সেলিনা আমার পাশে বসে পড়ে বলল, এই নাও চিরুনি আর ফিতে। আমি অবাক হয়ে বললাম, এসব দিয়ে আমি কি করব! কি করবে তা আমি কি করে বলব? আমাকে নাকি এভাবে তোমার দেখতে ভাল লাগবে না, এ ভাবে নাকি তোমার কাছে আসাই উচিত নয় আমার, তহলে যে ভাবে সাজলে তোমার কাছে দৃষ্টি সুন্দর হয়, সেই ভাবেই সাজিয়ে নাও না বাপু।
ভিতরের অভিমানটা টের পাচ্ছি, বুঝতে পাচ্ছি যতক্ষণ অশ্রুকণা ছিল ও আসেনি ঠিকই, কিন্তু ভিতরের উত্তাপকে মিইয়ে যেতেও দেয়নি। বললাম, যে সাজে তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করে সেই সাজে সাজাতে পারলে সাজাবত! পারবে সাজাতে? আমার কোন আপত্তি নেই।
কি অস্বাভাবিক পরিবর্তন! বললাম সেলিনা, তুমি কি আমার উপর প্রতিশোধ নিচ্ছ? না। তবে? আমাকে তোমার হাতে তুলে দিয়েছি প্রান্তিক ভাই। আমাকে তোমার যে ভাবে ভাল লাগে, সে ভাবে দেখতে ইচ্ছে করে না? করে সেলিনা, এই মায়াবী রাতে তোমার ডানায় ভয় দিয়ে ঐ চাঁদের দেশে পৌঁছিয়ে যেতে ইচ্ছে করে, যাবে তুমি? যাব! সবটুকু আবেগ ঢেলে দিয়ে বলল সেলিনা। বার বার মনে পড়ছে একটু আগে অশ্রুকণার বলা প্রতীমবাবুর কথা, সেলিনা উত্তাল সমুদ্র হলেও সমুদ্র শান্ত হতে জানে। বললাম, আমার দিকে পিছন ফিরে বস। ও কোন প্রতিবাদ না করে তাই করল। আমি চিরুনিটা তুলে নিয়ে যতটুকু সম্ভব সুন্দর করে ওর চুল আঁচড়িয়ে দিলাম। তারপর এক বেনীতে বেঁধে দিলাম ওর ঘন কালো চুলের গোছা, যেমন করে একদিন নির্জন নার্সিং হোমের কেবিনে রেহানাকে বেধে দিতাম। তারপর গাছ থেকে সেই জোছনা আলোকে তুলে নিলাম প্রমান সাইজের চন্দ্রমল্লিকা পরম মমতায় খুঁজে দিলাম তা ওর বেনীর উৎসে। এবার বললাম আমার দিকে ফিরে বোস। ও দ্বিধাহীন ভাবে তাই করল। অপলক তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। বলল অমন করে কি দেখছ? তোমাকে? আগে কি দেখনি কোনদিন? না সেলিনা, তোমাকে এমন ভাবে কোনদিন দেখিনি? তুমি কি দেখেছো এমন করে কোনদিন আমাকে? ও উঠে দাঁড়ালো, বললাম উঠলে যে। না এমনি, তুমি বোস আমি আসছি! কোথায় যাবে? কোথাও না, তুমি কিন্তু উঠবে না প্রান্তিক ভাই। ও উঠে গিয়ে গাছ থেকে সুন্দর দুটো গোলাপ তুলে নিয়ে এল, আর তা তুলতে গিয়ে গোলাপ কাটার আঘাতে ওর হাত ক্ষতবিক্ষত হয়ে রক্ত ঝরতে লাগল, সেদিকে ওর কোন খেয়াল নেই। ও গোলাপ দুটো নিয়ে এসে দাঁড়ালো আমার কাছে। তারপর আমার পায়ের কাছে রেখে প্রণাম করল। আমি বললাম সেলিনা একি করলে? ও উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমার হিংসা আর অভিমানকে উজাড় করে তোমাকে দিলাম। আমি ওকে বুকের পরে টেনে নিয়ে বললাম সেলিনা! আমার জন্য কিছু রাখলাম না প্রান্তিক ভাই, এবার আমি কেবল তোমারই। আমার মান-অভিমান হিংসা-দ্বেষ-ঈর্ষা-ভালবাসা সবকিছু তোমার পায়ে অঞ্জলি দিয়ে নিজেকে নিঃস্ব করে তোমার হলাম, পারবে কি আমায় ফিরিয়ে দিতে? বললাম, তোমাকে ফিরিয়ে দিতে পারি সে সাধ্য আমার নেই। তারপর ওকে ছেড়ে দিয়ে বললাম, দেখি তোমার হাত! কেন? দেখিনা! ও হাতখানা বাড়িয়ে দিল। তখনো সেখান দিয়ে রক্ত ঝরছে। বুঝি প্রথম খেয়াল হল সেলিনার, বলল, হাতটা কেঁটে গেল কখন কে জানে? আমি ওর হাতটা নিজের হাতের মধ্যে তুলে নিয়ে, আঙুলে তুলে নিলাম ঝরে যাওয়া রক্ত। তারপর তাই দিয়ে টিপ পরিয়ে দিলাম ওর দুই ভুর মাঝখানে, বললাম, এটার বুঝি অভাব ছিল। কি যে আনন্দে তাকালো ও, বলল অশ্ৰুদিকে একটা প্রণাম করব, উনি নেবেন তে আমার প্রণাম? আত্মসমর্পণে আকাঙ্খ কোথায় পৌঁছিয়ে যায় তাই শুধু ভাবছিলাম।
