না এখানে এসেও ভাবিনি, সেন্ট্রাল জেলে গিয়ে এই ভাবে তার একটা খোঁজ নেওয়া যেতে পারে, যদিও স্থির বিশ্বাস, ডালিমের সঙ্গে রেহানার দেখা হয়েছিল, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম কণা, জীবন থেকে রেহানাকে মুছে দিতে পারবো, এ তুমি ভাবলে কি করে? সেলিনা : তার দাবী নিয়ে এসেছে বলে রেহানাতো মুছে যাওয়ার নয়। বলেছে সে তোমাকে ভালবাসা শিখিয়েছে, হয়তো সে তোমার হৃদয়ের উপলব্ধি। কিন্তু আমার জীবন দর্শনতো তারই দান। সব কিছুকে, কি ভাবে, জীবনের সঙ্গে সহনশীল করতে, কি ভাবে জীবনকে মৰ্য্যাদাময় করতে হয়, এসব আমাকে সে তার নীরবতা, উপলব্ধি আর অনুভব দিয়ে শিখিয়েছে। না কণা, জীবনে সেলিনা যেভাবেই আসুক না কেন, তোমাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করবো না, বরং তুমিও চলনা সত্যবাবুর সাহায্যে আমি, তুমি ও সেলিনা যদি তার কোন খোঁজ পাই।
অশ্রুকণা বলল, এত আবেগ তাড়িত হয়োনা প্রান্তিক। তোমরাই যাও। প্রাথমিক খোঁজ যদি পাও, আমাকে জানিও। আমিতো এখানেই থাকবো, তার সর্বশেষ সংবাদ পাওয়ার জন্য আমি যথাসাধ্য করব। ওকে আর বেশী কথা বাড়াতে না দিয়ে প্রসঙ্গটায় ইতি টেনে দিলাম।
আজ চলে যাব। মনটা সকাল থেকে ভীষণ ভারাক্রান্ত অশ্রুকণাকে নতুন করে কোন সান্ত্বনা দেওয়ার নেই আমার। নিজের সান্ত্বনা সে নিজেই খুঁজে পেয়েছে। এখানকার পরিবেশ, এখানকার মানুষ, তার সহকর্মীরা সর্বোপরি সত্যভূষণবাবু সবকিছু মিলে হয়তো অশ্রুকণাকে নতুন ঠিকানার সন্ধান দিতে পারবে, এই আশা নিয়েই যাচ্ছি। সেলিনাও একয়দিনে জীবনের আমূল পরিবর্তন করে ফেলেছে। ও বোধ হয় সার সত্য বুঝেছে যে হিংসা বা ঈর্ষা দিয়ে কোন হৃদয় জয় করা যায় না, তার জন্য যে স্বার্থ হীন ভালবাসা দরকার, সে তা অর্জন করেছে বলে মনে হয়।
মনের মতো করে সাজিয়ে দিয়েছে সেলিনাকে অশ্রুকণা। ওর সব থেকে দামী শাড়ী আর গয়না দিয়ে সাজিয়েছে ওকে। সেলিনা বলল, এ তুমি কি করলে অশ্ৰুদি তোমার সব থেকে দামী শাড়ী আর গয়না আমাকে দিয়ে দিলে? অশ্রুকণা বলল, এসব তো ভাল লাগার জন্য। তোমাকে পরিয়ে আমার ভাল লাগলো। তাই তোমাকে সাজিয়ে দিলাম। শুধু ভাল লাগার জন্য অদি। তা ছাড়া আর কি? তারপর বলল সেদিন রাতে যখন তুমি প্রান্তিকের সাজানো সাজে আমায় প্রণাম করলে, অবাক হয়েছিলাম সেলিনা, কি আছে ওর মধ্যে যা তোমাকে এমনি করে পরিবর্ক্স করে দিল। ভুল অশ্ৰুদি আমার মধ্যে যা কিছু পবিবর্তন সে তোমারই দান। গর্ব হয়েছিল কি না জানিনা সেলিনা, কিন্তু আনন্দে দু চোখে যেন বান ডেকে এসেছিল। ভেবেছিলাম, সময় যদি আসে আমিও একদিন সাজাবো তোমায়। তাই সাজিয়েছি বোন, অন্তরের কৃতজ্ঞতায় যদি গ্রহণ কর, অভিমানে যদি ছুঁড়ে ফেলে না দাও সেই হবে আমার