অভিমান থাকলেও থাকতে পারে কিন্তু যখন জানতে পারলেন, রেহানার কথা, আমার কথা, আমাদের কথা, তিনি শুধু অবাক হলেন না, জীবনের সর্বোত্তম শ্রদ্ধা তিনি জানালেন মিনতি সেনকে। বললেন আমাকে, তোমার মায়ের মাতৃত্বের অহংকারকে আমি শ্রদ্ধা করি প্রান্তিক। এখনি কিছুই বলার দরকাব নেই, কিন্তু প্রয়োজন যদি দাবী করে জানিয়ে আমার সর্বোত্তম শ্রদ্ধা তাকে। বলেছিলেন তোমাদের প্রয়োজনে তোমাদের হিতাকাঙ্খী বন্ধু হিসাবে আমাকে পাশে পাবে। এর থেকে বেশী দাবী করে কোন মহত্ত্বকে ছোট করে দিওনা প্রান্তিক! জানি না কেন, নিজের অজান্তে মাথা নত হয়ে এসেছিল তার পায়ের উপর।
তুমি যখন রাগ করে চলে গেলে কণা, মিনতি সেনই আমাকে বললেন ওরা কাগজে কি একটা বিজ্ঞাপন দিয়েছে খোঁজ নিয়ে দেখনা, যদি মেয়েটার কিছু হয়। ও যে এত অভিমানী আর জেদী ভাবতেও পারিনি, হয়তো ঠিক মতো ওকে ভালবাসতে পারিনি, যদি পারতাম, যদি তোদের মত ও-ও আমাকে আপন ভাবতে পারতো যত অভিমানই হোক চলে যেতে পারতোনা। তুই যা না বাবা একবার।
তোমার জন্যই গিয়েছিলাম কণা। উনি শুধু জিজ্ঞাস করেছিলেন, আমার কাছে তুমি নিজেই এসেছো? না …। আমি তাকে বাধা দিয়ে বললাম এসেছি আমি নিজের ইচ্ছেয়, তবে মা জানেন, তিনি আমাকে নিষেধ করেন নি। পরের ইতিহাস তোমার জানা কণা। তুমি ভাবতেও পারবেনা কি অপরিসীম শ্রদ্ধা আমার মায়ের প্রতি তার। ত্যাগে যে প্রেম কোন স্তরে পৌঁছিয়ে যেতে পারে তার জ্বলন্ত প্রমাণ প্রতীমবাবু ও আমার মা। অথচ দেখ, আমার মায়ের সঙ্গে প্রতীম বাবুর কোন পূর্ব পরিচয় ছিল না, দেখাশুনা করেই এই বিয়ে ঘটতে যাচ্ছিল। কিন্তু ঘটল না এই বিয়েকেই কেন্দ্র করে একটা চরম এক্সিডেন্ট ঘটে যাওয়ায়। আর এসব মিটে গেলে প্রতীমবাবু আমার মাকে একটা ছোট্ট চিঠি দিয়েছিলেন, তাতে বলেছিলেন সবকিছুকে ভুলে গিয়ে যদি মনে করা যায় আমারা এক সাথে পথ চলতে পারি, আমি অপেক্ষা করব। অপেক্ষাই করেছেন প্রতীমবাবু আমার মায়ের কোন উত্তর না পেয়েও। আর আমার মা? তিনিও অপেক্ষা করেছেন উত্তর না দিয়ে। দীর্ঘ ২৫ বছর পরে যখন তুমি সজলবাবুকে বিয়ে করতে অস্বীকার করলে, আমাদের যাওয়ার কথাকে বাতিল করার জন্য আমি যাই প্রতীমবাবুর কাছে এবং তাকে আমাদের বাড়ীতে মানে নীলাঞ্জনা পিসির বাড়ীতে আসতে বলি, পিসি মাকেও বলেন তবে কোন কিছু না জানিয়ে। ২৫ বছর পরে দেখা হলেও চিনতে তারা পেরেছিলেন একে অপরকে। কিন্তু আত্ম মর্যাদার গভীর অহংকারে নিজেদের সরিয়ে নিতে কুণ্ঠিত হননি কেউ। আমি পচিয় করিয়ে দিয়ে বলেছিলাম, আমার মা। তীক্ষ্ণ চোখে দেখেছিলাম এক গভীর বেদনা তাকে যেন পাণ্ডুর করে তুলেছে। মিনতি সেন আর কাছে এলেন না। যখন চলে গেলেন তখন দেখা করেও গেলেন না। প্রতীমবাবুকে মিনতি সেনেব বাবার একটা চিঠি যা তিনি আমাকে লিখেছিলেন তার হাতে তুলে দিয়ে ছিলাম তাতেই জেনেছিলেন তিনি, মিনতি সেনের সত্যিকারের পরিচয়। মুগ্ধ শ্রোতার মতন অশ্রুকণা শুনছিল আমার কথা। প্রতীমবাবু আর মিনতি সেন, তাকে যেন নিয়ে চলেছে এক নতুন জগতে। যেখানে জাগতিক দেনা পাওনা দিয়ে জীবনের বিচার হয় না।
কারো মুখে কোন কথা নেই। নৈসর্গিক নিঃশব্দতাকেও যেন হার মানিয়েছে আমাদের নিঃশব্দতা। বললাম এবার তবে ওঠা যাক। অশ্রুকণা বলল, হ্যাঁ উঠতেতো হবেই, কিন্তু বিশ্বাস কব, প্রতীমবাবু ও মিনতি পিসি তারা যে কেমন ভাবে তাদের অজান্তে আমার জীবনে আলোড়ন তুলেছেন তা তোমাকে বুঝাতে পারবো না প্রান্তিক।
