেন। সেলিনাও পাশের ঘরে চলে গেল ব্যাগ আনার জন্য। অশ্রুকণা বলল, কিছু বলবেনা? বললাম তোমার মন শান্ত হোক কণা, ঈশ্বর যেন তোমাকে সেই শক্তি দেয়। যাওয়ার আগে আমার কাছে তোমার কিছুই চাওয়ার নেই বলল অশ্রুকণা। কে বলল নেই? তাহলে বল। কি তোমাকে দেব। যাতে আমার সব শূণ্যতা আর অভাব পূর্ণতায় ভরে যায় তাই আমাকে দাও কশা। আমি দিলে তুমি পারবে নিতে? পরীক্ষা করেই দেখনা? বাঁধা দেবে নাতো? না বেশ, তাহলে নিয়ে যাও বলে আচমকা ও হাঁটু ভেঙে যে ভাবে মাথা নোয়ালো, তাতে আমার বিস্ময়ের অবধি রইলনা। তবু তাকে বাধা না দিয়ে বললাম, তোমাকে কিছু দিতে না পারলেও আমি কিন্তু তোমার দান হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করে নিয়ে যাচ্ছি। দুঃখ পেও না কশা। অপেক্ষা করো। সত্যি? হ্যাঁ সত্যি। আমি আসব, আবার আসব তোমার কাছে কশা। এমন করে তোমার দানকে স্বার্থপরের মত কেবল বাক্সবন্দী করে রাখতে পারবো না। যদি না পার তাহলে জাগতিক এমন কিছু দিয়ে যাও, যা আমার একাকী নিঃসঙ্গতায় সব সময় আমার পাশে থাকবে। বেশ, বলে, আমার পার্স থেকে একটা পাসপোর্ট সাইজের ফটো তার হাতে তুলে দিয়ে বললাম, জানিনা অহংকারটা বেশী হয়ে গেল কিনা।
উজ্জ্বল চোখদুটি চিক চিক করে উঠল। দু হাত পেতে নিল আমার ছোট্ট উপহার, তারপর বলল সেলিনাকে দেখ প্রান্তিক। ওর অভিমানে যেন কোন ভাবে ঘা না লাগে এই অনুরোধ।
সাতটার একটু পরে আমি ও সেলিনা মেদিনীপুর হোটেলের ৪ নং ঘরে নক করলাম। বেরিয়ে এলেন প্রতীমবাবু। আমরা ওনাকে প্রণাম করলাম। প্রতীমবাবু বললেন, জায়গাটা কেমন লাগলো সেলিনা? ভীষণ ভালো। তাহলে কদিন থেকে এলে না কেন? কি ভাবে থাকবো? কেন অশ্রুর কাছে। অশ্ৰুদিরতা থাকার অধিকার আছে, কিন্তু আমাদের তো তা নেই। অনধিকারে আর কদিন থাকবো বলুন। তাহলে তুমি অধিকার চাও? হাসতে হাসতে প্রতীমবাবু বললেন। চাইলেই বা আমাকে দেবে কে? গলাটা বোধ হয় একটু ভারি হয়ে এসেছিল। আমি অবাক হয়ে তাকালাম ওর দিকে। তবে কি অশ্রুকণার কাছ থেকে বিদায়ের সেই ছোট্ট দৃশ্যটুকু তার দৃষ্টি এড়িয়ে যায় নি? এরই মাঝে প্রতীমবাবু বেল দিয়ে বেয়ারাকে ডেকে পাঠালেন, এলে স্নাকস্ ও কফির অর্ডার দিলেন যেমন, তেমনি তিন জনের ডিনারেরও। আমার হাতে ঘরের চাবি দিয়ে বললেন ওর ঘরটা দেখিয়ে দাও প্রান্তিক। আচ্ছা বলে সেলিনাকে বললাম চল। ওর ঘরে ঢুকে ও বলল, রাতে আমাকে এখানে একা থাকতে হবে? অদ্ভুত প্রশ্ন। বললাম, অসুবিধে হবে? অসুবিধা হলে কি করবে তুমি? থাকবো তোমার কাছে। বাজে কথা বলল না প্রান্তিক ভাই? কোনদিনই তুমি আমার