পুরস্কার। সেলিনার গলা যেন আবেগে থর থর করে কাঁপছে, বলল, অশ্ৰুদি, তোমাদের ভালবাসার সত্যি কি আমি যোগ্য! অশ্রুকণা বলল সেতো জানিনা ভাই। যোগ্যতার পরিমাপ কি করে করতে হয় তাও জানিনা। একদিন মনে করতাম মিনতি পিসির বেছে নেওয়া জীবন যেন কোন ধনীর দুলালির হঠাৎ খেয়াল। কিন্তু যেদিন সত্যিটাকে জানলাম, মনে হলো মানুষকে আমরা কত ভুলই না ভাবি, মিনতি সেনের সর্বস্ব ত্যাগ, আমাকে যেন এক নতুন সত্যের সন্ধান দিল। না, সেলিনা প্রান্তিককে তোমার হাতে তুলে দিতে, আমার কোন পিছুটান নেই। সত্যি কথা বলতে কি, মনে যে কোন লোভ ছিল না তা নয়, কিন্তু এখানে এসে জানলাম লোভই জীবনের সর্বস্ব নয়, তাকে, ত্যাগের মধ্যে লুকিয়ে আছে জীবনের সার্থকতা। হয়তো অনেক সময় ভুল বুঝেছ আমাকে, আমার আচরণও যে তাতে ইন্ধন যোগায় নি, তা কিন্তু নয়। ওর চোখ দুটি ছল ছল করে উঠলো।
আমি শুনতে পাচ্ছি, সেলিনা বলছে, এই খানে তুমি জয়ী অদি, ত্যাগের মধ্যে তুমি পেয়েছে সত্যের সন্ধান, আর আমি, ত্যাগ চাইনি, জীবনের সর্বস্ব দিয়ে পেতে চেয়েছি, পেয়েছি কি না জানি না, তবু প্রতিমুহূর্তে ভয়, এই বুঝি হারিয়ে যাবে। কেন এত ভয়? ওকি তোমাকে গ্রহণ করেনি? যে উপলব্ধিতে তোমার জয় হয়েছে সেই উপলব্ধিটুকু যে আমার নেই। প্রতি মুহূর্ত মনে হয় আমি রেহানার ছায়ামাত্র। রেহানার সাথে ওর যেভাবেই দেখা হোক, যদি তা হয় কোনদিন, ওর জীবন থেকে মুছে যাবে সেলিনা। ত্যাগের মধ্যে দিয়ে তো আমি সত্যের সন্ধান করিনি। যদি সেই শুভ মুহূর্ত আসে ওর জীবনে, আমি কি করব বলতে পার অদি?
একটু দ্রুত পায়ে সত্যভূষণ বাবু এলেন। এসেই কৈফিয়ৎ দেওয়ার ভঙ্গীতে বললেন, একটু দেরি হয়ে গেল। আসলে একটা টেলিগ্রাম এসেছে কলকাতা থেকে। অশ্রুকণা বলল কোন দুঃসংবাদ। প্রাণ খোলা হাসিতে নিজেকে প্রকাশ করে সত্যভূষণ বাবু বললেন আমাদের একটা বদ্ধমূল বিশ্বাস, টেলিগ্রাম মানেই দুঃসংবাদ। না অশ্রুদেবী এটা দুঃসংবাদ নয়। পাঠিয়েছেন এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের যিনি প্রাণ পুরুষ সেই প্রতীম চোধুরী প্রান্তিক বাবুর জন্য। আমি অবাক হয়ে বললাম, আমাকে? হ্যাঁ প্রান্তিকবাবু আপনাকে। টেলিগ্রামটা উনি আমার হাতে তুলে দিলেন। যদিও টেলিগ্রাম, তবু আসলে একটা চিঠি। প্রতীম বাবু লিখেছেন, প্রান্তিক, আমি মেদিনীপুর হোটেলের ৪ নং ঘরে উঠছি। ৫ ও ৬ নং ঘর তোমার ও সেলিনার জন্য বুক করা আছে। অশ্রু যদি আসতে পারে, ওকেও নিয়ে এসো। তোমরা দেরি করছ দেখেই টেলিগ্রামটা করতে হল। ৫ তারিখ রাত ৮ টার মধ্যে অবশ্য পৌঁছে যেও। এতদিনে সত্যভূষণের সঙ্গে নিশ্চয়ই তোমাদের আলাপ হয়েছে, ওই তোমাদের পৌঁছিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে, ইতি–প্রতীম চৌধুরী।