প্রতীমবাবুকে বলেছিলাম, আমি নিজে কিছুই চাইবোনা ওর কাছে। কিন্তু ও যদি আসে, আমি ফিরিয়ে দিতে পারবো না। বলেছিলেন, তাতে আরো আঘাত পাবে মা, কি দরকার জীবনকে আরো জটিলতার মধ্যে নিয়ে গিয়ে। তার চেয়ে যা সহজ স্বাভাবিক এবং সুন্দর তার মধ্যে নিজের মুক্তি খুঁজে নিও। দেখবে তাতে কোন হারানোর বেদনা থাকবেনা। জীবনে যদি জয়ী হতে চাও মা, পথকে অনাবশ্যক দূর্গম না করে সুগম করে নাও।
হঠাৎ দেখি সীতা এগিয়ে আসছে। সামনে এসে বলল, দিদিমণি জিজ্ঞাসা করছেন, আপনাদের কত দেরি হবে। এখানে কি চা বা কফি পাঠিয়ে দেবে, না একেবারে রাতে খাবার খেয়ে নেবেন।
অশ্রুকণা হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল বাবাঃ ১০টা বেজে গেছে। বলল, না তুমি যাও সীতা, আমি আসছি। ও আমাকে বলল এতটা সময় এখানে কাটালাম, কি জানি সেলিনা আবার কি ভাবছে, না জানি অভিমানে কথাই বলবে কি না। আমি একটু হেসে বললাম ভয় নেই কণা প্রতীমবাবুতো বলেছেনই সেলিনা উত্তাল সমুদ্র হলেও, সমুদ্র শান্ত হতে জানে। তুমি কি বিশ্বাস কর ওকে বাদ দিয়ে এই আকাশ ভরা জোছনা ধারায় যে মুহূর্তটুকু কাটিয়ে গেলাম তাতে ও কিছু ভাববে না? কেন ভয় পাচ্ছ কণা। ভাবারতো কিছু নেই। কি জানি আছে কি না। তবু ভয় হয়। আমি বরং ওকে তোমার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি। যদি না আসে? সীতাকে পাঠিয়ে ডাকিয়ে নেবো। প্রয়োজন হবে না কশা। বল আমি ডাকছি! আচ্ছা।
একটু পরে এল সেলিনা। বলল, এতক্ষণ এখানে আছে, এরপরও আবার আমাকে ডেকে পাঠিয়েছে কেন? বললাম বোস না সেলিনা। রাত কত হয়েছে জান? না হিসেব করিনি। তারপর বললাম কি হল কসবে না?হা বসব, তুমি একটু অপেক্ষা কর আমি এক্ষুনি আসছি। ও ভিতরে গিয়ে অশ্রাকে বলল, অদি, প্রান্তিক ভাই আসতে চাইছেনা এখন, তুমি যাবে? চল না কফি খেতে খেতে আরো কিছুক্ষণ কাটানো যাক। না সেলিনা, তুমি যাও। আমিতো অনেকক্ষণ ছিলাম। সেইজন্য বুঝি, আমি যাইনি বলে তুমিও যাবে না। দূর পাগলি মেয়ে, আমি কি তাই বলেছি? তুমি যাওনা, হয়তো তোমাকে কিছু বলতে পারে। বেশ আমি ওর জন্যও কফিটা নিয়ে যাচ্ছি। তুমি যাও, আমি সীতাকে দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি। দরকার নেই অশ্রুদি, হয় আমাকে দাও, না হলে দিতে হবে না। হঠাৎ অশ্রুকণা বলল, একিরে মেয়ে, চুলগুলো এমন উস্কো খুশকো, শাড়ীটা যারপর নাই কোচকানো, এই ভাবে যাবে নাকি তুমি। একটু বুঝি লজ্জা পায় সেলিনা, বলে, চুলটা বাধার সময় হয়নি, আর তাছাড়া শাড়ী, বাড়ীর মধ্যে বাগান, কে দেখবে শাড়ীটা কেমন? অশ্রুকণা বলল, যার চোখ আছে সেই দেখবে। ঐ শাড়ীটা ছেড়ে ফেল সেলিনা, আর চিরুনীটাও নিয়ে যাও, প্রান্তিকের সঙ্গে কথা বলতে বলতে চুলটা বেধে ফেল। সেলিনা বলল আমার চুল বাধা নিয়ে এত ভাবছে কেন? এমনতো নয যে, এমন ভাবে প্রান্তিক ভাই আমাকে কখনো দেখেনি। হয়তো দেখেছে, কিন্তু দেখেছে বলেই এই ভাবেই তোমাকে রোজ দেখতে হবে তারতো কোন মানে নেই। তাহলে তুমিই চল, চুলটা তুমিই বেঁধে দেবে ওখানে বসে। অশ্রু বলল, সেই এক জেদ, আচ্ছা তুমি সব কিছু নিয়ে যাও। সত্যি যদি চুল বাঁধার কোন অসুবিধা হয় ফিরে এলে বেঁধে দেবো। আর দেরি করো না, অনেকক্ষণ প্রান্তিক একা একা বসে আছে।