কাছে থাকতে পারবেনা। একি বলছ সেলিনা। আজ রাতে যদি সত্যিই তোমার কাছে থাকি, কাল মুখ দেখাতে পারবে? আগে থাকার যোগ্যতা তো অর্জন করো, তারপর ভাবা যাবে, কি হবে আর কি হবে না। বললাম ঠিক আছে প্রতীমবাবু কফির অর্ডার দিয়েছেন। বেয়ারাকে দেখলাম, কফি নিয়ে ঢুকলো, তুমি তাড়াতাড়ি এসো। যাচ্ছি। আমি কিন্তু একা একা এ ঘরে থাকতে পারবো না বলে দিচ্ছি।
একটু পরে শাড়ীটা বদলে চোখে মুখে জল দিয়ে এলো সেলিনা। প্রতীম বাবু বললেন, একা একা থাকতে ভয় লাগবে তো। নানা আমার কোন অসুবিধা হবে না বলে সেলিনা তাকালো আমার দিকে। লজ্জার কিছু নেই। ওই ঘর দুটোয় ভিতরে দরজা আছে, ভয় করলে দরজা না হয় খোলা রেখ। কিন্তু আমি তোমাদের আসতে বলেছিলাম, কারণ, এখানকার সেন্ট্রাল জেলেতো ডালিম মারা গিয়েছিল তাই না? আমরা উভয়ে তাকালাম ওনার দিকে। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি ডালিমের মৃত্যুর দিন কয়েক আগে রুকসানা নামে একটি মেয়ে ওর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। আমার মনে হয় মেয়েটি রেহানা হতে পারে। আসলে ব্যারিষ্টার ভট্টাচার্য সাহেব, আমাকে বলেছিলেন, আপনিতো ওখানে যাচ্ছেন, খোঁজ নিয়ে দেখবেনতো রেহানা নামে কোন মেয়ে ডালিমের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন কি না। আমি বললাম, হঠাৎ ডালিমের মৃত্যুর এতদিন পরে আপনার এ খোঁজ নেওয়ার দরকার হলো কেন? উনি আমাদের কোম্পানীর সলিসিটর, তাকে অনুরোধ করেছেন তোমার মা। আমরা যুগপত বিস্মিত হলাম। অবশ্য মেয়েটির একটি ঠিকানাও দেওয়া আছে প্রযত্নে মোসলেমউদ্দীন আমি তার বাড়ীতেও খোঁজ নিয়েছি, মোসলেমউদ্দীন ডালিমের এক দূর সম্পর্কের চাচা। কিন্তু ওখানে ককসানা নামে কেউ থাকে না। ওই নামে উনি কাউকে চেনেনও না। মনে হয় মেয়েটি তার আসল নাম সাক্ষাৎ প্রার্থীর খাতায় লেখেনি। আমার সন্দেহটা অমূলকও হতে পারে। তবু প্রান্তিক আমি চাইছি তোমরা দুজনেই মোসলেমউদ্দীনের বাড়ীতে একবাব খোঁজ নাও। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই তিনি ডালিমের কাছে আসতেন। এতক্ষণে সেলিনা বলল আমার মন বলছে রুকসানাই রেহানা। আমারও তাই মনে হয়। বললেন প্রতীম চৌধুরী। তারপর নিজেই বললেন, এবার তোমরা যাও। সকালে আমি একটা গাড়ী ঠিক করে রেখেছি। ড্রাইভার আমার নিজের লোক। তাকে বিশ্বাস করে তোমরা যে কোন জায়গায় যেতে পারো। তোমাদের আরো যদি কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হয় ও তোমদের নিয়ে যাবে। এবার এস তোমরা আমার কিছু অফিসিয়াল কাজ আছে।