কেটে গেছে কয়েকটা দিন। অশ্রুকণার প্রথম যতটা খারাপ মনে হয়েছিল, এখন আর তা হয় না। মোটামুটি মানিয়ে নিয়েছে। সত্যভূষণ বাবু রোজ আসেন না। তবে ডেকে পাঠালে আসেন, তার সৌজন্য তাকে কোন ভাবে বাহুল্যে ভরে দিতে তিনি যেন জানেন না।
এবার যখন সত্যভূষণ বাবু এলেন, আমি বললাম, কালতো চলে যাবো সত্যবাবু। আপনার সৌজন্যের কথা আপনার সমব্যথী দরদী মনের কথা, আমাদের মনে থাকবে। উনি হেসে ফেলে বললেন, ও সবতো আমি নই, আমাকে কি মনে থাকবে প্রান্তিকবাবু। বললাম, কোন রকম বাঁকা অর্থে এসব বলিনি সত্যবাবু। সত্যি আপনাকে ভীষণ ভাল লেগেছে আমাদের। তাহলে বন্ধুত্বের অধিকার দিচ্ছেন তো। সে অধিকার তো যেদিন এসেছি–সেদিনই দিয়েছি। তাহলে ওই কথাই রইল, আমি না আসলে বেরুবেন না। আমিও যাবো আপনাদের সঙ্গে। আমাদের সঙ্গে, কোথায়? কাল অশ্রুদেবীই জানান যে আপনারা আগামীকাল যাবেন। মেদিনীপুরে কি একটা বিশেষ কাজ আছে, যদি আমি আপনাদের সাহায্য করি, অবাক হলাম একটু। মেদিনীপুরে কি কাজ, অশ্রুকণা কি বোঝাতে চাইছে, কোনটাই তো জানিনে। সেটা না হয় অশ্রুকণার কাছে জেনে নেওয়া যাবে, তাই বললাম, তাহলে তো খুব ভাল হয়। আসলে মেদিনীপুর শহরের তো বিশেষ কিছু জানিনা, আপনি থাকলে তো বিশেষ উপকারই হয়। উনি বললেন এ ভাবে বলছেন কেন? এটা আমার জেলা। মেদিনীপুর আমার শহর।
রাতের দিকে একা পেয়ে অশ্রুকণাকে বললাম, হঠাৎ সত্যবাবুকে আমাদের বিশেষ কি কাজের কথা বলেছ কণা? ও বলল, তা হলে থাক, আমি বলে দেব, না, ওরা এবার সময় পাবে না। আমি বুঝতে পারছি না কি ও বলতে চাইছে, তবু বললাম, কণা সব সময় যে সব কথা বুঝতে পারবো এমন তো নয়। যদি তুমি কি চাইছো জানতে পারি। ও বলল, হয়তো অভিমানেই, সেলিনা মনে হয় আজ তোমার সব শূণ্যতা পূর্ণ করে দিয়েছে প্রান্তিক, তাই হয়তো আর কারো জন্য তোমার হৃদয়ে এক বিন্দু জায়গাও নেই, আর সে জন্যই রেহানা আজ তোমার কাছে অতীত ইতিহাস। কিন্তু তুমি বিশ্বাস কর, সত্যিকারের ভালবাসা ওর কাছ থেকে শিখেছিলাম একদিন। খাতা কলমে শেখায়নি। নীরবে, একাকী তার আচরণের ভিতর দিয়ে হৃদয়ে গেঁথে দিয়েছিল। মনে হয়েছিল হয়তো তাকে একবার খুঁজতে চাইবে। এই মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলে ডালিমের মৃত্যু হয়েছিল। আমার বার বার মনে হয়েছে, অলিমের সঙ্গে এই জেলে রেহানার দেখা হতে পারে। তাই ভেবেছিলাম, হয়তো এখানকার সাক্ষাৎ প্রার্থীর রেজিষ্টার দেখলে রেহানার কোন হদিশ পেলেও পেতে পার। হয়তো এসব আমার ভুল প্রান্তিক। যদি জীবন থেকে ওকে মুছে দিতে চাও দরকার নেই। আর যদি মনে কর, বাস্তব যাই হোক না কেন, ওকে একবার খোঁজা তোমার দায়িত্ব। তাই মনে হয়েছিল, সত্যভূষণবাবু তোমাদের কিছু সাহায্য করলেও করতে পারেন।
